সাহিত্য

নাইম আবদুল্লাহর ছোটগল্প

সকাল থেকেই আষাঢ়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঘুম থেকে উঠেই বৃষ্টি দেখে শাহেদের মনটা খারাপ হয়ে গেল।আজ তার একটা চাকরির ইন্টারভিউ আছে। কাক ভেজা হয়ে ইন্টারভিউ বোর্ডে যেতে হবে। অবশ্য টিপটপ হয়ে গেলেও তার আগে কোনো চাকরি হয়নি। মিরপুর থেকে বাসে চেপে সে দশটার কিছু আগে মতিঝিল অফিসে পৌঁছল। ওয়েটিং রুমে বসে রুমাল দিয়ে যথাসম্ভব মাথা মুখ মুছলেও শার্ট প্যান্টের পানির দাগ মোছা গেলনা। রিসিপশনে বসে থাকা মিষ্টি চেহারার একটি মেয়ে গোমড়া মুখে তার নাম ডাকলো। শাহেদ ভেবেই পায় না এত মিষ্টি চেহারার একটি মেয়ে এতো গোমড়া মুখে থাকে কীভাবে?

সে আট মিনিট পর ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে বের হয়ে নিশ্চিত হল যে তার এই চাকরিটাও হবেনা। শাহেদ গোমড়ামুখীকে একটু রাগিয়ে দেয়ার জন্য বলল, আপু এক গ্লাস পানি পাবো? গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

মেয়েটা সামনে রাখা ফাইল থেকে মাথা না উঠিয়ে বলল, এটা রেস্টুরেন্ট না যে চাইলেই পানি পাবেন। একথা শুনে আশেপাশের সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।

পাশে থাকা মেয়েটার বোতল দেখিয়ে শাহেদ বলল, আপনার বোতলটা থেকে দেন। পানি চাইলে পানি দিতে হয়, তা না হলে মরণের আগে পানি চাইলে পানি পাবেন না। মেয়েটি আরও গম্ভীর ভঙ্গিতে উত্তর দিল- পানি না পেলে কোল্ড ড্রিংক বা আইসক্রিম চাইবো। চারিদিকে আবার হাসির রোল পড়ে গেল।

সপ্তাহখানেক পরে শাহেদ চিঠিতে জানতে পারলো প্রিলিমিনারি সিলেকশন টিম তাকে লিখিত পরীক্ষার জন্য মনোনিত করেছে। ওইদিন হরতাল থাকায় সে অনেক কষ্ট করে পরীক্ষার ঠিক মিনিট পাঁচেক আগে রিসিপশনে হাজির হলো। বোর্ডে ঢোকার আগে পকেটে হাত দিয়ে দেখে কলম নেই। শাহেদের বুকের ভেতরটা ধবক করে উঠে। আজ মেয়েটা আগের দিনের চেয়ে আরও গোমড়া মুখে বসে আছে। সাহস করে এগিয়ে এসে বলল, আপু একটা কলম পাওয়া যাবে? উত্তর এলো, এটা কোনও স্টেশনারি দোকান নয় যে এখানে কলম পাওয়া যাবে। ফিরে যাবে না রুমে ঢুকবে সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে শাহেদ রুমে ঢুকে দেখে প্রত্যেক খাতার সাথে একটি করে কলম দেয়া আছে। শাহেদ পরীক্ষা শেষে কলম হাতে রিসিপশনে এসে দাঁড়ায়। তারপর মেয়েটির দিকে কলমটি এগিয়ে দিয়ে বলে, আপনার কাছ থেকে ধার করা কলমটি ফেরত দিয়ে গেলাম। মেয়েটি তখন ডেস্ক থেকে শাহেদের হারিয়ে যাওয়া কলমটি তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, খুব সাবধানে রাখবেন। শাহেদ নিজের কলমটা চিনতে পেরে লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিলো।

