খেলা

প্যাভিলিয়নে হাঁটা শুরু করলেন গিলক্রিস্ট

3

হটনিউজ২৪বিডি.কম,ডেস্ক: ক্রিকেট এমনিতেই রাজকীয় খেলা। তারওপর অস্ট্রেলিয়ানরা নিজেদেরকে মনে করে এই খেলারই রাজা। ক্রিকেটের ধারক-বাহক তারা। ক্রিকেটের আইন-কানুন তৈরী করবে তারা। মেরিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবই (এমসিসি) প্রথম থেকে ক্রিকেটের আইন-কানুন তৈরী করতো। এরপর আইসিসি তাদের সঙ্গে মিশে এই দায়িত্ব গ্রহণ করে।

তো, এসব কারণে অস্ট্রেলিয়ানরা সব সময়ই নাক উঁচা ক্রিকেট জাতি। খেলার চাইতে খেলোয়াড়ি মানসিকতা প্রদর্শন তাদের সংবিধানে আছে কি না সন্দেহ। সেই দলটিরই ইতিহাসখ্যাত ক্রিকেটার হলেন অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। জগদ্বিখ্যাত উইকেটরক্ষকই নয় শুধু, মারমুখি ওপেনার হিসেবে খ্যাতি ছিল তার।

কিন্তু একই সঙ্গে যে চরম স্পোর্টসম্যানশিপ মানসিকতা ছিল তার মধ্যে, সেটাই অবাক করারমত। বলা যায় অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের যদি কেউ অপছন্দ করেন, তবে তিনি অবশ্যই গিলক্রিস্টকে পছন্দ করে থাকেন। কারণ, ওই একটাই- স্পোর্টসম্যানশিপ মানসিকতা।

খেলার মূল স্পিরিট খুঁজে পাওয়া যেতো গিলক্রিস্টের কাছে। ২০০৩ বিশ্বকাপেই যেটার প্রমান দেখিয়েছিলেন একবার। আম্পায়ারের আউটের সিদ্ধান্ত না দিলেও, গিলি জানতেন আউট হয়েছেন এবং প্যাভিলিয়নের দিকে হেঁটে চলে গেলেন তিনি। অবাক করা এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছিলেন তিনি সেমিফাইনালের মত ম্যাচেই।

যথেষ্ট বিতর্ক তৈরী হয়েছিল এ নিয়ে। কেউ কেউ বলেছিলেন, আম্পায়ার যখন আউট দেননি তখন তিনি এভাবে নিজেকে আউট ঘোষণা করে প্রকারান্তরে দলকেই বিপদে ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু যে যাই বলুক, নিজের সিদ্ধান্তেই সেদিন অটল ছিলেন গিলি। প্রতিষ্ঠা করেছেন, ক্রিকেটের আসল স্পিরিট।

২০০৩ সালের ১৮ মার্চ। পোর্ট এলিজাবেথের সেন্ট জর্জ পার্ক স্টেডিয়াম। প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি শ্রীলংকা-অস্ট্রেলিয়া। টস জিতে প্রথম ব্যাট বেছে নেন অসি অধিনায়ক পন্টিং। ব্যাট করতে নামলেন, তখনকার বিধ্বংসী জুটি গিলক্রিস্ট আর ম্যাথ্যু হেইডেন। মারমুখি একটি সূচনাই আনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এ দু’জন, যখন গুনারত্নের প্রথম ওভারেই ১১ রান তুলে নেন গিলি।

৫ ওভার শেষে দেখা গেলো, অস্ট্রেলিয়ার রান বিনা উইকেটে ৩৪। চামিন্দা ভাস আর গুনারত্নের এমন অবস্থা দেখে তখনকার লংকান অধিনায়ক সনাথ জয়সুরিয়া বোলিংয়ে নিয়ে আসেন অরবিন্দ ডি সিলভাকে। তার ওভারের দ্বিতীয় বলটিই সুইফ করতে যান গিলক্রিস্ট। কিন্তু বল ব্যাটের একেবারে পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। প্যাডে আঘাত করে সেটি গিয়ে জমা পড়ে উইকেটরক্ষক সাঙ্গাকারার হাতে।

সঙ্গে সঙ্গেই লংকানরা সমস্বরে আউটের আবেদন জানান আম্পায়ার রুডি কোয়েৎজেনের কাছে। কিন্তু আম্পায়ার ব্যাটে নয়, প্যাডে বল লেগেছে বলে সেই আবেদন নাকচ করে দেন। গিলিও প্রথমে দাঁড়িয়েছিলেন আম্পায়ার কি সিদ্ধান্ত দেন সেটা দেখার জন্য। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন, আম্পায়ার আঙুল না উঠিয়ে উল্টো লংকানদের আবেদন বাতিল করে দিলেন, তখন নিজেই প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটা শুরু করে দিলেন।

এটা ছিল সত্যি বিস্ময়ে অভিভূত হওয়ার মত একটি মুহূর্ত। জয়সুরিয়ারও নিজেদের বিশ্বাস করাতে পারছিলেন না, আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে। আম্পায়ার যেখানে আউট দিলেন না, সেখানে গিলক্রিস্ট নিজেই আউট মেনে নিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যাচ্ছেন! তাও সেমিফাইনালের মত মহা গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচে!

যেখানে আম্পায়ার সিদ্ধান্তই দিলেন বল ব্যাটে নয়, প্যাডে লেগেছে সেখানে ব্যাটসম্যান নিজেই সত্য স্বীকার করে দিয়ে অনন্য নজির স্থাপন করলেন। এটা রীতিমত বিস্ময় এবং বিরল ঘটনা। তবে গিলি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, সেটাই ক্রিকেটের আসল স্পিরিট। তিনিই সেটা প্রমান করে গেলেন আরও একবার।

অস্ট্রেলিয়া ওই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৭ উইকেট হারিয়ে সংগ্রহ করে ২১২ রান। অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস করেন ৯১ রান। ২১৩ রানের সহজ লক্ষ্য নিয়ে খেলতে নেমে অসি বোলারদের তোপের মুখে পড়ে শ্রীলংকা। এর মাঝে আবার বৃষ্টির ভাগড়া। শেষ পর্যন্ত ৩৮.১ ওভারে পরিবর্তিত টার্গেট ঠিক হয়, ১৭২ রান। কিন্তু শ্রীলংকা ৭ উইকেট হারিয়ে সংগ্রহ করতে পেরেছে মাত্র ১২৩ রান। ফলে বৃষ্টি আইনে ৪৮ রানেই ম্যাচ জিতে নেয় অস্ট্রেলিয়া।

তবে ম্যাচের ওইসব মুহূর্তের চেয়ে সবাই ২০০৩ সেমিফাইনালকে মনে রেখেছে গিলক্রিস্টের খেলোয়াড়োচিত মানসিকতা নিয়ে। একবার বাংলাদেশের বিপক্ষেও এমন মানসিকতা দেখিয়েছিলেন গিলি। আম্পায়ার আঙ্গুল তোলার আগেই প্যাভিলিয়নের পথ ধরেছিলেন তিনি। সেটা অবশ্য বিশ্বকাপে ছিল না।

###নূরে আলম জীবন###