চট্টগ্রাম

বিচারকদের সংশোধিত নতুন বেতন স্কেলে শুভংকরের ফাঁকি

শাহ মোহাম্মদ মাকসুদুল আলম, চাঁদপুর:নিম্ন আদালতের বিচারকদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ঘোষনা করা হলেও নিন্ম আদালতে কর্মরত দেশের জুডিশিয়াল সার্ভিসে কর্মরত বিচারকরা পুরোপুরি খুশি হতে পারেন নি। উপরন্তু তারা একে শুভংকরের ফাঁকি বলে মনে করছেন। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী বিচারকদের পদমর্যাদা নির্ধারণ না করায়ও বিচারকরা ক্ষুব্ধ এবং হতাশ। তারা চাইছেন হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা ও দায়রা জজগদের পদপর্যাদা কেবিনেট সচিব পর্যায়ে নির্ধারণ করে দেয়া হোক এবং ২০০৯ সালের ১ জুলাই থেকে প্রাপ্য বকেয়া সমস্ত বেতন-ভাতা প্রদান করা হোক।

অনেক চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগ স্বাধীন হিসেবে কাজ শুরু করে। পাকিস্তান শাসনামলে ১৯৫৭ সালে, দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭৬ সালে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। ১৯৯১ সালের ১৯ নভেম্বর দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আ’লীগ বিচার বিভাগ স্বাধীন করার বিষয়ে যৌথ ঘোষনা দেয়। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর মাজদার হোসেন বনাম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দায়ের করা এক রিট আবেদনের রায়ে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশন বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার জন্য ঐতিহাসিক এক রায় দেয়। ওই রায়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ১২ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু তারপরও কোন কাজ হয়নি। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ পর্যন্ত মাজদার হোসেন মামলার নির্দেশনা কার্যকর করতে সরকার ২২ বার সময় নেয়। কিন্তু তারপরও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ২০০১ সালে নির্বাচনের আগে দেশের শীর্ষ স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ঘোষণাপত্রে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার ঘোষনা দেয়। কিন্তু পরে বিএনপি ক্ষমতায় যেয়ে তা আর কার্যকর করে নি। শেষে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুনরায় সুপ্রিম কোর্টের সামনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি তুলে ধরলে ওই বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি অ্যাপিলেট ডিভিশনের ফুল কোর্ট বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয় এবং সে অনুযায়ী বিষয়টি অর্ডিনেন্স জারি করা হয়। শেষে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করে।

বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করা হলেও মাজদার হোসেন মামলায় যে ১২ টি নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল তার অধিকাংশই যথাসময়ে কার্যকর করা হয়নি। যেমন মাজদার হোসেন মামলার রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী গঠিত জুডিসিয়াল পে কমিশন ২০০৮ ও ২০০৯ সালে বিচারকদের যে বেতন-ভাতা প্রদানের সুপারিশ করেছিল, সরকার তার কিছুই কার্যকর করেনি। ইতিপূর্বে জেলা ও দায়রা জজদের বেতন যুগ্ম সচিবদের স্কেলে নির্ধারিত ছিল, কিন্তু পদমর্যাদা দেয়া হয়নি, এ নিয়ে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছিল। জেলা প্রশাসকরা আগের সব বেতন কাঠামো অনুযায়ী বরাবরই জেলা ও দায়রা জজগদের দুই ধাপ নিচের এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজগণের এক ধাপ নিচের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা এবং উভয় বিচারকই ডিসি/জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আপীল্যাট কর্তৃপক্ষ হওয়া সত্বেও ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী জেলা ও দায়রা জজদের পদমর্যাদা রাখা হয়েছে ডিসি’র সমপর্যায়ে রাষ্ট্রের ২৪ নম্বর অবস্থানে। অথচ ২০১০ সালের আতাউর রহমান বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ে হাইকোর্ট আদেশ প্রদান করেন যে, জেলা ও দায়রা জজরা কেবিনেট সচিবদের এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজরা তার পরবর্তী ক্রমিকের পদমর্যাদা লাভ করবেন।

দীর্ঘ সময় পর বর্তমান সরকার বিচারকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় এবং গত গত ২ জুন নতুন বেতন স্কেল ঘোষনা করে। এই বেতন স্কেল অনুযায়ী এখন থেকে বিচারকরা মাজদার হোসেন মামলার রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বেতন – ভাতা পাবেন। এতে বিচারকরা একদিক দিয়ে খুশী হলেও অন্যদিকে হতাশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন অনুবিভাগের প্রজ্ঞাপন দেখে। গত ২ জুন প্রকাশিত ওই প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সংশোধিত বেতন স্কেল ২০০৯ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গন্য হলেও বেতন নির্ধারনী সুবিধা ছাড়া চলতি বছরের ৮ এপ্রিলের আগের কোন বকেয়া আর্থিক সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ তারা ২ বছর ৯ মাসের কোন বকেয়া বেতন ভাতা পাবেন না। অন্যদিকে বিচারকদের পদমর্যাদা ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স সংক্রান্ত একটি আপীল মামলা সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

বিচার বিভাগকে দুর্নীতি ও কৌলুষমুক্ত রাখার জন্য বিশ্বের সভ্য দেশগুলোতে বিচারকদের সর্বোচ্চ বেতন-ভাতা, পারিতোষিক, গাড়ি-বাড়িসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়। দেয়া হয় বিশেষ সম্মাণ ও মর্যাদা। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতেও বিচারকদের বেতন স্কেল সর্বোচ্চ। পশ্চিমবঙ্গে একজন বিচারকের বেতন শুরুই হয় ২৭ হাজার ৭শ’ রুপি দিয়ে। যা পর্যায়ক্রমে বেড়ে ৪৪ হাজার ৭শ’ ৭০ রুপিতে যেয়ে দাঁড়ায়। অথচ সিভিল সার্ভিস থেকে অন্যান্য ক্যাডারে বেতন শুরু ২১ হাজার টাকা দিয়ে। সর্বোচ্চ বেতন যেয়ে দাঁড়ায় ৪২ হাজার রুপি। কিন্তু বাংলাদেশেই শুধু এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। এর ফলে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ নিয়ে প্রায়ই আপত্তিকর নানা কথা শোনা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কনিষ্ঠ বিচারক ক্ষোভের সাথে জানালেন, তিনি ১১ হাজার টাকা দিয়ে তার চাকুরি শুরু করেছেন। শহরের উপর বাসা ভাড়া দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে তার পক্ষে থাকা অসম্ভব। সংসারের চিন্তাতেই তার মাথা খারাপ হয়ে যায়। তারপরও সৎভাবে জীবন যাপন করার প্রানান্ত লড়াই তারা চালিয়ে যাচ্ছেন।