খুলনা

ক্ষমতার দাপট দেখাতে গিয়ে জনরোষের শিকার

রিপন হোসেন, যশোর প্রতিনিধি :ক্ষমতার দাপট দেখাতে গিয়ে জনরোষের শিকার হচ্ছেন যশোরের চৌগাছার বহু বিতর্কের জন্মদাতা উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম হাবিব। প্রায় শত বছরের পুরাতন চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে পাশ কাটিয়ে নিজের পিতার নামে মাত্র ১৫ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত চাঁনপাড়ার হাজী মোর্ত্তজ আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে মডেল স্কুলে রুপান্তরের চেষ্টার ঘটনা ফাঁস হয়ে পড়ায় নতুন করে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন এস এম হাবিব। একই সাথে একটি ডিও লেটারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদের ওপর ক্ষেপেছেন চৌগাছাবাসী। জনগণের ক্ষোভ থেকে রেহায় পাচ্ছেন না উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন মাতব্বরও। এলাকাবাসীর দাবি প্রয়োজনে তারা রক্ত দেবে তবুও এই অন্যায়ের সাথে কোন আপোষ নেই। যে কোন মুল্যে তাদের প্রাণের থেকে প্রিয় চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে মডেলে উন্নীত করতে চায়। এদিকে এই দাবি আদায়ের পক্ষে জনমত গঠন করতে দলমত নির্বিশেষে চৌগাছাবাসীর ব্যানারে আন্দোলন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে এই স্কুলের কৃর্তী প্রবীণ ও নবীণ শিক্ষার্থীরা।

দেশের শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে ২০০৮ সালে সরকার “ ৩০৬ মডেল স্কুল” নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। ৪৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের আওতায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব উপজেলা সদরের একটি করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে মডেল স্কুলে রুপান্তরিত করার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে শিক্ষার মান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই জন্য প্রতিটি স্কুলে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকাও বরাদ্ধ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় যশোরের চৌগাছা উপজেলা সদরের অবস্থিত ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিকে তালিকা ভুক্ত করে শিক্ষা মন্ত্রনালয়। এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপণও জারি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়। কিন্তু রাজনৈতিক টানাপোড়েনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে থাকে। চলতি অর্থ বছরে সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ফের উদ্যোগ গ্রহণ করে। খবর পেয়ে মাঠে নেমে পড়েন বিতর্কীত আওয়ামীলীগ নেতা এস এম হাবিব। তিনি চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি হওয়ার কারনে এ সংক্রান্ত একটি সরকারী আদেশ পত্র তার হস্তগত হয় গত বছরের শেষ দিকে। পত্রটি হাতে পাওয়ার পর তার টনক নড়ে। শাহাদৎ পাইলটের সভাপতি হওয়া সত্বেও এস এম হাবিব প্রতিষ্ঠান অপেক্ষা ব্যক্তি স্বার্থকে অনেক বড় করে তোলেন। তিনি ওই সরকারী আদেশ পত্রটি গোপন করে ফেলেন। কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্থলে নিজের পিতার নামে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হাজী মোর্ত্তজ আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিকে মডেল স্কুল বানানোর চক্রান্তে মেতে ওঠেন। এই কাজে তিনি স্থানীয় এমপি ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। হাজী মোর্ত্তজ আলী হাই স্কুলের পক্ষে এস এম হাবিব এমপিকে দিয়ে একটি ডিও লেটার ইস্যু করিয়ে নেন। ডিও লেটারে উল্লেখ করা হয়, “সরকারী এক আদেশে চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিকে মডেল স্কুলে রুপান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি চৌগাছা উপজেলা সদর থেকে সাড়ে ৪ কিলোমিটার দূরে অঁজ পাড়াগায়ে অবস্থিত। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয়। