সাহিত্য

মুক্তিযুদ্ধের গল্প || গ্রেনেড

10

হটনিউজ২৪বিডি.কম,ঢাকা:

প্রদীপ অধিকারী

গকুলখালি গ্রাম।
যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুজিবনগর মহাসড়কের পাশে নদীর পাড়ের এই গ্রামটি ছায়াঘেরা। গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ফজলু। স্কুলশিক্ষক বাবার এই ছেলেটি সুদর্শন এবং সংস্কৃতিমনা। ‘রূপবান’ যাত্রায় নাম ভূমিকায় ফজলু যখন ‘ও দাইমা কিসের বাদ্য বাজে গো…’ গান ধরে তখন দর্শক ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো তার গান ছাড়া ঠিক জমে না।

ফজলু রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ফলে মিটিং-মিছিল, বক্তৃতা লেগেই আছে। গ্রামের এক প্রান্তে চেয়ারম্যান ছানাউল্লার বাড়ি। সাদিয়া তার কলেজ পড়ুয়া সুন্দরী মেয়ে। সাদিয়ার সহপাঠী দীনা; আসলে সহপাঠী না বলে বান্ধবী বলা ভালো। দুজনেরই দুর্বলতা রয়েছে ফজলুর প্রতি। ফজলু অবশ্য ভালোবাসে দীনাকে। কিন্তু দীনা নিজেকে ফজলুর যোগ্য মনে করে না। ফলে সে ইচ্ছে করেই দূরত্ব বজায় রেখে চলার চেষ্টা করে। কিন্তু ফজলুর অদম্য ভালোবাসার জোয়ারে সে বাধ ভেঙে যায় খড়কুটোর মতো। নিজেকে মাঝেমধ্যে হারিয়ে ফেলে দীনা। ওদের এই মেলামেশা ভালোভাবে নেয় না চেয়ারম্যানের শ্যালক মোশারফ। দীনাকে সে অনেকবার ফুসলিয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। একদিন তো দীনা ফজলুর সামনেই মোশারফকে এ নিয়ে দুকথা শুনিয়ে দেয়। সেদিন মোশারফও প্রতিজ্ঞা করে, এর উপযুক্ত প্রতিশোধ নেয়ার।

ফজলু মেডিক্যালে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু টাকার অভাবে ভর্তি হতে পারছিল না। সাদিয়া বাবাকে অনুরোধ করেছিল ফজলুকে সহযোগিতা করতে। কিন্তু তিনি শর্ত দিলেন, সাদিয়ার সাথে বিয়ের কাবিন করলে তিনি টাকা দেবেন। ফজলুর বাবা এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল। স্কুল শিক্ষক বাবার কাছে এটা অপমানজনক বলেই মনে হয়েছিল। অবশেষে স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক সবাই মিলে চাঁদা তুলতে শুরু করল। স্কুলের প্রবীণ শিক্ষকদের আবেদনে গ্রামের মানুষ এগিয়ে এলো। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য!

সবার আশা, ফজলু ডাক্তার হলে তারা চিকিৎসা সুবিধা পাবে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াল ছানা চেয়ারম্যান। তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সে ক্ষুব্ধ ছিল। সে কৌশলে সবাইকে এ কাজে অনুৎসাহিত করতে লাগল। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তোলা শিক্ষকদের জন্য সম্মানের কাজ হতে পারে না- এই অজুহাতে সে কাজটা মাঝপথেই আটকে দিল। তাছাড়া সে স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান। তার কথার অবাধ্য হবার উপায়ও তো নেই।

এর মধ্যেই এলো  ৭ মার্চ। চাপা পড়ে গেল ফজলুর ভর্তির ব্যাপারটি। ২৫ মার্চের ঘটনার পর তো দেশের পরিস্থিতিই পাল্টে গেল। ফজলুরা তৈরি হলো মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য। কিন্তু বিপদের শেষ নেই। পাকিস্তানি সৈন্যরা বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে। গ্রামে ঢুকে অকারণে নীরিহ মানুষ হত্যা করছে। আর এ কাজে তাদের সহযোগিতা করছে এ দেশেরই কিছু মানুষ। ভাবা যায়! ছানা চেয়ারম্যান মুসলিম লীগের সমর্থক। ফজলুদের ওপর তার ক্রোধ। তার চোখ এড়িয়ে ফজলু একদিন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে গ্রাম ছাড়ল। যাওয়ার আগে শুধু সাদিয়া ও দীনার সঙ্গে দেখা করে বলে গেল, পরিস্থিতি খারাপ হলে এবং প্রয়োজন হলে তারাও যেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। কেননা দেশের এখন খুব দুঃসময়।

