ধর্ম

কবর জীবন

15

মূল : কারী মুহাম্মদ তৈয়্যেব (র.)
তরজমা : ড. ফারুক আহমদ
[ইসলাম পাঁচটি জগতের ধারণা মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছে। প্রথম জগৎ হলো, রুহ্‌ বা আত্মার জগৎ- যাকে আলমে আরওয়াহ্‌ বলা হয়েছে। দ্বিতীয় জগৎ হলো মাতৃগর্ভ বা আলমে রেহেম। তৃতীয় জগৎ হলো আলমে আজসাম বা বস্তুজগৎ- অর্থাৎ এই পৃথিবী। চতুর্থ জগৎ হলো আলমে বরযাখ বা মৃত্যুর পর থেকে আখিরাতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত যে সূক্ষ্ম জগৎ রয়েছে, যেখানে মানুষের আত্মা অবস্থান করছে। পঞ্চম জগৎ হলো আলমে আখিরাত বা পুনরুত্থানের পরে অনন্তকালের জগৎ।
মুসলমানরা মনে করে রুহ বা আত্মার কখনো মৃত্যু হয় না। মৃত্যুর পর এই পৃথিবী থেকে আত্মা আলমে বরযখে স্থানান্তরিত হয়। অর্থাৎ আত্মা দেহ ত্যাগ করে মাত্র, তার মৃত্যু হয় না। আলমে বরযখের বিশেষভাবে নির্দিষ্ট যে অংশে আত্মা অবস্থান করে সে বিশেষ অংশের নামই হলো কবর।
মোদ্দাকথা- মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে আখিরাতের পূর্ব পর্যন্ত যে অদৃশ্য জগৎ রয়েছে, সেই জগতকেই আলমে বরযখ বলা হয় এবং আলমে বরযখের নির্দিষ্ট অংশ, যেখানে মানুষের আত্মাকে রাখা হয়- সেটাকেই কবর বলা হয়।
ভারতের বিখ্যাত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম মুহতামিম (অধ্যক্ষ) হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবী (র.)এর পৌত্র মাওলানা কারী মুহাম্মদ তৈয়্যেব (র.)। তাঁর পিতার নাম মাওলানা হাফেজ মুহাম্মদ আহমাদ (র.)। একইভাবে এঁরা দুজনই দেওবন্দের অধ্যক্ষ ছিলেন। তবে কারী তৈয়্যেব (র.) অর্ধশত বছরকালব্যাপী (১৯২৮-১৯৮০ খ্রি.) এই প্রতিষ্ঠানটির মুহতামিম (অধ্যক্ষ) হিসেবে মৃত্যুর আগরে দিন পর্যন্ত বহাল ছিলেন। হাকিমুল ইসলাম কারী তৈয়্যেবর জন্ম ১৩ ডিসেম্বর ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৭ জুলাই ১৯৮০ সালে। তিনি জগৎখ্যাত ইসলামী স্কলার ছিলেন। আমরা আজ থেকে তাঁর কবর জগৎ সম্পর্কিত একটি গ্রন্থ ধারাবাহিকভাবে পত্রস্থ করছি। আর এই গ্রন্থটি দ্য রিপোর্টের পাঠকদের জন্য মূল উর্দু থেকে অনুবাদ করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের খ্যাতিমান অধ্যাপক ড. ফারুক আহমদ]
মুখবন্ধ
১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগে হযরত মাওলানা ‘আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদী (র.)-এর পুত্র হাকীমুল ইসলাম হযরত মাওলানা মুহাম্মদ তৈয়্যব (র.) মুহ্তামিম দারুল উলুম দেওবন্দ-এর নিকট আসেন। সেখানে বলা হয়, “ ‘বরযখ’ (কবর)-এর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের কোনো নিয়ম যদি আপনার জানা থাকে অথবা বুযর্গদের থেকে শ্রুত থাকে তাহলে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য অনুরোধ করা হলো।”
হযরত হাকীমুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত উত্তর লিখে পাঠালেন। ফলে মাওলানা মৃতদের স্বপ্নে দেখার কতিপয় ঘটনা উল্লেখ পূর্বক এ প্রসঙ্গে আরও বিস্তারিত লেখার জন্যে হাকীমুল ইসলামকে অনুরোধ করলেন। “আলমে বরযখ-এর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে পঠিত পত্র যথেষ্ট হলেও বরযখী স্তরসমূহ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার জন্য কাসেমী প্রতিভা ও স্মৃতির শরণাপন্ন হলাম।”
এরপর হযরত মুহ্তামিম সাহেব এই বিস্তারিত বিষয়টি লিখলেন যা মাওলানা দরিয়াবাদীর পত্রিকা “صدق جديد”-এ হুবহু ছাপা হয়। এ প্রবন্ধটি ‘আলিমদের নিকট স্বীকৃতি পায় এবং এটাকে বই আকারে প্রকাশ করার জন্য বার বার তাগিদ দেয়া হয়। ফলে এটা বই আকারে প্রকাশিত হয়।
