ভোলা সারাদেশ

দখলে-দূষণে ভোলা খালের বারোটা

Pic--(1)--08--01--15এম. শরীফ হোসাইন, ভোলা প্রতিনিধি : দখলে-দূষণে ছোট হচ্ছে ভোলা খাল। এতে নৌ-পথে শহরে ঠিকমতো পণ্য আনা-নেওয়া করা যাচ্ছে না। মালবোঝাই কার্গোজাহাজ খালের প্রবেশমুখে দিনের পর দিন আটকে থাকছে। পানিসংকটে সদর উপজেলার প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষক।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মূল খালের দুপাশ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ ব্যবসায়ীরা দখল করে খালের প্রস্থ কমিয়ে ফেলেছেন। খালের মধ্যে ভোলা বাজারের কসাইখানার গোবর, কাঁচাবাজারের আবর্জনা, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য, ইট-মাটির জিনিসপত্র এবং রেস্তোরাঁর আবর্জনা, চাতালের ছাই ইত্যাদি ফেলা হচ্ছে। লাশ কাটা ঘর থেকে বাংলা স্কুল সেতু পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার পাইপ খালের মধ্য দিয়ে টেনে বালু নেওয়ার সময় প্রায়ই পাইপ খুলে বালু পানিতে পড়ছে। পৌরসভার শতাধিক নালা এবং অনেকগুলো শৌচাগারের সংযোগ খালে দেওয়া আছে। এভাবে খালটি নাব্যতা হারিয়েছে।
ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, বর্তমানে ভোলা খালের মূল অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার। এর শাখা-প্রশাখার দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০-৪৫ কিলোমিটার। খালটি মেঘনা থেকে উঠে শিবপুর, রতনপুর, ভোলা পৌরসভার চরজংলা, বাপ্তা, চরনাপ্তা, চরনোয়াবাদ, সদুরচর ও পূর্বচরকালী মৌজা হয়ে খেয়াঘাট নদে মিশেছে। সর্বশেষ আশির দশকে পাউবো একবার খালটি খনন করেছিল। ৩৫ বছরের মাথায় এসে খালের সবটুককু খনন দাবি করছেন উপকারভোগী কয়েক হাজার কৃষক ও ব্যবসায়ী।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ভোলা খালের সঙ্গে আট-নয়টি শাখা খাল চর সামাইয়া, পশ্চিম ইলিশা, বাপ্তা, শিবপুর ও ধনিয়া ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে। শুকনো মৌসুমে এসব ইউনিয়নের রবি ও বোরোচাষিরা সেচ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছেন না। খাল খনন না করায় এসব ইউনিয়নের দুই হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ কম হচ্ছে। গত ৪ আগস্ট ভোলা সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার জরিপ করে চিঠিতে জেলা প্রশাসককে জানিয়েছেন যে সদর উপজেলাধীন ভোলা খাল পৌরসভার নামে রেকর্ড করা। ওই খালের দু-পাশে ১শ’ ৬টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে।
ভোলা খাল দিনমজুর ভাসান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হাদিসুর রহমান সরদার বলেন, শুকনো মৌসূম এলেই ভাটার সময় খালটি শুকিয়ে যায়। পণ্যবাহী আল মতিন নামক কার্গোর কর্মচারী কাঞ্চন বলেন, বর্ষা মৌসূমে ঢাকা থেকে এসে প্রতি সপ্তাহে পণ্য খালাস করা যায়। এখন মাসে দু-একবার পণ্য আনতে পারছেন। মাসের বেশির ভাগ সময় জাহাজ ভোলা খালের মুখে আটকে থাকে।
ভোলা জেলা মুদি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. বাবুল বলেন, ভোলা খালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য। কার্গো ও নৌকা বোঝাই করে ব্যবসায়ীরা পণ্য খাল দিয়ে আনা-নেওয়া করেন। খালে পানি না থাকায় প্রতি বস্তা মালে বাড়তি ৫০ থেকে ৭০ টাকা খরচ হচ্ছে।
জেলা ধান-চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এরফানুর রহমানসহ কমপক্ষে ২০ জন ব্যবসায়ী জানান, যশোর, নোয়াপাড়া, পাবনা ও ভোলার ল্যাতরা-আইচা থেকে চালভর্তি কার্গো ভোলা খালের মুখে আসতে সর্বোচ্চ দুদিন সময় লাগে। আর ভোলা খালে ঢুকে আড়তের সামনে আসতে সাত দিন সময় লাগে।
নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক মো. শাজাহান বলেন, ‘ছোটবেলায় এই খালে নৌকায় চড়ে চরফ্যাশন গিয়েছি। তারও আগে এটি “বেতুযা” নদী নামে পরিচিত ছিল। আজ সেটি নর্দমায় পরিণত হয়েছ।’
২০ বছর ধরে খাল বাঁচানোর আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মোবাশ্বির উল্যাহ চৌধুরী বলেন, দখলে-দূষণে ভোলা খাল নালায় পরিণত হয়েছে, যা ভোলাবাসীর জন্য চরম সংকটের।
ভোলা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন আরজু বলেন, পৌরসভা ২৫ লাখ টাকার খাল খনন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিদেশ থেকে একটি খননযন্ত্র আসছে। এক মাসের মধ্যে খননকাজ শুরু হবে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. সেলিম রেজা বলেন, দখল-দূষণ মুক্ত করে খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।