এদিকে ফজলু চলে যাওয়ায় মোশারফ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠল। ছানা চেয়ারম্যান শান্তি কমিটি গঠন করেছে। মোশারফকে কমান্ডার করে এলাকায় গঠিত হয়েছে রাজাকার বাহিনী। মোশারফ নানাভাবে দীনাকে মানসিক যন্ত্রণা দিতে লাগল। উপায় না দেখে দীনার বাবা দিনাকে নিয়ে ভারত চলে যেতে বাধ্য হলো। সেখানে গিয়ে তারা যুবশিবিরে আশ্রয় নেয়। শিবিরে আওয়ামী লীগের নেতারা আসে, সঙ্গে মণি ভাই, তোফায়েল ভাই। তারা দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে। এ জন্য  করণীয় নিয়ে আলোচনা করে। দলে দলে যুবক-যুবতীরা  মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে। দীনাও মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেয়।

প্রশিক্ষণ চলাকালীন দীনার দক্ষতায় সবাই খুব অবাক হলো। মাত্র এক মাসের প্রশিক্ষণে দীনা ভারি অস্ত্র চালানো রপ্ত করে ফেলল। শুধু তাই নয়, সে কমান্ডো প্রশিক্ষণ নিল, এবং সবার শেষে নিল সুইসাইড স্কোয়াডের প্রশিক্ষণ। কিন্তু সমস্যা হলো তখনও সরাসরি যুদ্ধে কোথাও মেয়েদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না বিধায় মণি ভাই তাকে আপাতত চিকিৎসা শিবিরে সেবিকার দায়িত্বে পাঠাল। সেখানে পরিচয় হলো ডা. নাজিম, নিলীমার সাথে। নিলীমা আপাকে দেখে দীনার অনুভবে নতুন মাত্রা সংযোজিত হলো। ডা. নাজিমকে ভালোবেসে নিলীমা আপা দেশকে ভালোবেসে ফেলেছেন। যে কারণে সব ছেড়ে এখন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার কাজ করছেন। দীনার মনে পড়ছে ফজলু ভাইয়ের কথা। সুযোগ পেলেই সে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ফজলু ভাইয়ের খবর জানতে চায়। এভাবেই একদিন সে জানতে পারে, ফজলু ৮ নম্বর সেক্টরে যশোর এলাকায় যুদ্ধ করছে।

একদিন খবর এলো যশোর ক্যান্টনমেন্টের অদূরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক বাহিনীর ভয়ংকর যুদ্ধ হচ্ছে। পাক বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে ফেলেছে। সেখান থেকে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আসার জন্য লোক প্রয়োজন। কাজটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দীনা প্রস্তুত হয়ে গেল। মেয়েদের পোশাকে গেলে তাকে নেবে না, তাই সে ছেলেদের বেশ ধারণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে চলে গেল। প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে, মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটছে। আহত যোদ্ধাদের সরিয়ে আনা হচ্ছে। এরই মধ্যে একজন বললো, দক্ষিণ দিকের বাংকারে কোম্পানি কমান্ডার ফজলু আহত অবস্থায় রয়েছে। তিনি সবাইকে পিছু হটার নির্দেশ দিয়ে এখনও কভারিং ফায়ার চালিয়ে যাচ্ছেন। কথাটি শুনেই দীনা স্থির করে ফেলল তার কর্তব্য। স্ক্রলিং করে দীনা বাংকারে চলে এলো। দেখতে পেল ফজলু মরিয়ে হয়ে তখনও গুলি ছুঁড়ছে, অথচ শরীর থেকে যে রক্ত ঝরছে সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।

দীনাও গুলি ছুঁড়তে শুরু করল। কিন্তু স্ক্রলিং করে আসার সময় চুল খুলে যাওয়ায় ফজলু তাকে চিনতে পেরে হতবাক হয়ে গেল। ফজলু এ অবস্থায় দীনাকে দেখবে কল্পনাও করেনি। কিন্তু এখন কল্পনার সময় নয়। গুলি শেষ। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের দুজনকে ঘিরে ফেলেছে। সুতরাং বাধ্য হয়েই আত্মসমর্পণ করতে হলো তাদের। যুদ্ধক্ষেত্রে মেশিনগান হাতে মেয়ে দেখে পাকিস্তানি সেনারা খুব অবাক হলো। তারা দীনাকে নিয়ে রসাত্মক আলোচনায় মেতে উঠল। কিন্তু কমান্ডারের ধমকে তারা বেশিদূর এগুনোর সাহস পেল না। তারা দীনার হাত-পা বেঁধে, আহত সংজ্ঞাহীন ফজলুকে জিপে তুলে নিয়ে ক্যাম্পের দিকে ছুটে চলল।