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ও শিক্ষাগত ফলাফল মোটামুটি। বিদ্যালয়টিকে ঘিরে একাধিক মামলা মোকর্দ্দমা রয়েছে। বিদ্যালয়টির স্থানীয় আয়ের উৎসও ভালো নয়। তাছাড়া লেখাপড়ার মান দিন দিন নিন্মমুখি।” “ অপর দিকে হাজী মোর্ত্তজ আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি উপজেলা সদরে অবস্থিত। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় থেকে বিদ্যালয়টির অবস্থান মাত্র ৫০০ গজ দূরে। এক মনোরম পরিবেশে অবস্থিত এই বিদ্যালয়টি বিগত কয়েক বছর ধরে উপজেলা সদরের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি লাভ করেছে। মাধ্যমিক স্তরের ফলাফলে উপজেলার সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি দিন দিন উন্নতির দিকে যাচ্ছে। তাছাড়া এই বিদ্যালয়ের বার্ষিক গড় আয় প্রায় কোটি টাকা। ফলে সব দিক বিবেচনা করে চৌগাছা শাহাদৎ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিবর্তে হাজী মোর্ত্তজ আলী মাধ্যমিক বিদ্যায়টিকে মডেল স্কুল প্রকল্পে অর্ন্তভুক্ত করার জন্য জোর সুপারিশ করছি।” সাংসদ মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদের এই ডিও নিয়ে এস এম হাবিব উপজেলা শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে হাজী মোর্ত্তজ আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিকে ৩০৬ মডেল স্কুল প্রকল্পে অর্ন্তভুক্ত করতে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে একটি আবেদন পত্র প্রেরণ করেন। আবেদন পত্রটিকে ঘিরে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন এস এম হাবিব। বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রীর নজরে গেলে তিনি তা নাকোচ করে পূর্ব ঘোষিত তালিকা অনুসারে চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিকে মডেল করার সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। কিন্তু এস এম হাবিব নাছোড়বান্দা। তিনি মন্ত্রনালয়ের বিভিন্ন সেক্টরে তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে এক পর্যায়ে শিক্ষা মন্ত্রীর ওই সিদ্ধান্ত পূর্ণ বিবেচনার আবেদন জানান। রাজনৈতিক ঘোরাটেপে এবার শিক্ষামন্ত্রীও ঘায়েল হয়ে যান। তিনি বিষয়টি তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন প্রদান করার জন্য চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান করে একটি ১ সদস্যের একটি কমিটি করে দেন। বিষয় জানতে পেরে ক্ষোভে ফেঁটে পড়েন শাহাদৎ পাইলটের নবীণ আর প্রবীণ শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মিক্ষা মন্ত্রী উপস্থিত হলে এ বিষয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। একান্তে মন্ত্রীকে গোটা ঘটনাটি বুঝানো হয়। বিষয়টি সরেজমিনে দেখার জন্যও মন্ত্রীকে অনুরোধ জানান ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত একাধিক শিক্ষানুরাগী। মন্ত্রী ধৈয্যসহকারে বিষয়গুলো শোনেন এবং চৌগাছাবাসীর প্রতি কোন অন্যায় করা হবে মর্মে আশ্বস্থ করেন। এদিকে যশোর শিক্ষা বোর্ডের ওয়েব সাইড থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, গত ৫ বছরের ফলাফলে চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের র‌্যাংকিংয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। জিপিএ ৫ প্রাপ্তি দিক দিয়েও এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধারে কাছে নেই কেউ। এছাড়া ৩৭ বিঘা জমির উপর ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি চৌগাছা উপজেলার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এই স্কুলে প্রায় ১ হাজারের বেশী ছাত্র ছাত্রী লেখাপড়া করছে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক গড় আয় প্রায় কোটি টাকার উপরে। আর হাজী মোর্ত্তজ আলী স্কুলটির অবস্থান দূরবিণ দিয়ে দেখার মতো। