অপরাধ জাতীয় ঢাকা নারয়ণগঞ্জ প্রধান খবর

যে কৌশলে কাজ করতো শিশু অপহরণ ও পাচারকারী চক্র

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার চক্রের ছয় সদস্য

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় আট বছরের শিশু বায়েজিদ অপহরণের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে সম্প্রতি শিশু পাচারকারী এক চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য রীতিমত আঁতকে ওঠার মতো। নানা কৌশলে শিশুদের অপহরণের পর বিদেশে পাচার ও মুক্তিপণ আদায় করাই তাদের পেশা। এখনও পর্যন্ত এই চক্র ১৭টি শিশু অপহরণের কথা স্বীকার করেছে। এর মধ্যে সাত জনকে তারা মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছে, ছয় শিশুকে বিদেশে পাচার করেছে। বাকি চার শিশুর দুই শিশুকে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগ করে হত্যা করেছে ও দুই শিশুকে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দিয়েছে চক্রটি। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পাচারকারী চক্রটি এসব তথ্য দিয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।
জিজ্ঞাসাবাদে ওই চক্রটি র‌্যাবকে জানায়, শিশু অপহরণের উদ্দেশ্যে তারা যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, নারায়ণগঞ্জ, চিটাগাং রোড এলাকার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, কমলাপুর রেলস্টেশন এবং ঢাকা সদরঘাট এলাকায় ছদ্মবেশে মাইক্রোবাসে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। ফাঁকা কোনও এলাকায় কোনও শিশু পরিবার থেকে সামান্য বিচ্ছিন্ন হলেই তাকে মাইক্রোবাসে তুলে চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে অচেতন করে রাখে। পরে অপহৃত শিশুদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করে তারা।
র‌্যাব-১১-এর এএসপি আলেপউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, অপহরণের পর কখনও কখনও মুক্তিপণ পেলেও অপহৃত শিশুদের ফেরত দিতে গিয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় শিশুদের হত্যা করত ওই চক্রটি। দু’টি শিশুকে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দিয়েছে বলেও স্বীকার করে নিয়েছে চক্রটি।
এই পাচারকারী চক্রটি কিভাবে শিশুদের অপহরণ, পাচার ও হত্যা করত, তার বিবরণ উঠে এসেছে র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে।
বায়োজিদ অপহরণ ও উদ্ধার
বায়েজিদ অপহরণের ঘটনা প্রসঙ্গে গ্রেফতার হওয়ার চক্রটির সদস্যরা জানায়, ২৭ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় বন্দর এলাকা থেকে আট বছরের শিশু বায়োজিদকে অপহরণ করে তারা। পরে তাকে সিদ্ধিরগঞ্জে চক্রের মূল হোতা মো. জাকির হোসেনের বাড়িতে নিয়ে যায়। এরপর মোবাইলে বায়োজিদের পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে। বায়োজিদের পরিবার র‌্যাব-১১-এর কাছে অভিযোগ করলে ১৮ জানুয়ারি রাত ৯টায় নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল এলাকা থেকে বায়োজিদকে উদ্ধার করে র‌্যাব। চক্রটি র‌্যাবর উপস্থিতি টের পেয়ে বায়োজিদকে রাস্তার পাশে ফেলে পালিয়ে যায়। পরে ফেব্রুয়ারির শুরুতে আটক করা হয় টিটুকে। তার দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে অভিযান চালিয়ে চক্রের বাকি পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।
ছয় শিশুকে বিদেশে পাচার
পাচারকারী চক্রটি ছয়টি শিশুকে বিদেশে পাচারের তথ্য স্বীকার করেছে র‌্যাবের কাছে। এর মধ্যে আলামিন (৮), শুভ (৭) ও ইমনের (১৪) বাড়ি বরিশালে। বাকি তিন শিশু হৃদয় (৮), সুমন (৬) ও আনন্দের (৭) বাড়ির ঠিকানা বলতে পারেনি চক্রটি।
চক্রটি জানায়, গত ২০ নভেম্বর পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে ইমন বাড়ি থেকে লঞ্চযোগে ঢাকা আসে। সদরঘাট এলাকায় ইমনকে একা দেখে অপহরণ করে তারা। ইমনের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ দাবি করে তারা। মুক্তিপণ না পেলে তারা ইমনকে বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে শাহাবুদ্দিনের কাছে হস্তান্তর করে। র‌্যাবর হাতে গ্রেফতার হওয়া জেসমিন ও তার স্বামী জহির (পলাতক) এবং চক্রের আরেক সদস্য মুনির হোসেন (পলাতক) ‘ওমানে’ অবস্থানকারী শাহাবুদ্দিনের কাছে শিশুদের পাচারের দায়িত্ব পালন করে থাকে। শাহাবুদ্দিন এসব শিশুদের মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দেয়। প্রতিটি শিশুর জন্য পাচারকারী চক্রটি ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পেয়ে থাকে।
মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্তি পাওয়া সাত শিশু
র‌্যাবের কাছে জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের সদস্যরা জানায়, তারা এখন পর্যন্ত সাতটি শিশুকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছে। এই শিশুরা হলো— ঝালকাঠির রাকিব হোসেন ইরান (৮),ভোলার আবু সুফিয়ান নিলয় (১৩),ফরিদপুরের রিয়াজুল কবির (১২), যাত্রাবাড়ীর সানি (৬), গাজীপুরের জুবায়ের ইসলাম (১৪) এবং বরিশালের নাজমুল (১০) ও মেহেদী (১০)। অপহরণের পর বিভিন্ন অঙ্কের মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেয় চক্রটি।
চার শিশুকে হত্যা
র‌্যাব জানায়, গত ১৭ জানুয়ারি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে আকাশ (১০) ও রূপগঞ্জের ভুলতা এলাকা থেকে নাজমুলকে (৯) অপহরণ করে চক্রটি। তাদের জাকিরের বাসায় রেখে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। চাহিদা অনুযায়ী মুক্তিপণের টাকা না পাওয়ায় শিশু দু’টির শরীরে মাত্রাতিরিক্ত চেতনানাশক ইনজেকশন প্রয়োগ করলে তাদের মৃত্যু হয়। পরে ওই দুই শিশুর মৃতদেহ কাঁচপুর ব্রিজের ওপর থেকে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
এছাড়া জাহিদ (১৮) ও জুয়েল ওরফে জাবেদ (১৯) হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত ছিল বলে স্বীকারোক্তি দেয় চক্রটি। তারা জানায়, মাদক বিক্রির টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট কোন্দলের কারণে জানুয়ারির শুরুর দিকে সিন্ডিকেটের সদস্য জাহিদকে (১৮) হত্যা করে জাকির ও দেলু। অন্যদিকে, প্রেমবিষয়ক দ্বন্দ্বের জের ধরে অনাবিল বাসের হেলপার জুয়েল ওরফে জাবেদকে খুন করে মোহাম্মদ হোসেন সাগর ওরফে বেলু ওরফে দেলু (২২)।