গাড়ি গ্রামের উঁচু-নিচু রাস্তায় ছুটে চলে। এক সময় ফজলুর জ্ঞান ফিরে আসে। খোলা ট্রাকের পেছনে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকা ফজলু জ্ঞান ফিরেই পাশে দীনাকে দেখে। সে দীনার হাতের বাঁধন খোলার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। অনেক চেষ্টার পর অবশ্য পায়ের বাঁধন খুলে দেয়। দীনা ফজলুর কানে কানে বলে, আমার বুকের সঙ্গে দুটো গ্রেনেড বাঁধা আছে। প্রাণে বাঁচতে হলে এই দুটি গ্রেনেডই আমাদের শেষ ভরসা। আমি ইঙ্গিত দিলেই তুমি গ্রেনেড দুটো ছুঁড়বে। তোমার হাত খোলা কিন্তু পায়ে জখম হয়েছে। আর আমার হাত বাঁধা কিন্তু পা ঠিক আছে। আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলে আমি তোমাকে নিয়ে লাফ দেব। আল্লাহ্ সহায় থাকলে দুজনেই বেঁচে যাব, নইলে মরব দুজনেই।

গাড়ি গকুলখালি ব্রিজের ওপর আসতেই ইশারা করল দীনা। ফজলু দাঁত দিয়ে গ্রেনেডের পিন দুটো টানলো। তারপর একটা কমান্ডারের জিপের দিকে, আরেকটা পেছনের ট্রাকের তলায় ছুঁড়ে মারল, এবং প্রায় একইসঙ্গে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে দুজন লাফিয়ে পড়ল নদীতে। বিকট শব্দে গ্রেনেড দুটো বিস্ফোরিত হলো। কমান্ডারের জিপ উড়ে গিয়ে পড়ল নদীর পানিতে। ট্রাক টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল পথের ওপর। ব্রিজে পাহারারত রাজাকারেরা ঘটনা বুঝতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ ভেবে গুলি ছুঁড়তে লাগল।

দীনা সাঁতারে দক্ষ কিন্তু তার হাত বাঁধা। ফলে অনেক কষ্টে দুজন তীরে উঠতে সক্ষম হলো। কিন্তু ততক্ষণে জীবিত পাকসেনা ও রাজাকারেরা ব্রিজ ও নদীর চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। দীনা রাজাকারদের চোখ এড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু ভাগ্য তাদের সহায় ছিল না। আহত হওয়ায় তারা দ্রুত পালাতেও পারছিল না। ফলে এক সময় ধরা পড়ে গেল তারা। ক্যাম্পে নিয়ে আসার পর দেখা হয়ে গেল রাজাকার কমান্ডার মোশারফের সাথে। দীনা আর ফজলুকে দেখে মোশারফ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। আজ সে প্রতিশোধ নেবে। মোশারফ আনন্দের আতিশয্যে বলে উঠল, এক ঢিলে দুই পাখি, এক হাতে দুই কই। মোশারফ চেয়ারম্যান সাহেবকে এই খুশির খবরটা দেয়ার জন্য ছুটে গেল। ফলে খবরটা সাদিয়ার কানেও গেল। সে তার  বাবার পা জড়িয়ে ধরে অনুনয় করল ওদের না মারার জন্য। চেয়ারম্যানের মনে তখন অন্য চিন্তা। সে ভাবল এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। দীনাকে মেরে ফেললেই ফজলুর সঙ্গে সাদিয়ার বিয়েতে আর বাধা থাকবে না। সে মোশারফকে বলল, দুজনকেই ক্যাম্প থেকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। মোশারফের কাছে প্রস্তাবটি ভালো মনে হলো এবং সে তাই  করল।

অন্ধকার ঘর। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দুজন। হঠাৎ ঘরের দরজা খুলে গেল। পূর্ণিমার আলো দরজা দিয়ে এসে পড়ল দীনার ওপর। মোশারফের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। সে দুজন সঙ্গী ডেকে ফজলুকে ঘরের বাইরে নিয়ে যেতে বলল। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল দীনার ওপর। দীনা খুব একটা বাধা দিল না। মনে মনে সে এর জন্য প্রস্তুত ছিল। সত্যি বলতে কী সে এটাই যেন চাইছিল। কিন্তু মোশারফের চোখে এই বিষয়টি ধরা পড়ল না। সে তখন কামনা মেটাতে উন্মত্ত পশু হয়ে উঠেছে। দীনাকে দেহের নিচে চেপে ধরে সে একটানে ছিঁড়ে ফেলল ঊর্ধ্বাঙ্গের কাপড়। তারপর সাপের মতো জিহ্বা নামিয়ে আনল দীনার বুক বরাবর। দীনা ঠোঁট চেপে অপেক্ষা করে। বাধা দেয় না। সময় কেটে যেতে থাকে অসহ্য প্রতীক্ষায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই দীনার স্তনাগ্রে মাখিয়ে রাখা বিষের যন্ত্রণায় ছটফট করে ওঠে মোশারফ। মোশারফের যন্ত্রণা দেখে দীনা হাসে। হাসতেই থাকে। হাসতে হাসতে তার চোখ দিয়ে নেমে আসে অশ্রুধারা।