কিছুদিন পরে আবার চিঠি পেয়ে ফাইনাল ইন্টারভিউ এর জন্য হাজির হলো। রিসিপশনে অন্য একটি হাস্যময়ী মেয়েকে দেখে শাহেদের মনটা খারাপ হয়ে গেল। ইন্টারভিউ বোর্ডে ঢুকে সে রীতিমতো ভড়কে গিয়ে ঘামতে শুরু করলো। চার সদস্যের সিলেকশন কমিটির অন্যতম একজন মিষ্টি চেহারার গোমড়ামুখী সেই রিসিপশনের মেয়েটা। সে মিষ্টি হেসে বলল, শাহেদ সাহেব, আপনার সামনে কাগজ কলম আর এক বোতল পানি আছে। আপনাকে যদি এখন একটি প্রশ্নপত্র দিয়ে পরীক্ষা শুরু করতে বলা হয় আপনি কীভাবে শুরু করবেন? খুব চিন্তা করে তারপর উত্তর দিবেন। আমি আপনাকে একটু হিন্স দিয়ে সাহায্য করতে পারি। উত্তরটা হতে হবে সম্পূর্ণভাবে আপনার এখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শাহেদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে বলল, আমি প্রথমে প্রশ্নগুলো খুব ভালো করে পড়ে তারপর কলম খুলে সহজ উত্তরগুলো আগে লেখা শুরু করবো।

মেয়েটি আবার মিষ্টি হেসে বলল, শাহেদ সাহেব, আমরা আপনার উত্তরটি নিতে পারছি না বলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আপনি যেহেতু ঘামছেন সঙ্গত কারণে পানির বোতল থেকে পানি পান করে তারপর প্রশ্নপত্রের উত্তর শুরু করা সমীচীন ছিল।

কয়েক বছর পর এক বর্ষণ মুখর রাতে শাহেদ কক্সবাজার হোটেল পর্যটনের রিসিপশন ডেস্কে কাজ করছে। একজন মিষ্টি চেহারার মেয়ে এগিয়ে এসে দুদিনের জন্য একটি ডাবল বেডরুম চাইলো। দলের অন্য দুজন মেয়ে ক্লান্তিতে পাশের সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে। শাহেদ মেয়েটিকে অপেক্ষাতেই রেখে রুম খুঁজতে গিয়ে দেখল কোনো রুম খালি নেই। তবে ঘণ্টা দু’এক পরে একটা রুম খালি হতে পারে।

মেয়েটিকে তা জানানোর পর তারা অপেক্ষা করতে রাজি হলো। একটু পরে সোফা থেকে আগের মেয়েটি উঠে এসে এক বোতল পানি চাইল। শাহেদ অতি বিনয়ের সাথে বলল, আমাদের রেস্টুরেন্টটা উপরের ফ্লোরে। আমরা ক্লায়েন্টদের সর্বোপরি সেবা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ। তারপর সামনের ফ্রিজ থেকে এক বোতল পানি বের করে তার দিকে এগিয়ে দিল। মেয়েটা হঠাৎ মুচকি হেসে শাহেদের দিকে একনজর তাকিয়ে বরফ শীতল পানির বোতলটা নিল। ঘণ্টা দু’এক পরে রুম খালি হলে শাহেদ মেয়েটিকে ফরম পূরণের অনুরোধ জানালে সে তার হাতব্যাগে কলম খুঁজে না পেয়ে লজ্জিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে।

শাহেদ আবারও বিনয়ে গলে গিয়ে বলে, আমাদের নেক্সট ডোর এ স্টেশনারি দোকান আছে। তদুপরি আমরা ক্লায়েন্টদের ওয়ান স্টপ সার্ভিস দেয়ার জন্য কলম সব সময় সাথে রাখি। মেয়েটা কলমটা নিয়ে ফরম পূরণ শেষ করে একদৃষ্টিতে শাহেদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে সোফায় ফিরে গেল। হয়তোবা বিবেকের একটা ধাক্কা কিছুক্ষণের জন্যে হলেও তাকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে।