জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর সারাদেশ সাহিত্য

চলে গেলেন সৈয়দ শামসুল হক : নাগরিক শ্রদ্ধা ও দাফন আগামীকাল

sayed-haque_35919হটনিউজ ডেস্ক :  দেশের প্রধানতম সাহিত্যিক, সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি ও সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক (সৈয়দ হক) আর নেই (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। আজ মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তিনি রাজধানীর গুলশান ইউনাইটেড হাসপাতালের আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানান, ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী প্রথিতযশা লেখিকা ও ডাক্তার সৈয়দা আনোয়ারা হক এবং এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গণে শোকের ছায়া নেমে আসে। উভয় অঙ্গণের গুণীজনেরা তাঁকে একনজর দেখার জন্য হাসপাতালে ছুটে যান।
গোলাম কুদ্দুছ জানান, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে আগামীকাল সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কবির মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে রাখা হবে। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, পরে কবির মরদেহ হেলিকপ্টারে করে তার গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই তাকে দাফন করা হবে।
এদিকে সৈয়দ হকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোক জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ এমপি, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমীন চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, এলজিআরডি মন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেন, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহাজান খান সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ।
এছাড়াও শোক বার্তা দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তথ্য সচিব মরতুজা আহমদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদসহ আরো অনেকে। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে জাতীয় কবিতা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বহু সংগঠন কবির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে সব্যসাচী এ লেখক ইউনাইটেড হাসপাতালের ক্যান্সার কেয়ার সেন্টারের কনসালট্যান্ট ডা. অসীম কুমার সেনগুপ্তের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার চিকিৎসার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, তার ব্লাড প্রেসার খুব ‘লো’ হয়ে যাওয়ায় তা স্ট্যাবল করার চেষ্টা করেন। হাঁড় ও যকৃতসহ লেখকের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছিল। দ্রুত কবির স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে শুনে আজ দুপুরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা কবিকে দেখতে যান। বিকেলে দেখতে যান সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি ও নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।
হাসপাতালে কবিকে দেখতে গিয়ে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সৈয়দ শামসুল হকের চিকিৎসার সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কবির স্বাস্থ্যের অবস্থা দ্রুত অবনতি হচ্ছে জেনে আমরা চিকিৎসকদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কবিকে এখন বিদেশে নেয়া যাবে কি না- তারা বলেছেন, বিদেশে নেয়ার প্রয়োজন নেই। কবি ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল লন্ডনে যান। সেখানে রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে চার মাস চিকিৎসার পর গত ২ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরে আসেন।
লন্ডনে বিভিন্ন প্যাথলজি টেস্টে কবির ক্যান্সার ধরা পড়ে। সেখানে ক্যান্সারের চিকিৎসায় তাকে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দেয়া হয়। দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আজ ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে তার মরদেহ গুলশানে নিজ বাড়িতে নেয়া হবে। সেখান থেকে রাতেই আবার তাঁর মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, চলচ্চিত্র, গান, কাব্য নাট্যসহ সাহিত্যের সকল শাখায় সাবলীল সৃষ্টিশীলতায় কবি ‘সব্যসাচী লেখক’ হয়ে ওঠেন। সৈয়দ হক মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমী পুরস্কার অর্জন করেন। বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাওয়া সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে এ পুরস্কার লাভ করেছেন।
সৈয়দ হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ও মাতা হালিমা খাতুন। তিনি পিতা-মাতার ৮ সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। কবির ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর রচিত প্রথম পদ ‘আমার ঘরে জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে/ তাহার উপরে দুটি লাল পাখি বসিয়া আছে’। টাইফয়েডে শয্যাশায়ী অবস্থায় এগারো-বারো বছর বয়সে তিনি এ পদ’টি লিখেছিলেন।
সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কুড়িগ্রাম মাইনর স্কুল থেকে। সেখানে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। এরপর ভর্তি হন কুড়িগ্রাম হাই ইংলিশ স্কুলে। এরপর ১৯৫০ সালে গণিতে লেটার মার্কস নিয়ে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে তিনি ব্যক্তিগত খাতায় ২০০টির মতো কবিতা রচনা করেন। তার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালের মে মাসে। ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ পত্রিকায়। সেখানে ‘উদয়াস্ত’ নামে তাঁর একটি গল্প ছাপা হয়।
সৈয়দ হকের পিতার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে তিনি ডাক্তারি পড়াবেন। কিন্তু পিতার এ রকম দাবি এড়াতে তিনি ১৯৫১ সালে বোম্বে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি বছরখানেকের বেশি এক সিনেমা প্রডাকশন হাউসে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর ১৯৫২ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি জগন্নাথ কলেজে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী মানবিক শাখায় ভর্তি হন। কলেজ পাসের পর ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে স্নাতক পাসের আগেই ১৯৫৬ সালে সেখান থেকে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে বেড়িয়ে আসেন। এর কিছুদিন পর তার প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’ প্রকাশিত হয়।
তিনি একুশে পদক (১৯৮৪), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৬) ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৯), অলক্ত স্বর্ণপদক (১৯৮২), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), কবিতালাপ পুরস্কার (১৯৮৩), লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক (১৯৮৩), জেবুন্নেসা-মাহবুবউল্লাহ স্বর্ণপদক (১৯৮৫), পদাবলী কবিতা পুরস্কার (১৯৮৭), নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৯০), টেনাশিনাস পদক (১৯৯০) ও মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কার ২০১১ উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখা উপন্যাস নিষিদ্ধ লোবান অবলম্বনে চলচ্চিত্রকার নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘গেরিলা’ নির্মাণ করেন।