মোশারফ মৃত। ঘরে ঢুকে এ দৃশ্য দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ে রাজাকারের দল। কিন্তু দীনার চেহারার কোথাও কোনো হিংস্রতা নেই, প্রতিহিংসা নেই। তার দুচোখে নেমে আসে রাজ্যের ক্লান্তি। সে পালানোর চেষ্টা করে না। সে স্থির, শান্ত দেহটাকে টেনে ওঠানোর চেষ্টা করে আর ঠিক তখনই চেয়ারম্যানের লাথি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে মাটিতে। একদলা রক্ত বেড়িয়ে আসে গলা দিয়ে। দীনা প্রতিবাদ করে না। আর তাতেই যেন গর্জে ওঠে ছানা চেয়ারম্যান- ওই হারামজাদার দল, চাইয়া দ্যাহস কী? গুলি কর।

দীনার দিকে একসঙ্গে তাক করা হয় অনেকগুলো রাইফেল। তারপর রাতের নীরবতা ভেঙে গর্জে ওঠে সেগুলো। কিন্তু সেই শব্দেই কিনা জানা যায় না, একটু পরেই ধুলা উড়িয়ে ছুটে আসে পাকসেনাদের গাড়ি। ওরা দীনার নিথর উলঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত দেহ গাছের সঙ্গে ঝুলতে দেখে ছানা চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চায়, মেয়েটিকে ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়নি কেন? এই মেয়ে গ্রেনেড ছুঁড় অনেক সেনা খতম করেছে! এমন একটা মোস্ট ওয়ান্টেড আসামীকে ছানা চেয়ারম্যান বাড়িতে রেখেছিল কেন?
চেয়ারম্যান এসব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারে না। সে যতই কমান্ডারকে বুঝানোর চেষ্টা করে যে দীনাকে সে নিজ হাতে মেরেছে ততই কমান্ডার উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারা প্রশ্ন করে মোশারফের মৃত্যু নিয়ে। এবং যখন তারা জানতে পারে তার মৃত্যুর কারণ তখন সেনাদের মনেও পাশবিকতা জেগে ওঠে। তারা ছানা চেয়ারম্যানকে ব্যবস্থা করতে বলে।

এবার চেয়ারম্যান বিপদে পড়ে যায়। আশপাশের গ্রামগুলো মানুষশূন্য। তাছাড়া মোশারফও বেঁচে নেই। ফলে এত রাতে সুন্দরী সংগ্রহ করা সহজ কাজ নয়। কথাটা বলতেই আকাশ কাঁপিয়ে হেসে ওঠে পাকিস্তানি সেনা কমান্ডার। সে খ্যাকখ্যাক শব্দে হাসতে হাসতেই বলল, ঘরে এতো সুন্দরী মেয়ে থাকতে বাইরে খুঁজতে যাবেন কেন?
ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। কথাটা শোনা মাত্র ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে ছানা চেয়ারম্যান। ঘরের ভেতর থেকে সবই শুনছিল সাদিয়া। সে তার বাবার দিকে সেনা কমান্ডারের রিভলবার তাক করা দেখে আর স্থির থাকতে পারে না। দ্রুত দরজা খুলে বাইরে এসে লুটিয়ে পড়ে বাবার পায়ে। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলে, বাবা, তুমি আমার কথা রেখেছ। ফজলুকে তুমি বাঁচিয়ে রেখেছ। তার চিকিৎসারও ব্যবস্থা করেছ। সে এতক্ষণে পালিয়ে অনেক দূর চলে গেছে। আমার আর কোনো দুঃখ নেই। অন্তত একজন মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে পেরেছি এই আমার সান্ত্বনা। তুমি দীনাকে নিয়ে আনন্দ করার জন্য মোশামামাকে নির্দেশ দিয়েছিলে। আজ তোমার মেয়েকে নিয়ে অন্যরা আনন্দ করতে চাচ্ছে। এতে তুমি এতো সংকোচ করছো কেন?  আমি তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করব বাবা।

সাদিয়াকে জিপে তুলে নেয়ার আগে ছানা চেয়ারম্যানকে গুলি করতে ভুল করেনি পাকিস্তানি  সেনা কমান্ডার। তাদের চোখে আমৃত্যু পাকিস্তানের এই খেদমতকারী আজ গাদ্দার। আর গাদ্দারের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

###নূরে আলম জীবন###