আমরা দু‘আ করছি তাঁদের ‘ইলমের দ্বারা জগতবাসী উপকৃত হোক ও হিদায়েত প্রাপ্ত হোক। ‘আমীন’
(মাওলানা) মুহাম্মদ সালেম কাসেমী
উস্তাদ দারুল ‘উলুম দেওবন্দ
ইউপি, ভারত।
শ্রদ্ধাভাজনেষু,
সালাম বাদ যথাযথ সম্মান প্রদর্শনান্তে ১৫ এপ্রিল ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে পত্রটি আমার হস্তগত হয়। আমি কেরালা, মাদ্রাজ, বোম্বাই ইত্যাদি সফর শেষে গতকল্য দেওবন্দ পৌঁছে আপনার পত্র পেয়ে ধন্য হলাম। ক্ষুদ্র জ্ঞানের অধিকারী এই অজ্ঞের কাছে পত্রটি একটি দিকনির্দেশনামূলক বার্তা বহন করছে, যা বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। আমি কিভাবে তা ব্যক্ত করব? ‘ইলম কাল ছিলনা, আজও নেই তদুপরি বুযর্গদের জিজ্ঞাসার আবরণে শিক্ষা দেয়া হয়। হাদীস-এ জিব্রীলে জিব্রাঈল (আ.)-এর প্রশ্নগুলোর মধ্যে শিক্ষা দেয়া হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করা হয়। “أتاكم يُعلّمكم دينكم” “তিনি তোমাদেরকে দীন সম্পর্কে শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।” শিক্ষকগণ ছাত্রদের প্রশ্ন করে শিক্ষার ব্যবস্থা করে থাকেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের “ألستُ بربكم” “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” প্রশ্ন করে প্রকৃত পক্ষে প্রতিপালক কে? সে শিক্ষাই দিয়েছেন। প্রশ্নটি ইতিবাচক হোক অথবা নেতিবাচক- যেটিই হোক। বাহ্যত প্রশ্ন হলেও হাকীকতে শিক্ষা দেয়াই উদ্দেশ্য। মুহ্তারামের পত্র থেকে আমি সেটাই উপলব্ধি করি। এই প্রশ্নমালার মাধ্যমে অধিক জ্ঞান অর্জন করার প্রতি উৎসাহিত করা হচ্ছে। আল্লাহ তা’আলা যেন এ সকল বুযর্গদের ছায়া দীর্ঘকাল কায়েম রাখেন এবং তাঁদের থেকে উপকৃত হওয়ার ধারা অব্যাহত রাখেন।
লেখকের ভূমিকা
এ বিষয়ে যে ধারণা পেশ করা হলো তা ব্যক্ত করতে সংকোচবোধ হয়। তা সত্ত্বেও নির্দেশকে শিরোধার্য করে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা হয়ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
প্রথমে ভূমিকাস্বরূপ সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করা হলো
সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। শরীর ও রূহের সমন্বয়ে তার অস্তিত্ব। এ মানুষকে তিনটি জগত অতিক্রম করতে হয়। এক, দুনিয়ার জগত যা তার কর্মস্থল, দুই, বরযখী (কবর) জগত যা তার অবকাশ স্থল, তিন, আখিরাতের জগত যা তার চিরস্থায়ী বসবাসস্থল। এই তিনটি জগতের স্বরূপ হলো, দুনিয়ার জগতে শারীরিক জীবনই প্রকৃত। আর ‘রূহ’ তার অনুগত। বরযখী জগতে আত্মিক জীবনই মূল। শরীর তার অনুগত হয়ে সুখ-দুঃখ ভোগ করে। আর আখিরাতের জগতে রুহ ও শরীর উভয়ই পূর্ণভাবে সক্রিয় ও স্ব-স্ব সত্তায় উপভোগকারী।
সুতরাং বরযখী (কবর) জগত দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে অবস্থিত। তাই এ উভয় জগতের সাথে তার সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ বরযখী (কবর) জগতে থাকা অবস্থায় একে অপরের সুখ-দুঃখ উপলব্ধি করতে পারে। আবার বরযখবাসীর দুনিয়ার সাথেও সম্পর্ক থাকে। জগতবাসীর পুণ্যকার্যাবলী তথা দু’আ-মুনাজাত ও ঈসালে ছাওয়াব (পুণ্য প্রেরণ) এবং রূহানী সম্পর্ক বহাল থাকে। এমনকি দুনিয়াবাসীদের কবর যিয়ারতের ফলেও সে উপকৃত হয় এবং যিয়ারতকারীও লাভবান হয়। এমনকি স্বপ্নযোগে তার অবস্থা উদ্ভাসিত হয়। এ বিষয়ে দলিল প্রমাণ রয়েছে।