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে পশ্চিমে মাত্র ৫০ গজ দূরে চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান। আর হাজী মোর্ত্তজ আলী হাই স্কুলটি চৌগাছা গরীবপুর সড়কের চানপাড়া গ্রামে অবস্থিত। উপজেলা সদর থেকে এই স্কুলটির দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার দূরে। মাত্র দেড় বিঘা জমির উপর অবস্থিত এই বিদ্যালয়টি নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন এস এম হাবিব। শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে তিনি প্রায় কোটি টাকার বাণিজ্য করেন। অথচ সেই স্কুলটিকে উপজেলার শ্রেষ্ঠ স্কুল হিসেবে ডিও লেটার দিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন সাংসদ মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ। এদিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার দেলোয়ার হোসেন মাতব্বরকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি গত বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও উপজেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে বৈঠক করেন। তিনি বিষয়টি সুরাহা করার জন্য উপস্থিত সকলের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, দ্রুত এই বিতর্কের অবসান না হলে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যাবে। উপজেলার মানুষ একটি সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। এদিকে উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম হাবিবের এই হীন চক্রান্তের খবর ফাঁস হয়ে পড়ায় ক্ষোভে ফেঁটে পড়েছেন উপজেলাবাসী। সিংহঝুলি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগ নেতা জিল্লুর রহমান মিন্টু এই প্রসঙ্গে বলেন, দল কারোর একার নয়। একজনের ব্যক্তি ইচ্ছার পূরণের দায়ে দল ক্ষতি গ্রস্থ হতে পারে না। চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি উপজেলা বাসীর প্রাণের প্রতিষ্ঠান। যদি মডেল স্কুল বানাতে হয় তাহলে শাহাদৎ পাইলটের কোন বিকল্প নেই। অন্যথায় এমন প্রকল্পের কোন দরকার নেই। চৌগাছা ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, যদি চৌগাছার কোন স্কুলকে মডেল স্কুল বানাতে হয় তাহলে শাহাদৎ পাইলটের কোন বিকল্প নেই। এই স্কুলকে বাদ দিয়ে যারা ভিন্ন কিছু করার কথা ভাবছে তারা হয় বিকার গ্রস্থ না হয় উম্মাদ। চৌগাছা মৃধাপড়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ড.মুস্তানিছুর রহমান লাড্ডু এই প্রসঙ্গে বলেন, চৌগাছার সকল মানুষ চাই চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি মডেল বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করুক। আর মডেল হওয়ার মতো সব যোগ্যতা এই বিদ্যালয়টিতে বিদ্যমান। শুধু মাত্র ব্যক্তি স্বার্থে উপজেলা চেয়ারম্যান তার পিতার স্কুলটিকে মডেল স্কুল বানানোর হীন চক্রান্তে মেতে উঠেছ্ ে। তবে আমার বিশ্বাস চৌগাছার সচেতন নাগরিক সমাজ তা করতে দেবে না। প্রয়োজনে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। একই ধরনের মন্তব্য করেন প্রবীন শিক্ষাবিদ মিজানুর রহমান মধু , আওয়ামীলীগ নেতা দেওয়ান তৌহিদুর রহমান,দেবাশীষ মিশ্র জয়,আব্দুর রহিম, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা শাহাজাহান কবীর, উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক ছাত্রনেতা জহুরুল ইসলাম, চৌগাছা প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যক্ষ আবু জাফর,প্রেসক্লাব সেক্রেটারী রহিদুল ইসলাম খান, পৌর মেয়র সেলিম রেজা আওলিয়ার, চৌগাছা মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক কামাল আহম্মেদ বিশ্বাস প্রমুখ। এই প্রসঙ্গে ৩০৬ মডেল স্কুল প্রকল্পের পিডি রফিকুল ইসলাম বলেন, কোন স্কুলকে মডেল করার পূর্ব শর্ত হচ্ছে স্কুলটি উপজেলা সদর থেকে ২ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত হতে হবে। বিদ্যালয়টির নিজস্ব এক একর সম্পত্তি থাকতে হবে। বিগত ৩ বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষ জনক হতে হবে। এবং কমপক্ষে ৫শো ছাত্রছাত্রী থাকতে হবে। এই বিবেচনায় উপজেলার সেরা স্কুলটিকে মডেল স্কুলে রুপান্তরিত করা হবে বলে তিনি জানান। এদিকে এ বিষয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম হাবিব বা উপজেলা নির্বাহী অফিসার দেলোয়ার হোসেন মাতুব্বরের সাথে একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও মুঠো ফোনে তাদেরকে পাওয়া যায়নি।