সারাদেশ

নাসিক নির্বাচন: মেয়র প্রার্থীদের বাকযুদ্ধ, সংঘর্ষে কাউন্সিলররা

4fa0e77ae9d152a54ecaba1bafe56d5e-5856109d91d2dহটনিউজ২৪বিডি.কম : আগামী ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন (নাসিক)। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে নির্বাচনি উত্তাপ ততটাই বাড়ছে। মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে ‘বাকযুদ্ধ’ ছাড়া এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও সহিংস ঘটনা ঘটেনি। তবে কাউন্সিলর প্রার্থীদের কারও কারও মধ্যে বিচ্ছিন্ন মারামারি হয়েছে। ভোটারদের আশা, শান্তিপূর্ণ এ অবস্থা ভোটের দিনও থাকবে। তবে অনেকে সহিংসতারও আশঙ্কা করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তারা নির্বাচনে যথার্থভাবে দায়িত্ব পালন করছে।

এবার নাসিক নির্বাচনে মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে মোট ২০১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে মেয়র পদে ৭ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৫৬ জন ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৩৮ জন রয়েছেন। ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন।

৫ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই মূলত আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শহরে উৎসব মুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। সিটি করপোরেশন এলাকা ছেড়ে গেছে পোস্টারে। প্রার্থীরা দিনভর ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। কাউন্সিলররা স্থানীয় অনেক সমস্যা সমাধানের কথা বললেও মেয়র প্রার্থীরা স্থানীয় ইস্যুর পাশাপাশি জাতীয় বিষয়গুলোকেও সামনে নিয়ে আসছেন। মাইকিংয়েও আনা হয়েছে বৈচিত্র্য। এবার গানের মধ্যেও চলছে প্রচারণা।

কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চললেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী ও বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানের মধ্যে চলছে ‘কথার লড়াই’। দুই প্রার্থীই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছেন। আবার কখনও বিরোধী দলীয় প্রার্থীর অভিযোগ খণ্ডন করছেন, কখনও পাল্টা অভিযোগ করছেন।

সাখাওয়াত হোসেনের অভিযোগ, আইভী তার হলফনামায় সম্পদের যে তথ্য দিয়েছেন তা সত্য না। তিনি সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। আইভী অনেক দুর্নীতি করেছেন। সে ব্যাপারে দুদক তদন্ত করে দুর্নীতির প্রমাণও পেয়েছে। এছাড়া শহরের ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদ করে তাদের পেটে লাথি দিয়েছেন। অন্যায়ভাবে ট্যাক্স বাড়িয়েছেন। শহর ময়লা আবর্জনাতে সয়লাব থাকে।

আইভী সাত খুনের ঘটনায় অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার কিংবা প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের পরিবারের পাশে দাঁড়াননি বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি প্রার্থী।

আর সাখাওয়াত সম্পর্কে আইভী বলেন, ‘সাখাওয়াত হোসেন নারায়ণগঞ্জ সম্পর্কে কিছুই জানে না। সে এই জেলার বাসিন্দাও নয়। সে অন্য জেলা থেকে কিছু বছর আগে এসেছে। সে নারায়ণগঞ্জের কোথায় খাল, কোথায় নদী আছে কিছুই জানে না। ট্যাক্স কার নিয়ন্ত্রণে এসবও জানে না। আমার তো মনে হয় তিনি অন্য কারও সুরে কথা বলছেন।’

বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘ ময়লা ডাম্পিংয়ের প্রক্রিয়া চলছে। আমি গত ৫ বছরে ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন করেছি। ৬০-৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।’

এদিকে, প্রচারণার শুরুতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও গত ৩-৪দিন ধরে কয়েকজন কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী ফয়েজউল্লাহ ফয়েজ জানান, মঙ্গলবার (১৩ ডিসেম্বর) রাতে প্রচারের সময়ে তার মাইক ভাঙচুর করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রবিউল হোসেন।

