জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর রাজনীতি

সংঘাত চাই না, শান্তি চাই – শেখ হাসিনা

 নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে শান্তির ধারা অব্যাহত থাকুক। সংঘাতমুক্ত দেশে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষ ভালো থাকুক, এমন প্রত্যাশা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার বিকেলে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা চাই সুন্দর বাংলাদেশ। সংঘাত চাই না আমরা, শান্তি চাই। বাঙালি জাতির একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চাই আমরা। সুন্দরভাবে দেশ গড়ে উঠুক, বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হোক- এটাই আমাদের লক্ষ্য।’ তিনি আরো বলেন, বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য অসাম্প্রদায়িকতা। ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে মানুষে মানুষে মিলন হবে- এটাই বাঙালি সংস্কৃতির মূল কথা। আজ মাঝেমধ্যে নিজের মনেই প্রশ্ন জাগে, বাঙালি জাতি কি তার সংস্কৃতির মূলধারা থেকে বিচ্যুত হচ্ছে? হয়তো কোনো একটা গোষ্ঠী। ‘নববর্ষ বাঙালির নিজস্ব উৎসব। প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে এক হয়ে উদ্‌যাপন করে বাঙালি। বাংলাদেশ এ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটাই বাঙালির শাশ্বত ঐতিহ্য। আবহমানকাল ধরে চলমান অসাম্প্রদায়িকতার চমৎকার এ পরিবেশ বিরাজমান থাকুক, এটাই সবার আকাঙ্ক্ষা।’ যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন,  জঙ্গিবাদ, ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা- এসব বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই নয়। মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, অতিথিপরায়ণতা হচ্ছে বাঙালির আদর্শ। বাঙালির তো কখনোই সম্পদের প্রাচুর্য ছিল না। কিন্তু অল্পতে তুষ্ট বাঙালি জীবনকে উপভোগ করার কৌশল জানত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। ধর্মের লেবাসধারীরা ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা করছে। আমরা গত বছর দেখেছি, কীভাবে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের চত্বরে পবিত্র কোরআন শরিফে আগুন দেওয়া হয়। জাতীয় মসজিদ তছনছ করা হয়। তার পরও তারা কীভাবে নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করে?’

‘একমাত্র আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্যই এসব অমানবিক আচরণের পরিবর্তন আনতে পারে’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘শিল্পী-সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবীদের এ ব্যাপারে আমি আহ্বান জানাই, তারা যেন আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেন। নিচু ও সংর্কীণ মানসিকতার বিরুদ্ধে মানুষের চেতনাকে আরো জাগ্রত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষের মূল্যবোধকে আরো জাগ্রত করতে হবে।’

১০০ বছর আগে ১৯১৪ সালের এই দিনে কিশোরগঞ্জ জেলায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা, এ দেশের মানুষের প্রতি ব্রিটিশদের চরম অবহেলার চিত্র ফুটিয়ে তোলেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের স্কেচ করেন জয়নুল আবেদিন। ১৯৭০ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মহাপ্রলয়ের ক্ষয়ক্ষতি, মানুষের দুঃখদুর্দশায় জয়নুল আবেদিন আঁকলেন তার বিখ্যাত ছবি ‘মনপুরা-৭০’। ৩০ ফুট দীর্ঘ এই শিল্পকর্মে শিল্পী সাইক্লোনের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ়চেতা মনোভাব তুলে ধরেন।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১৯৭০ সালে ফিলিস্তিন সফর করে যুদ্ধক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের স্কেচ এঁকে বিভিন্ন আরব দেশে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছিলেন। এভাবে তিনি ফিলিস্তিনিদের ন্যায়সংগত দাবির প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে জয়নুল আবেদিনের এসব অবদানের কথা স্মরণ করেন।

বাঙালির মুক্তির আন্দোলনে জয়নুল আবেদিনে অবদানের কথা বলতে গিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুলের অবদানের কথাও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। জয়নুল আবেদিন ও কাজী নজরুলের মিল তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একজন শব্দের কারুকার্যের মাধ্যমে অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করেছেন। অন্যজন রং-তুলির আঁচড়ে সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চনাকে তুলে ধরেছেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, বাংলাদেশের শিল্পসংস্কৃতির অঙ্গনে নানা ক্রান্তিকালে তিনি নেতৃত্বও দিয়েছেন।

তিনি বলেন, শিল্পাচার্য ১৯৪৩ সালের দুভিক্ষ শীর্ষক চিত্রমালার জন্য সারা বিশ্বে খ্যাতিলাভ করেছেন। তার নৌকা, সংগ্রাম, নবান্ন, মনপুরা-৭০, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রভৃতি শিল্পকর্ম একদিকে বাংলার নিসর্গ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে যেমন ফুটিয়ে তুলেছে, তেমনি বাঙালির জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি এসব শিল্পকর্মে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

বছরব্যাপী জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শিল্পাচার্যের শিল্পকর্ম দেখার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি দর্শক আমাদের বিশ্বমানের শিল্পকলা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবেন। নবীন শিল্পীরা উৎসাহিত হবেন। এ আয়োজন পরবর্তী প্রজন্মকেও আরো উজ্জীবিত করবে। আমাদের শিল্পাঙ্গন সমৃদ্ধ হবে।’

পরে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শিল্পার্চায জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপনের বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন ঘোষণা করেন শেখ হাসিনা।