আন্তর্জাতিক জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর রাজনীতি সারাদেশ

এবার অনিশ্চয়তার মধ্যেই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বাছাই আজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আজ বৃহস্পতিবার এবার থেরেসা মে ও জেরেমি করবিন ব্রিটেনের আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে । গত এপ্রিলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ায় মাত্র দুই বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠনে ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ব্রেক্সিটের পক্ষে ব্রিটেনবাসী গণভোট দেওয়ার পর এই আগাম নির্বাচনকে পুরো ইউরোপের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার প্রক্রিয়া ও জোটের বাইরে দেশটির বাণিজ্য সম্পর্ক, সীমান্ত ও শুল্ক ব্যবস্থাপনার ধরন কোন পথে যাবে, তা নির্ধারিত হবে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।

বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সময় সকাল ৭টা থেকে নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। ভোট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুথ ফেরত জরিপ প্রকাশ করা হবে। শুক্রবার সকাল ৩টা থেকে ৬টার মধ্যে ভোটের ফল জানা যাবে।

দেড় মাসের নির্বাচনি প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতি-পর্ব শেষে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের রায়ের মুখোমুখি হবে। ইংল্যান্ড, নর্দান আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের ভোটাররা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ৬৫০টি আসনে নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেবেন। ১৯৭৪ সালের পর ব্রিটেনে এটিই প্রথম আগাম নির্বাচন।

গত বছর ব্রেক্সিট গণভোটের পর প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সরে দাঁড়ান। ফলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি টোরি সরকারের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়ার পর তিনি আগের অবস্থান থেকে সরে এসে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন।

ফলাফলে অনিশ্চয়তার আভাস

আগাম নির্বাচনের প্রচারণার শুরুতে ভালো ব্যবধানেই এগিয়ে ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। গত মাসে লেবার পার্টির চেয়ে ১৬ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন কনজারভেটিভরা। কিন্তু নির্বাচনের আগের দিন দুই দলের রেটিং ব্যবধান মাত্র এক পয়েন্ট। জরিপের ফল অনুযায়ী তাই কনজারভেটিভ প্রার্থী থেরেসা মে’র সঙ্গে লেবার নেতা জেরেমি করবিনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে যাচ্ছে।

সার্ভশেনের একটি জরিপে দেখা যায়, এখন কনজারভেটিভদের রেটিং পয়েন্ট ৪১.৫ শতাংশ এবং লেবারের পয়েন্ট ৪০.৪ শতাংশ। লিবারেল ডেমোক্রেটদের পয়েন্ট ৬ এবং ইউকেআইপি-এর পয়েন্ট ৩ শতাংশ। ইউগভ পূর্বাভাস দিয়েছে বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে কনজারভেটিভরা ৪২ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩০২টি সিট জয় করতে পারে, যা গতবারের চেয়ে ২৮টি কম। তাদের কনস্টিটিউন্সি বাই কনস্টিটিউন্সি মডেলে আরও দেখা যায়, লেবার পার্টি ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়ে ২৬৬টি আসনে জয় পেতে পারে। যা গতবারের তুলনায় ৪০টি বেশি। নির্বাচনের ফল যদি সত্যি এমন হয়, তাহলে থেরেসা মে’র কনজারভেটিভ দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে। কোনও দলই পাবে না সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ফলে ঝুলন্ত সংসদ গঠনের পথে আগাতে হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

ভোট গ্রহণের আগেরদিন পরিচালিত সর্বশেষ কয়েকটি জনমত জরিপে মিশ্র ফল পাওয়া যাচ্ছে। বেশির ভাগ জরিপে নাটকীয়ভাবে কনজারভেটিভদের এগিয়ে থাকার কথা বলা হচ্ছে। এমনকি ইউগভ-এর জরিপেও বলা হয়েছে চূড়ান্ত জরিপে লেবার পার্টি তিন পয়েন্ট পিছিয়ে গেছে। গার্ডিয়ান-আইসিএম-এর জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী থেরেসা মের দল ১২ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে করবিনের দলের তুলনায়। তাদের মতে, কনজারভেটিভরা ৪৬ ও লেবার পার্টি ৩৪ শতাংশ ভোট পাবে। জরিপগুলোতে দাবি করা হয়েছে, দোদুল্যমান (সুইং ভোট) ভোটাররা থেরেসা মে’র দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। ইনডিপেন্ডেন্ট-কমরেস পরিচালিত জরিপে আভাস দেওয়া হয়েছে, থেরেসা মে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবেন। এমনকি মার্গারেট থ্যাচারের পর সবচেয়ে বেশি আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারেন কনজারভেটিভরা। তবে ক্রিয়াসলি নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে লেবার পার্টি ৩ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে কনজারভেটিভদের তুলনায়। এ জরিপের ফল অনুসারে, লেবার পার্টি ৪১.৩ শতাংশ ভোট পেতে পারে। আর কনজারভেটিভরা পাবে ৩৮.৫ শতাংশ ভোট। কোম্পানিটি জানিয়েছে তাদের মার্জিন অব এরর হতে পারে ৩.২ শতাংশ।

থেরেসা মে না জেরেমি করবিন?