এ ওয়ার্ডের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী ও বর্তমান কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের অভিযোগ, মঙ্গলবার দুপুরে তার প্রচারের চালাতে একদল নারী বের হলে তাদেরকে বাধা দেন রবিউলের লোকজন। এছাড়া তার স্টিকার ও পোস্টারের উপর রবিউলের লোকজন পোস্টার সাটিয়ে দিচ্ছে, কখনও ছিড়ে ফেলছে। এ ব্যাপারে তিনি রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত চিঠিও দিয়েছেন।

তবে রবিউল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এগুলো স্ট্যান্টবাজি।

বুধবার (১৪ ডিসেম্বর) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন ১৮নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী কবির হোসেন। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না কালো টাকা দিয়ে ভোট কিনছে। এ বিষয়ে রিটার্নিং অফিসারকে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনও ফল এখনও পাননি।

তিনি আরও বলেন, ‘মুন্নার ভগ্নিপতি শাহজাহান বলেছে, ২০ কোটি টাকা খরচ করে হলেও আমাকে কবিরকে বাহিনীকে দিয়ে দেখে নেবে। এতে করে আমি শংকিত। এমতাবস্থায় আমার সহ আমার কর্মীরা আহত কিংবা নিহত হলে এজন্য দায়ী থাকবে মুন্না।’

এ ব্যাপারে মুন্না বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সত্য না। আমি কোনও কালো টাকার মালিক না। থাকলে দুদক অবশ্যই ব্যবস্থা নিত। তাছাড়া ২০ কোটি টাকা খরচের অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন।’

১১ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী যুবলীগ নেতা ওমর খৈয়াম চঞ্চল অভিযোগ করেন, সোমবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুরে তার ক্যাম্প ভাঙচুর করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন লোকজন। ভাঙচুরে সে আহত হলে তাকে হাসপাতালেও ভর্তি করা হয়। এখন সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

রবিবার (১১ ডিসেম্বর) রাতে সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলী এলাকাতে আওয়ামী লীগের একটি ক্যাম্প ভাঙচুরের অভিযোগ উঠে থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও কাউন্সিলর প্রার্থী আলী হোসেন আলার বিরুদ্ধে।

আলা হোসেনের দাবি, ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যুবকরা মাদকাসক্ত। তারা সেখানে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙিয়ে কলেজগামী ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করছিল।

আর শনিবার ২১ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী নূর মোহাম্মদ পনেছ ও হান্নান সরকারের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

নির্বাচন নিয়ে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে শহরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করলেও একটা ভয় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঠিকমত কাজ করছে না। এ কারণেই হয়তো বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটছে।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন বলেন, ‘আগামী ২২ ডিসেম্বর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোট মানুষ দিতে পারবে কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সরকারি আনুকূল্য ব্যক্তি পরিবেশকে বিঘ্ন করার চেষ্টা করছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সেনা মোতায়েন জরুরি।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই বলেন, ‘ভোটের পরিবেশ অনেক ভালো। মানুষ ভোট দিতে প্রস্তুত আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো।’

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মঈনুল হক বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমাদের বাহিনীগুলো সচেষ্ট আছে। প্রতিটি থানায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চলছে।’

জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়া জানান, নির্বাচনে স্থায়ী ১৭৪টি ও অস্থায়ী ৪টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। সাধারণ মানুষকে ভোটে উৎসাহিত করতে মাইকিংসহ বিভিন্ন সভা সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।

রিটার্নিং অফিসার মো. নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘১৭৪টি কেন্দ্রই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে ২৭টি ওয়ার্ডে ২৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে। কোনও প্রার্থী অভিযোগ দিলে সেগুলোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ১৭৪ কেন্দ্রের সবগুলোতেই ২৪ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর বাইরে র‌্যাব, বিজিবি ও ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত রাখা হবে। এ হিসাবে ৪ হাজার ১৭৬ জন পুলিশ, আনসার, এপিবি ও অঙ্গীভূত আনসার দায়িত্ব পালন করবেন।’