জাতীয় ঢাকা নারয়ণগঞ্জ প্রধান খবর সারাদেশ

নূর হোসেন ও শামীম ওসমান’র কে এই গৌরদা?

নূর-হোসেন ও শামীম-ওসমান

নারায়নগঞ্জ প্রতিনিধি: চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনার পর প্রধান আসামী নূর হোসেনের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের টেলিফোন কথোপকথনের এক পর্যায়ে ‘গৌরদা’ নামে এক ব্যক্তির নাম উঠে আসে। কথাবার্তার এক পর্যায়ে শামীম ওসমান গৌরদা’র সঙ্গে দেখা করতে বলেন নূর হোসেনকে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, গৌরদা’ই হয়তো নূর হোসেনকে ভারতে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলো।

গত ১৬ জানুয়ারি সাত খুন মামলার রায়ে প্রধান আসামী নূর হোসেন, র্যা বের চাকুরিচ্যুত তিন কর্মকর্তা তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও এমএম রানা সহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম সহ সাত জনকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। এরপর ৩০ এপ্রিল ৬ জন ও ১ মে আরেক জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ভয়াবহ ঘটনাটির পর থেকে আত্মগোপনে থাকা নূর হোসেন পালিয়ে চলে যায় ভারতে। ২০১৫ সালের ১৪ জুন ভারতের কলকাতায় ৩ সহযোগী সহ গ্রেফতার হয় সে। ওই বছরের ১২ নভেম্বর নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

২০১৪ সালের ২৩ মে শামীম ওসমানের সঙ্গে নূর হোসেনের টেলিফোন কথোপকথনের অডিও গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। অডিওতে শোনা যায়, নূর হোসেন ফোন করার পর শামীম ওসমান বলেন, ‘খবরটা পৌঁছাই দিছিলাম, পাইছিলা?’ জবাবে নূর হোসেন বলে, ‘পাইছি, ভাই।’ শামীম ওসমান বলেন, ‘তুমি অত চিন্তা করো না।’ নূর হোসেন এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, ‘ভাই, আমি লেখাপড়া করি নাই। আমার অনেক ভুল আছে। আপনি আমার বাপ লাগেন। আপনারে আমি অনেক ভালোবাসি, ভাই। আপনি আমারে একটু যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।’ জবাবে শামীম ওসমান ‘এখন আর কোনও সমস্যা হবে না’ বলে ‘গৌরদা’ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে নূর হোসেনকে দেখা করতে বলেন।

যদিও শামীম ওসমান ওই দিনই সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, তাদের ফোনালাপের পুরোটা প্রকাশ করা হয়নি, অনেক কিছু বাদ দেওয়া হয়েছে।

সম্ভাব্য ‘গৌরদা’র কথা জানা যায়। তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে মানব পাচারের অভিযোগ আছে।

গৌর সেন

যশোর শহরের টিবি ক্লিনিক রোডের সাবেক বাসিন্দা গৌর সেনের বাবার নাম জীবন সেন (জীবন মুহুরী)। ১৯৮০ সালে ৮ম শ্রেণিতে পড়ার সময় গৌর সেন একই শহরের ষষ্ঠীতলা পাড়ার সন্ত্রাসী আলমাসকে হত্যার চেষ্টা করে। ১৯৮৪ সালে ওই মামলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ১৯৯৪ বা ’৯৫ সালের দিকে মুক্তি পেয়ে আবার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে গৌর সেন। এসময় যশোরের চাঁনপাড়ার বাচ্চু-রশীদের সন্ত্রাসী দলে যোগ দেয় সে। এক পর্যায়ে রশীদকে শহরতলির মুড়লীতে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে। তবে পরে বিরোধী পক্ষের হাতে খুন হওয়ার ভয়ে পালিয়ে যায়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয়ে গিয়ে গৌর সেন যোগ দেয় সেখানকার কুখ্যাত সমাজবিরোধী কালা সাহার দলে। তার সঙ্গে সিন্ডিকেট করে চোরাচালানসহ অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে সে। ২০০০ সালের দিকে প্রতিপক্ষ স্বপন সাহার দলের হাতে খুন হয় কালা। সে বছরই স্বপন সাহার এক বিশ্বস্ত সহচরকে খুন করে বনগাঁ ত্যাগ করে গৌর সেন। বর্তমানে সে পশ্চিমবঙ্গের চাকদহে বাস করে।

গৌর বিশ্বাস

দ্বিতীয় সম্ভাব্য ‘গৌরদা’ হলো গৌর বিশ্বাস। এই গৌর পেশাদার খুনি হিসাবে কুখ্যাত। একসময় বনগাঁর ঢাকাপাড়ায় থাকলেও বছর দশেক আগে বনগাঁ ছেড়ে শিলিগুড়ি চলে যায় সে। সেখানে গড়ে তোলে সন্ত্রাসী দল। কিছু দিনের মধ্যে পুলিশের ‘ওয়ান্টেড’ তালিকায় নাম ওঠে তার। এক পর্যায়ে শিলিগুড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসে গৌর বিশ্বাস। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার ব্যাপারে কলকাতা পুলিশ বা বিএসএফ’র কাছে কোনও তথ্য নেই বলে জানিয়েছে বনগাঁর একটি সূত্র।

গৌর দত্ত

তৃতীয় জন গৌর দত্ত। লাকড়ির (জ্বালানি কাঠ) ব্যবসা করে জীবন শুরু করলেও এখন সে কোটি কোটি রুপির মালিক। থাকে বনগাঁর রেলবাজার এলাকায়। গৌর দত্তের বয়স প্রায় ৬০ বছর, গায়ের রং ফর্সা, উচ্চতা ৫ ফুট ৮/৯ ইঞ্চি, মাথায় টাক আছে। এখন কাঠের (লগ) ব্যবসা করে। বনগাঁ রেল বাজারের দিকে শ্বেতপাথরে তৈরি একমাত্র বাড়িটির মালিক সে। এক সময়ের সামান্য লাকড়ি ব্যবসায়ীর হঠাৎ করে এত অর্থবিত্ত এবং আলিশান বাড়ি নিয়ে বনগাঁ এলাকায় নানা কথা শোনা যায়। জানা গেছে, গৌর দত্ত মূল্যবান চন্দন কাঠের ব্যবসাও করে।