জাতীয় বরিশাল

প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই চলছে তাদের জীবন-জীবিকা

kalapara-01 (08-06-13) 04মেজবাহউদ্দিন মাননু, নিজস্ব সংবাদদাতা: প্রত্যেকটি মুহুর্ত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেচে আছেন কুয়াকাটা সৈকতের ৫০টি হতদরিদ্র জেলে পরিবার। সিডর, আইলা, মহাসেনের মতো দুর্যোগ এদেরকে দফায় দফায় নিস্ব করে দিয়েছে। হারিয়েছে বসবাসের ঝুপড়িঘর। মাছ ধরার নৌকা জাল থেকে সবকিছু। তারপরও জীবনযুদ্ধের সেনানী হয়ে লড়াই চলছে এদের। কেউ কেউ সিডর পরবর্তী সময়ে পুনর্বাসনের ঘরও পেয়েছিলেন। নিজের জমি না থাকায় আত্মীয় কিংবা পরিচিতজনের কারও বাড়িতে গিয়ে ওই ঘর তুলে দু’চার বছর বসবাস করছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু এখন যেমনি ওই ঘরে বসবাসের উপযোগিতা নেই। তেমনি কুয়াকাটায় জমির দাম বাড়ায় পড়শি কিংবা আত্মীয়রাও এখন আর থাকতে দিতে চাইছে না। সর্বশেষ মহাসেনের তান্ডবে এদের ঝুপড়িঘরও যায় বিধ্বস্ত হয়ে। এভাবেই জীবনের চরম ঝুঁক নিয়ে উত্তাল সাগরের রুদ্রমুর্তি দেখছে আর একেকটি দিন কাটছে এসব পরিবারের অন্তত তিন শ’ মানুষ। যার দুই তৃতীয়াংশ নারী ও শিশু। প্রকৃতপক্ষে এদের কর্মস্থলের কাছাকাছি কোন ধরনের আবাসন করে দিলেই শ্রমজীবি এই মানুষগুলো পারবে একটু নিশ্চিন্তে আশ্রয়স্থল। বাস্তবমুখি এমন পদক্ষেপ নেয়ার দাবি নি¤œআয়ের শ্রমজীবি জেলে পরিবারগুলোর।

