সারাদেশ

ভেস্তে গেছে রোহিঙ্গা শুমারির কার্যক্রম!

57ee2fe226d8e785cddbe981929ba284-58476b7717836হটনিউজ২৪বিডি.কম : সম্প্রতি মিয়ানমার সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের কারণে ভেস্তে গেছে রোহিঙ্গা শুমারির কার্যক্রম। এ কারণে রোহিঙ্গাদের সঠিক তালিকা প্রকাশে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে এই প্রকল্পের পৌনে ২২ কোটি টাকা ভেস্তে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রোহিঙ্গা শুমারি প্রকল্পের আওতায় মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের কারণ চিহ্নিতকরণ, অনিবন্ধিত নাগরিকদের একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরি, তাদের ছবি ও দলিলপত্র সংগ্রহ, বর্তমান অবস্থান, এদেশে অনুপ্রবেশের আগে মিয়ানমারের স্থায়ী বাসস্থান নিরূপণ এবং আর্থসামাজিক পরিসংখ্যান তৈরি করার মাধ্যমে শুমারির কার্যক্রম শুরু করে সরকার।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ২১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে অনিবন্ধনকৃত রোহিঙ্গা শুমারি প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উদ্যোগে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় প্রাথমিকভাবে এ কাজ সম্পন্ন করা হয়। সে সময় ৪৯টি জোনে ভাগ করে মিয়ানমারের জনগোষ্ঠির বসবাস রয়েছে এমন এলাকা চিহ্নিত করা হয়। কক্সবাজারসহ চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও পটুয়াখালী জেলাতেও রোহিঙ্গা শুমারির আওতায় তালিকা তৈরির কাজ চলে। এতে ১ হাজার ৯২ জন কর্মী (গণনাকারী), ১০৮ জন সুপারভাইজার ও ৪৯ জন জোনাল অফিসার মাঠপর্যায়ে শুমারির জন্য তালিকা তৈরির কাজ করেন। একইভাবে চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষের দিকে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু নানা কারণে রোহিঙ্গাদের সঠিক তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

পরিসংখ্যান ব্যুরো কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. ওয়াহিদুর রহমান বিদেশে অবস্থান করায় এ ব্যাপারে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) কক্সবাজার অফিসের প্রধান সানজুক্তা সাহানি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চলতি মাসেই রোহিঙ্গা শুমারির তালিকা প্রকাশ করার কথা ছিল। এখন নতুন করে শুমারি হবে কিনা এটি নির্ভর করবে সরকারের নির্দেশনার ওপর। আমরা তো সরকারকে সহযোগিতা করছি মাত্র।’

নতুন করে কতজন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে এমন প্রশ্নের জবাবে সাহানি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে জাতিসংঘ জানিয়েছে ১০ হাজার রোহিঙ্গা সম্প্রতি বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তবে বর্তমানে আমাদের (আইওএম) হিসাব মতে, এখন প্রায় ২১ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে।’

এদিকে স্থানীয়রা জানিয়েছে, টেকনাফের অনিবন্ধিত লেদা রোহিঙ্গা বস্তিতে গত এক সপ্তাহে আশ্রয় নিয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা। নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্প ও উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন স্থানে স্বজনদের কাছে কৌশলে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা। ফলে জেলার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় পুনরায় রোহিঙ্গা শুমারির কার্যক্রম শুরুর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
টেকনাফ উপজেলার লেদা রোহিঙ্গা বস্তির মাঝি নুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত এক মাসে শুধু লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই আশ্রয় নিয়েছে ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। প্রতিদিন সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ করে তারা আশ্রয়ের জন্য আসছে এই ক্যাম্পে।’

উখিয়া উপজেলার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি আব্দুর হাফেজ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘সম্প্রতি কতজন রোহিঙ্গা নতুন করে আশ্রয় নিয়েছে তা জানা নেই। তবে মিয়ানমারে সহিংসতার পর থেকে এই ক্যাম্পে আনুমানিক ৫ থেকে ৭ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।’ তিনি আরও জানান, এই ক্যাম্পে জায়গা না পেয়ে অধিকাংশ রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন গ্রামে আত্মীয়-স্বজন কিংবা পরিচিতদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।
কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে কোনও শরণার্থীর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ম ও বিধি-বিধান রয়েছে। যাতে করে কোনও শরণার্থী একটি নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে বসবাস করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে কোনও বিধিনিষেধ মানছে না শরণার্থীরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গারা দেশে অনুপ্রবেশের পর পরই তাদের খেয়াল খুশি অনুযায়ী যেখানে সেখানে চলে যাচ্ছে। এ কারণে রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কক্সবাজারসহ সারা বাংলাদেশে। ফলে কোনও সরকারি অফিসে শরণার্থীদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। গত কয়েক মাস আগে রোহিঙ্গা শুমারি কার্যক্রম পরিচালিত হলেও তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। এরই মধ্যে নতুন করে শরণার্থী দেশে অনুপ্রবেশ করায় রোহিঙ্গা শুমারির তালিকা প্রকাশে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।’

উল্লেখ্য, ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় সে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে সীমান্ত পুলিশের ১২ সদস্য নিহত হয়। সেই হামলার জন্য রোহিঙ্গা মুসলমানদের দায়ী করে আসছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। এরপর থেকে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে রোহিঙ্গাদের।