অপরাধ জাতীয় ঢাকা নারয়ণগঞ্জ প্রধান খবর সারাদেশ

রূপগঞ্জের অস্ত্র-গোলাবারুদের সঙ্গে জড়িত পাঁচ আসামির কেউ নয় !

রাকিবুল ইসলাম রাকিব: এবার রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে রূপগঞ্জের পূর্বাচল ৫ নম্বর সেক্টরের একটি জলাধার থেকে উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের মালিক এখনও পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া পাঁচ আসামির কেউ-ই এসবের মালিক এবং আন-নেওয়ার সঙ্গে জড়িত নয় তা প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ।

তদন্তে আরও জানা গেছে, মাছ ধরতে গিয়ে এ অস্ত্রের সন্ধান পায় তারা। কিন্তু তারা বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে না জানিয়ে অবৈধভাবে এগুলো বেচাকেনার চেষ্টা করছিল। ডোবা থেকে একটি ব্যাগের ৮টি অস্ত্র তারা নিজেদের কাছে লুকিয়েও রেখেছিল।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ পাঁচ আসামিকে আট দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাদের কাছ থেকেই এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন বলেন, যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা অস্ত্রের বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশকে না জানিয়ে নিজেরাই ‘ই-লিগ্যাল ট্রেডের’ সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। তবে প্রাথমিক তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রের পুরো চালানটি আনা বা কোথাও পাচারের বিষয়ে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ‘আমরা তারপরও বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। তারা কেন পুলিশকে বিষয়টি জানালো না বা আরও কেউ এই বিষয়টি জানতো কিনা তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

শুক্রবার (২ জুন) সকাল থেকে পূর্বাচলের ওই জলাধারে অভিযান চালিয়ে ৬১টি চায়নিজ এসএমজি, ২টি রকেট লাঞ্চার, ২টি ওয়াকিটকি, ৭.৬২ বোরের ৫টি পিস্তল, ৫টি পিস্তলের ম্যাগজিন, ৪৯টি রকেট লাঞ্চার প্রজেক্টর, ৪২টি হ্যান্ড গ্রেনেড, এসএমজির ম্যাগজিন ৪৪টি, বিপুলসংখ্যক টাইমফিউজ, ইগনাইটার, গুলি ও ব্যাজ উদ্ধার করা হয়।

প্রথমে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শরীফ খান নামে এক মাদক ব্যবসায়ীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসব অস্ত্র-গোলাবারুদের সন্ধান পাওয়া গেছে। পরদিন শনিবার (৩ জুন) পুলিশ শাহীন ওরফে সানা, শান্ত, রাসেল ও মুরাদ নামে আরও চার যুবককে গ্রেফতারের কথা জানায়। শনিবার রাতে রূপগঞ্জ থানায় তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় অস্ত্র মামলা। রবিবার (৪ জুন) তাদের আদালতে সোপর্দ করে ৮দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।

মামলার অভিযোগে পুলিশ বলেছে, মাস দেড়েক আগে হৃদয় নামে এক যুবক পূর্বাচলের ওই জলাধারে মাছ ধরতে গিয়ে একটি ব্যাগের সন্ধান পায়। সে বিষয়টি মুরাদ, শাহীন, শান্ত ও রাসেলকে জানায়। তারা বিষয়টি শরীফকে জানায়। শরীফসহ সবাই মিলে সেই ব্যাগ তুলে দুটি অস্ত্র পূর্বাচলের ব্লু-সিটিতে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখে। একটি শরীফের হেফাজতে রাখে। বাকি ৫টি অস্ত্র মুরাদ নিজের কাছে রাখে। জলাধারে অভিযানের আগেই পুলিশ শরীফ ও অন্যদের হেফাজতে থাকা ৩টি অস্ত্র উদ্ধার করে। আর মুরাদের কাছে থাকা বাকি পাঁচটি অস্ত্র ভোলাব এলাকার শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়।

জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, এই অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেফতাকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, হৃদয়ের মাধ্যমেই এই অস্ত্রের সন্ধান পায় তারা। তারা কয়েকটি অস্ত্র বিক্রির জন্য চেষ্টা করছিল। তবে অস্ত্র আনা বা পাচারের সঙ্গে তারা জড়িত নয়।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তাও মনে করেন, এত বড় চালানের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়াদের কারও যোগাযোগ থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।

তাদের ধারণা, এসব অস্ত্রের সঙ্গে এক বছর আগে উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মিল রয়েছে। অস্ত্রের ধরণ, অস্ত্রের সঙ্গে পাওয়া ব্যাজ থেকে মনে হচ্ছে এসব অস্ত্র ভারতীয় কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে এসব অস্ত্র গোপনে ওই জলাধারে ফেলে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে ওই জলাধার থেকে অস্ত্রের ব্যাগগুলো হয়তো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হতো।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দিয়াবাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের জিডির তদন্ত করছেন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম- সিটিটিসি ইউনিট। ওই ঘটনায় অস্ত্র ফেলে যাওয়ার সময় একজন প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশ কনস্টেবল জানিয়েছিলেন, একটি কালো পাজেরোর মাধ্যমে এসব অস্ত্র ফেলে যাওয়া হয়। এক বছরেও পুলিশ সেই কালো পাজেরোর মালিককে খুঁজে বের করতে পারেনি।

পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, দিয়াবাড়ির ওই গ্রুপটিই পূর্বাচলের ওই জলাধারে অস্ত্র ফেলে এসেছে।

এদিকে, পূর্বাচলের অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া সেই হৃদয় কিছুদিন আগে কাতার চলে গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশের একজন কর্মকর্তা। তারা হৃদয়ের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। তবে ঠিক কবে সে কাতারে চলে গেছে তা জানা যায়নি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মাহমদুল হক বলেন, হৃদয়ের পরিবারও পালিয়েছে। তাদের বাড়িতে কাউকে পাওয়া যায়নি। হৃদয় কবে, কখন দেশ ছেড়েছে তা জানার চেষ্টা চলছে। সত্যিই যদি সে বিদেশে পালিয়ে গিয়ে থাকে তবে তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।