সরেজমিনে না দেখলে কিংবা এদের সঙ্গে কথা না বললে তাদের দুরাবস্থার বাস্তবতা বোঝা মুশকিল। সর্বশেষ মহাসেনের সময় এরা কি করছিলেন-এমন প্রশ্নের উত্তর দিলেন চল্লিশোর্ধ ফরিদা বেগম। জানালেন, তারা সবাই সড়ক ও জনপদের বাংলোয় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। রাতে খাবার জোটেনি কারও। সকালে বাঁধের স্লোপের দোকানি নুরুল আলম বিস্কুট দিয়েছে। পৌর পরিচালনা কমিটির সদস্য শাহআলম দিয়েছেন মুড়ি আর খাবার পানি। এছাড়া দুপুরে জাতীয় পার্টির এক স্থানীয় নেতা আনোয়ার হোসেন প্রত্যেককে ১০ কেজি করে চাল দিয়েছেন। দুইদিন এসব মানুষের চালচুলো জ্বলেনি। আলগা, ইট দিয়ে বানানো চুলায় চলেছে রান্নার কাজ। এসব হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্যে কোন ধরনের ত্রাণ সামগ্রী জোটেনি। একই দাবি শাহনাজ বেগমের। স্বামী মফেজ মাঝিকে (৫০) নিয়ে তার চারজনের সংসার। জানালেন, মহাসেনে তার আটটি বেহুন্দি জাল গেছে। তবে নৌকাটি তাল গাছের সঙ্গে বেধে রাখায় রক্ষা পেয়েছে। চারজন ভাগিদার নিয়ে মফেজ মাঝি জীবিকার ছাকা ঠেলছেন। সর্বশেষ যেদিন কথা হয় (৫জুন) সেদিন আড়াই কেজি সাদা চিংড়ি ও ১০ কেজি টাইগার চিংড়ি পেয়েছেন। যা এক হাজার টাকায় বিক্রি করে ভাগাভাগি করে নিলেন চারজনে। মহাসেনের তান্ডবে যে সাগর সব কেড়ে নিয়েছে সেই সাগরেই আবার পেটের যোগানের জন্য ১৪দিন পরে নামলেন বলে মফেজ মাঝির দাবি। ষাটোর্ধ রওশন আরার স্বামী আছমত আলী এখন অসুখে ভুগছেন। ঘরে বেকার পড়ে আছেন। উল্টো রওশন আরার বোঝা হয়ে আছেন। তার ভরন-পোষনের ভারও তার উপরে। এক ছেলে নিজামকে (২২) নিয়ে রওশন আরার তিনজরে সংসার। নিজাম ছেড়া জাল কিংবা নতুন জাল বুনে সংসারের চাঁকা ঠেলছেন। রওশন আরাও ছোটখাটো কাজ করেন। কিন্তু স্বামীর চিকিৎসা কিভাবে করাবেন তা ভেবে মুখ মলিন করে ফেললেন। আরমান হকের বয়স এখন ৬০ বছর। স্ত্রী আজিমন্নেছাকে নিয়ে চারজনের সংসার। এখন আর আজিমন্নেছার সংসারের চাকা ঘোরে না। ফরিদা বেগমের (৪৫) এখন আয়-রোজগার নেই। কেন না কুয়াকাটায় কোন পর্যটক নেই। পর্যটক থাকলে হোটেলের রান্না করেন চুক্তিভিত্তিক। স্বামী সোহরাব হাওলাদার কামলা দেন। দিনমজুর। সিডরের পরে একটি ঝুপড়ি ঘর তুলে নবীনপুর গ্রামে বোন তাছলিমার বাড়িতে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন ঘরটি বাসের অনুপযোগী হওয়ায় এবং কর্মস্থলের অনেক দুরে থাকায় আবার সৈকতের বেলাভূমের বস্তিতে থাকছেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের যেদিন কাজ জোটে সেদিন খাবার জোটে নইলে উপোস। অর্ধাহার নিত্যসঙ্গী এই পরিবারটির। বড় ছেলে ফারুক পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার পর অনটনের কারনে এখন ভাড়ায় টমটম চালায়। তিন ছেলের মেঝ মোশাররফকে মানুষ করার অনেক আশা নিয়ে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। এবছর এইচএসসিতে পড়ছে। সবার ছোট রাসেল পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ছে। এই পরিবারটি বস্তির মধ্যে যেন টিপ টিপ করে আলো ছড়ানোর কাজ করছেন। ফরিদা জানালেন, দেনার ভারে তারা কাহিল। সিডর থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগে এখন দিশেহারা। এক মহাজন তিন লাখ ৮৫ হাজার টাকা পাবেন। একারণে তার স্বামীকে ডেকে নিয়ে প্রায় সময় আড়তে নিয়ে বসিয়ে রাখা হয়। মহজনের দেনার পাশাপাশি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা আশা থেকে ২২ হাজার, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার এবং ব্র্যাক থেকে ৪৫ হাজার টাকা লোন এনেছেন। এসব দিয়ে একজন মহাজনের কিছু টাকা শোধ দিয়েছেন। এই পরিবারটি এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। স্বামী পরিত্যক্তা নুরুন্নাহার জানালেন বিয়ের পরে স্বামী হারুনকে নিয়ে সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু একটি সন্তান কোলে আসার পরে স্বামী নামের পাষন্ড উধাও, এখন নিরুদ্দেশ। স্বামী নামটি জীবনের হিসাব থেকে মুছে ফেলেছেন সুশ্রী নুরুন্নাহার। এখন সন্তান চার বছরের শিহাবকে নিয়ে বাবা-মায়ের সংসারে ঝুলে আছেন নুরুন্নাহার। সাত বছর আগের বিয়ের এই ঘটনা নুরুন্নাহার আর ঘাটতে চাননা। সাগরপাড়ে থেকে আনা বিভিন্ন ধরনের টাটকা মাছ কাটাকুটি করছিলেন আর বলছিলেন তাদের জীবনযাত্রার এবড়োথেবড়ো চলার পথের কথাগুলো। কখনও মলিন মুখে, আবার কখনও ফ্যাকাশে মুখের বাঁকা হাসি দিয়ে। এভাবেই ঝড়ঝঞ্ঝা, জলোচ্ছ্বাস আর নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবেলা করে বছরের পর বছর এমনকি যুগ পেরিয়ে কেউবা তিনযুগ ধরে পড়ে আছেন কুয়াকাটা সৈকতের জেলে পল্লীতে। তবে ৫০টি জেলে পরিবারকে এখনই বেড়িবাঁধের ভিতরে একটি আবাসন করে পুনর্বাসন করা জরুরি প্রয়োজন। নইলে সিডরের মতো প্রকৃতির বুলডোজারখ্যাত ঘুর্ণিঝড় সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে প্রায় তিন শ’ মানুষকে সাগর অতলে বিলীন করে দেয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এসব পরিবারের দাবি এটাই তাদের কর্মস্থলের কাছাকাছি জায়গায় পুনর্বাসন করা হোক। নইলে জীবিকার সঙ্কট থাকবে। কেনই বা চরম ঝুঁিকতে এইসব পরিবার বসবাস করছে এর কোন সঠিক উত্তর প্রশাসন থেকে খুঁেজ পাওয়া যায়নি। তবে রহস্যাবৃত এক জনপ্রতিনিধি নব্য কোটি কোটি টাকার মালিব বনে যাওয়া পৌর পরিচালনা পরিষদের সদস্য আব্দুল বারেক মোল্লা জানান, এদেরকে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তবে মহাসেনের পরবর্তী কেন এদেরকে কোন ধরনের সহায়তা দেয়া হয়নি তার কোন উত্তর খুঁেজ পাওয়া যায় নি।