আগাম নির্বাচন মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ও লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনকে। ব্রেক্সিট ইস্যুতেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগে দায়িত্ব নেন থেরেসা মে। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ব্রিটেনের ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এবার জিতলে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা পাবেন তিনি।

আর লেবার দল জয়ী হলে ইতিহাসে স্থান করে নেবেন দলটির নেতা জেরেমি করবিন। করবিন দলের নেতা হওয়ার আগ পর্যন্ত পার্লামেন্টের পেছনের সারির এমপি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৮৩ সাল থেকে তিনি এমপি নির্বাচিত হয়ে আসছেন। ২০১৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর লেবার দলের প্রধান নির্বাচিত হন। নীতির প্রশ্নে তিনি পার্লামেন্টে নিজ দলের বিরুদ্ধেও ভোট দিয়েছেন একাধিকবার। করবিন যুদ্ধবিরোধী ও স্পষ্ট কথা বলেন।

নিরাপত্তা ইস্যুতে বিপাকে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। তিন মাসের ব্যবধানে ব্রিটেনে তিনটি সন্ত্রাসী হামলার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। প্রশ্ন উঠেছে থেরেসা মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ২০ হাজার পুলিশ অফিসারকে ছাঁটাইয়ের কারণেই সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি বেড়েছে কিনা। লেবার পার্টি এরই মধ্যে এই ইস্যুতে সোচ্চার হয়েছে। করবিন নিজেই প্রধানমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ‘সস্তায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।’

অভিবাসন ইস্যুতেও সমালোচনার মুখে রয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় প্রায় ৫০ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থীকে জোর করে দেশে ফেরত পাঠিয়েছিলেন তিনি। দেশটির অভিবাসন ট্রাইব্যুনালের এক রুলিংয়ে বলা হয়েছে, থেরেসা মে’র সিদ্ধান্তটি ছিল ভুল। নির্বাচনি ইশতেহার ও জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিতেও এগিয়ে রয়েছেন লেবার পার্টির করবিন।

যে পাঁচটি ইস্যু নির্বাচনে প্রভাবিত করবে

এপ্রিলে থেরেসা মে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ায় অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। থেরেসা মে জানিয়েছিলেন, ব্রেক্সিট আলোচনার জন্য সরকারের অবস্থান শক্তিশালী করতেই এই আগাম নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচনি প্রচারণায় শুধু ব্রেক্সিট নয়, আরও বেশ কয়েকটি ইস্যু গুরুত্বসহ হাজির হয়। ব্রেক্সিট ইস্যুর সঙ্গে আলোচনায় চলে আসে আরও চারটি ইস্যু। এসব ইস্যুর মধ্যে রয়েছে, অভিবাসন, অর্থনীতি, স্কটল্যান্ড ও নিরাপত্তা।

ভোটের আগে ব্রেক্সিটে মনোযোগ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় থেরেসা মে

ব্রিটেনের আগাম নির্বাচনের ভোট গ্রহণের আগের দিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ব্রেক্সিটে ব্রিটিশদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। নির্বাচনি প্রচারণার মধ্যে দু’দফা সন্ত্রাসী হামলার পর আলোচনায় চলে আসে সন্ত্রাসবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু। নির্বাচনি বিতর্কেও ইস্যুটি গুরুত্ব পায়। এতে চাপা পড়ে যায় ব্রেক্সিট ইস্যুটি। আর নিরাপত্তা ইস্যুতে বেশ সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। তিনটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পর নিরাপত্তা ইস্যুটি লেবার পার্টির জনসমর্থণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে ভোটের আগমুহূর্তে সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তা ইস্যু থেকে থেরেসা মে চেষ্টা চালান ব্রেক্সিট ইস্যুকে পুনরায় সামনে নিয়ে আসার।

ব্রেক্সিট থেকে ভোটারদের মনোযোগ সরে যাওয়ার কারণেই নির্বাচনি জরিপগুলোতে পিছিয়ে পড়ছে থেরেসা মে’র কনজারভেটিভ পার্টি- এমনটাই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। সর্বশেষ ভাষণে থেরেসা মে বলেছেন, আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) যখন ভোটের সময় আসবে আমার মনে হয় জনগণের উচিত প্রচারণার শুরুর সময়কার কথা মাথায় রাখা। প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কাকে বিশ্বাস করব। কার নেতৃত্বে ইউরোপের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো চুক্তি করতে পারবে ব্রিটেন।

বৈষম্যহীন সমতার সমাজ গঠনে জোর করবিনের লেবার পার্টির

লেবার পার্টির ব্যাকব্যাঞ্চার থেকে দলের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়া জেরেমি করবিনের লেবার পার্টি কনজারভেটিভদের মতো সুনির্দিষ্ট কোনও ইস্যুতে নির্বাচনি প্রচারণা সীমাবদ্ধ রাখেনি। দলটির ইশতেহারে ধনী-গরিব বৈষম্যহীন সমতামূলক সমাজ গঠনে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দলটি ঘোষণা দিয়েছে ধনীদের ওপর কর ৫ শতাংশ বাড়াবে। শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি মওকুফ করে অবকাঠামো খাতে ২৫০ বিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড বিনিয়োগ করবে।

নর্থ ওয়েলসে সমর্থকদের প্রতি দেওয়া ভাষণে করবিন বলেন, কাকে ভোট দেবেন এ জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া একেবারে সহজ। আরও পাঁচ বছর কনজারভেটিভরা ক্ষমতায় থাকা মানে আরও পাঁচটি বছর কঠোরতা ও মিতব্যয়িতার, সরকারি ভর্তুকি প্রত্যাহারের আরও পাঁচ বছর।

এর আগে দলের ইশহেতার প্রকাশের অনুষ্ঠানে করবিন বলেছিলেন, মানুষ চান দেশ হবে অধিকাংশ মানুষের জন্য; গুটিকতকের জন্য নয়। গত সাত বছর ধরে দেশের মানুষ এর বিপরীতটা দেখে আসছেন। এটা ছিল ধনী ও অভিজাতদের একটি ব্রিটেন। আগামী পাঁচ বছরে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এসবের আমূল পরিবর্তন সাধন করা।