হটনিউজ স্পেশাল

বিচারক অপসারণে ৯৬ অনুচ্ছেদ আবার সংশোধনের ইঙ্গিত

অনেকটা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সুরেই কথা বললেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তবে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন সোজাসাপ্টা আর আইনমন্ত্রী বললেন ইঙ্গিতে।

দুই জনই কথা বলেছেন, বিচারক অপসারণে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে আনা সংশোধনী (ষোড়শ সংশোধনী হিসেবে পরিচিত) নিয়ে। উচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করে দেয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে সরকারে। অর্থমন্ত্রী বলেছিলে, এই সংশোধনী আবার পাস হবে, প্রয়োজনে বারবার হবে। আর আইনমন্ত্রী বললেন অনেকটা ঘুরিয়ে। তার বক্তব্য এমন, ৯৬ অনুচ্ছেদ আবার সংশোধন করা যাবে না এমন কথা নেই।

ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১০ দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী এই ইঙ্গিত দেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আর কখনো ৯৬ অনুচ্ছেদকে সংশোধন করা যাবে না এরকম কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা কোথাও নাই।’

২০১৪ সালের ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে পাস হয়, যা ষোড়শ সংশোধনী হিসেবে পরিচিত। এই সংশোধনীতে বিচারক অপসারণে সামরিক শাসনামলে করা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থার বিলোপ করে সংসদের হাতে সে ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু উচ্চ আদালত এই সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে দিয়েছে।

এই সংশোধনী হাইকোর্টে অবৈধ ঘোষণার পর আপিল করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু গত ৩ জুলাই আপিল বিভাগ সে আপিল খারিজ করে দেয়। আর ১ আগস্ট বের হয় পূর্ণাঙ্গ রায়। এর ফলে বিচারক অপসারণে সেনা শাসনামলে করা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা ফিরে এসেছে।

আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের দুই দিনের মাথায় গত ৩ আগস্ট সিলেটে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদেরকে বলেন, ‘আদালতে বাতিল হওয়া ষোড়শ সংশোধনী সংসদে আবার পাস করা হবে। প্রয়োজনে অনবরত পাস করা হবে।…বিচারকরা জনগণের প্রতিনিধিদের ওপর খবরদারি করেন। অথচ আমরা তাদের নিয়োগ দেই। বিচারকদের এমন আচরণ ঠিক নয়।’

যদিও এক দিন পরই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, অর্থমন্ত্রীর এই মন্তব্য তার ব্যক্তিগত বক্তব্য। আওয়ামী লীগ বা সরকারের অবস্থান নয়।

যদিও ৭ আগস্ট মন্ত্রিসভায় আলোচনায় ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে তীব্র অসন্তোষ জানান হয়েছে। সেখানেও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সুর মিলিয়েই কথা বলেছেন একাধিক মন্ত্রী। আর সরকারের অবস্থান জানাতে আইনমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনেও একই বিষয় উঠে আসলো।

আপিল বিভাগের বক্তব্য হচ্ছে, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল হওয়ায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হতো। তবে আইনমন্ত্রী বলেছেন, ‘৯৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল হওয়ায় কোথায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হল সেটা আমি বুঝতে পারি না।’

‘আমি বলতে চাই যে মূল সংবিধানের কোন বিধানের জুডিসিয়াল রিভিউ হয় কিনা এ বিষয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। …আমরা মনে করি সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি অত্যন্ত অস্বচ্ছ এবং নাজুক। তাই এর পরিবর্তনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের স্বাধীনতা এবং তাদের চাকরির নিশ্চয়তা রক্ষা করা হয়েছিল বেলেই আমাদের বিশ্বাস।’

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই যে, ষোড়শ সংশোধনী দ্বারা সংসদ বিচার বিভাগের সাথে কোনো পাওয়ার কনটেস্ট এ অবতীর্ণ হয় নাই। বরঞ্চ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সুদূঢ় করার প্রচেষ্টাই করেছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘রায়কে রাজনৈতিকভাবে নয়, আইনগতভাবে মোকাবেলা করা হবে।’

আপিল বিভাগের রায়ের কড়া সমালোচনা এসেছে সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হকের পক্ষ থেকেও। তিনি মনে করেন, আপিল বিভাগের রায় অপরিপক্ক। বিচারক অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পক্ষে নন তিনিও।

অবশ্য খায়রুল হকের এই অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী কিছু বলতে চাননি। বলেন, এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানা নেই তার। কাজেই মন্তব্য করতে চান না।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যেহেতু এই রায়ে সংক্ষুব্ধ তাই আমরা নিশ্চয়ই চিন্তাভাবনা করছি যে রায়ে রিভিউ করা হবে কি না। তবে আমরা এখনো কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হই নাই। কারণ রায়ের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো এখনো নিবিঢ়ভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে।’

ষোড়ষ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায়ে শাসন ব্যবস্থা এমনকি সংসদ নিয়ে নানা মন্তব্য এসেছে যার কারণেও সরকার ক্ষুব্ধ, বিব্রত। লিখিত বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এই বাস্তব সত্যকে পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছে সেটাই আমার জন্য অনেক কষ্টের এবং লজ্জার। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমাদের নিরীক্ষীয় প্রধানবিচারপতির রায়ে যে সব আপত্তিকর এবং অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য আছে সেগুলো এক্সপাঞ্জ (বাদ দেয়া) করার উদ্যোগ আমরা নেব।’

এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বিচারবিভাগের দায়বদ্ধতা সব সময় জনগণের কাছে থাকবে। এটা কোন রায়ও নিতে পারবে না।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, ‘সরকার এবং বিচার বিভাগ মুখোমুখি অবস্থানে নয়।’

সরকার ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের সমালোচনা করায় বিএনপি নেতাদের সমালোচনারও জবাব দেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যে দলের প্রধান জামিনে থাকা অবস্থায় বিদেশে যান অথচ আদালতের অনুমতি নেন না। তাদের দলের নেতাদের মুখে আইনের কথা মানায় না। তারা নিজেরা আগে আইন মানুক, তারপর এসে বক্তব্য দিক, তখন আমরা সেই বক্তব্য শুনব।’