জাতীয় রাজনীতি সিলেট হবিগঞ্জ

হবিগঞ্জ রণক্ষেত্র, গউছ কারাগারে, ওসিসহ আহত শতাধিক

 হবিগঞ্জ প্রতিনিধি : প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলার চতুর্থ চার্জশিটভুক্ত আসামি হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র, জেলা বিএনপির সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য জি কে গউছকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

রোববার সকাল ১০টার দিকে গউছ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রোকেয়া আক্তারের আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করলে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শুনানি শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এদিকে, এ ঘটনার জেরে হবিগঞ্জ শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। গউছের জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ায় পুলিশের ওপর চড়াও হয় স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। এতে সদর থানার ওসি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। সংঘর্ষ চলাকালে ১০টি গাড়িও ভাঙচুর করে গউছ সমর্থকরা। এ সময় ১০ জনকে আটক করে পুলিশ।

অন্যদিকে, দুপুরে সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীও হবিগঞ্জ আদালতে আত্মসমর্পণ করতে পারেন- এমন গুঞ্জনে শহরজুড়ে বিরাজ করছে টান টান উত্তেজনা। বেলা একটার দিকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল কর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ চলছিল।

আদালতে জি কে গউছের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী সউদুল বর চৌধুরী আরিফ ও অ্যাডভোকেট এম এ মজিদসহ বেশ কজন আইনজীবী জামিন শুনানিতে অংশ নেন।

অন্যদিকে, বাদীপক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট আলমগীর ভূঁইয়া বাবুলসহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী।

এর আগে, আদালতে জি কে গউছের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন হবিগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অধিকাংশ কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারী এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন।

সকাল ১০টার দিকে জি কে গউছ গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর পরিবারের সদস্যরা কোর্টে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

উল্লেখ্য, বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় ২০০৫ সালের ১৯ মার্চ সিআইডির প্রাক্তন এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ১০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রথম চার্জশিট দাখিল করেন। ওই চার্জশিটে জিয়া স্মৃতি ও গবেষণা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সহসভাপতি আবদুল কাইয়ুম, জেলা বিএনপি কর্মী ও ব্যাংক কর্মকর্তা আয়াত আলী, কাজল মিয়া, জেলা ছাত্রদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক সেলিম আহমেদ, জিয়া স্মৃতি গবেষণা পরিষদ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাহেদ আলী, কর্মী তাজুল ইসলাম, বিএনপি কর্মী জয়নাল আবেদীন, স্থানীয় বিএনপি নেতা জমির আলী, ওয়ার্ড বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদীন মোমিন ও ছাত্রদল কর্মী মহিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করা হয়। ২০০৬ সালের ৩ মে মামলার বাদী অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান সিলেট দ্রুত বিচার আদালতে নারাজি আবেদন করেন। আদালত আবেদন খারিজ করলে ওই বছরের ১৪ মে বাদী হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সরকারের প্রতি ‘কেন অধিকতর তদন্ত করা যাবে না’ মর্মে রুল জারি করেন। এই রুলের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালের ১৮ মে লিভ টু আপিল করে সরকার। আপিল বিভাগ সরকারের এ আপিল খারিজ করেন। এরপর ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ মামলার অধিকতর তদন্ত শুরু হয়। দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলামকে। অধিকতর তদন্ত করে ২০১১ সালের ২০ জুন আরো ১৪ জনকে আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট প্রদান করেন সিআইডির এএসপি রফিকুল ইসলাম। সম্পূরক চার্জশিটে অভিযুক্তরা হলেন প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, লস্কর-ই-তাইয়েবার সদস্য আবদুল মজিদ কাশ্মীরি, প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, মহিউদ্দিন অভি, শাহেদুল আলম দিলু, সৈয়দ নাঈম আহমেদ আরিফ, ফজলুল আলম মিজান, মিজানুর রহমান মিঠু, মোহাম্মদ আবদুল হাই, মোহাম্মদ আলী, মুফতি সফিকুর রহমান, বদরুল এনায়েত, মো. বদরুল ও বদরুল আলম মিজান।

২০১১ সালের ২৮ জুন কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া চার্জশিটের ওপর হবিগঞ্জের জুডিশিয়াল কোর্টে নারাজি আবেদন করেন। ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্তের চার্জশিটের নারাজি আবেদন গ্রহণ করেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। এরপর নতুন করে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডির এএসপি মেহেরুন নেছা পারুলকে।

এ মামলার অন্যতম আসামি হারিছ চৌধুরী পলাতক।

প্রসঙ্গত, ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যেরবাজারে আওয়ামী লীগের জনসভা শেষে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা শাহ এ এম এস কিবরিয়া, তার ভাতিজা শাহ মনজুরুল হুদা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী ছিদ্দিক আলী, আবদুর রহিম ও আবুল হোসেন। এতে হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি ও বর্তমান সাংসদ মো. আবু জাহির, অ্যাডভোকেট আবদুল আহাদ ফারুক, আবদুল্লাহ সর্দারসহ আহত হন আওয়ামী লীগের আরো ৭০ নেতা-কর্মী। এ ঘটনায় জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন।