কিশোরগঞ্জ ঢাকা প্রধান খবর রাজনীতি

র‌্যাবের বিলুপ্তি দাবি: খালেদা

  কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব) খুনি প্রতিষ্ঠান দাবি করে এর বিলুপ্তি চেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, ‘র‌্যাব খুন, গুমে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা খুনি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাই বিএনপি ও বিদেশিরা এই প্রতিষ্ঠানটিকে বিলুপ্তির দাবি জানায়।’ ‘নিদলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন ও গুম-খুন-নির্যাতন বন্ধ এবং সম্প্রচার নীতিমালা ও বিচার বিভাগের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের’ প্রতিবাদে বুধবার বিকেলে কিশোরগঞ্জ জেলার গুরু দয়াল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠে স্থানীয় ২০ দল আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে এসব কথা বলেন খালেদা জিয়া। বুধবার দুপুর পৌনে ১টায় জেলার সর্ববৃহৎ বিদ্যাপীঠ গুরুদয়াল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠে জনসভাটি শুরু হয়। বেলা ৩টার দিকে বেগম খালেদা জিয়া সমাবেশস্থলে পৌঁছান। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি মঞ্চে আরোহন করেন। বিকেল সোয়া ৪টার দিকে তিনি ভাষণ দেওয়া শুরু করেন।

ভাষণকালে র‌্যাব ও পুলিশকে গোলাবারুদ ও সামরিক ট্রেনিং দিয়ে সহযোগিতা না করতে বিদেশিদের প্রতি আহ্বান জানান বিএনপি চেয়ারপারসন। একই সঙ্গে জাতিসংঘ মিশনে র‌্যাবের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেন তিনি।

খালেদা জিয়া বলেন, ‘দেশে আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। পুলিশ আওয়ামী লীগের হয়ে কথা বলছে। জনগণের সেবা করার কথা থাকলেও তারা (পুলিশ) দুর্নীতি, অনিয়মে জড়িয়ে রক্ষক থেকে ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। টাকার বিনিময়ে মানুষকে নির্যাতন করছে। সরকার তাদের কিছু বলছে না। অন্যদিকে গোয়েন্দা সংস্থা ডিবিকেও সরকার কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

র‌্যাব-পুলিশকে সন্ত্রাস দমনের জন্য অস্ত্র দেওয়া হলেও এসব জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, অভিযোগ করে বিএনপি প্রধান বলেন, ‘তারা অস্ত্র দিয়ে মানুষকে নিরাপত্তা দেয় না। বরং এগুলো জনগণকে নির্যাতনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। বিদেশিদের বলবো, র‌্যাবকে ট্রেনিং দেবেন না। পুলিশকে গোলা-বারুদ দেবেন না। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো এসব বিষয় খেয়াল রাখবেন। প্রয়োজনে এসব কার্যকলাপের ছবি ও তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা হবে।’

এ সময় র‌্যাবকে জাতিসংঘ মিশনে অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেন খালেদা জিয়া। তারা মিশনে গেলে দেশের ভাবমুর্তি নষ্ট হবে বলেও মনে করেন তিনি।

৫ জানুয়ারি ‘বিতর্কিত’নির্বাচন করে বর্তমান সরকার শুধু ‘অবৈধ’হিসেবেই বিবেচিত হয়নি, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে দাবি করেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

তিনি বলেন, ‘সরকারের অর্থমন্ত্রী ব্যর্থতার দায় স্বীকার করেছেন। বলেছেন, আমরা ব্যর্থ হয়েছি।  অবশ্যই তারা ব্যর্থই হয়েছে। তাই তাদের ক্ষমতায় থাকার আর কোনো অধিকার নেই।’

বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর বয়স হয়েছে। তাই মাঝে মাঝে সত্য কথা বলে ফেলেন। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে ধ্বংসের মাধ্যমে সেগুলোকে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন। এই স্বীকার তার একার নয়, সরকারের।’

তিনি বলেন, ‘শুধু ব্যাংক সেক্টরই নয়। এ সরকার রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে। তারা থাকলে দেশের কোনো উন্নয়ন হবে না। তবে দেশের দুরবস্থা থাকলেও আওয়ামী লীগের অবস্থা ভালো। কারণ তারা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। নেতারা সম্পদের পাহাড় বানাচ্ছেন।’

দেশের জনগণের নির্বাচিত সরকার নেই, উল্লেখ করে বিএনপি প্রধান বলেন, ‘৫ জানুয়ারির ওই নির্বাচনের মানুষ ভোট দিতে যায়নি। সেজন্য তারা জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার নয়।’

দেশের তরুণ সমাজের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রাক্তন এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের জন্য কারা ভালো তা বুঝতে হবে। তোমরা ফেসবুক, টুইটার চালাও, ইন্টারনেট দেখ; তাই বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে। যারা উন্নয়নে সম্পৃক্ত না, তাদের ভোট দিয়ে লাভ নেই। গতবার আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে কোনো উন্নয়ন হয়নি। বিএনপি জনগণের দল। তাই এ দলের সরকার জনগণের সরকার হয়। জনগণের জন্য উন্নয়ন করে।’

বর্তমান সরকারের শাসনামলে শিক্ষাখাতে অগ্রগতির পরিবর্তে ধ্বংসের সূত্রপাত হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ‘বিএনপির সময়ে শিক্ষাখাতে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও এ সরকার সেই উন্নয়নের ধারা রাখতে পারেনি। বরং পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র সাপ্লাই, পাসের হার বাড়িয়ে দেখানোসহ সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ এভাবে মেধাকে ধ্বংস করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করতে চায়।’

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির মহোৎসব চলছে, দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের এখন ডাক্তার পাওয়া যায় না, ওষুধপত্র থাকে। পত্রিকায় এসেছে, স্বাস্থ্যখাতে পদোন্নতি, বদলি বাণিজ্য চরম আকার ধারণ করেছে। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যিনি আছেন, তিনি আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। পুলিশবাহিনীকে ধ্বংস করে এখন স্বাস্থ্যখাতকেও ধ্বংস করতে বসেছেন।’

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুর্নীতিবাজদের দায়মুক্তি দিচ্ছে, অভিযোগ করে বিএনপি প্রধান বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন এখন দুর্নীতি কমিশন। এই প্রতিষ্ঠানটি এখন দুর্নীতির আখড়া। পদ্মাসেতুর দুর্নীতিতে বিদেশে দুর্নীতির মামলা চললেও এ সংশ্লিষ্ট একজনকে দুদক দায়মুক্তি দিয়েছে। হাসিনার কাছে শীর্ষ দুর্নীতিবাজরা দেশপ্রেমিক হিসেবে বিবেচিত হয়। তারা সবাইকে দায়মুক্তি দেয়। কিন্তু তাদের সেই অধিকার নেই।’

ব্যাপক ‘দুর্নীতি, অনিয়ম, সন্ত্রাসবাদের’কারণে দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নেই বলেও দাবি করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, ‘দেশে এই মুহূর্তে দুর্নীতির ভয়াবহতা, গুম, খুন, হত্যা প্রতিদিনের চিত্র। সে কারণে কেউ বিনিয়োগে সাহস করে না।’

সরকারের ব্যর্থতায় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত পড়েছে, মন্তব্য করে প্রাক্তন এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা (সরকার) বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। সেজন্য এই ব্যবসায় ধস নেমেছে। এ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণ বেড়ে দেউলিয়ার পথে রয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এ বিষয়গুলোতে ভাবছে না।’

বর্তমান সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে জনগণ ধাওয়া দেবে, মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘এরশাদ ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর মানুষ তাকে খুঁজেছিল। এ সরকারের অবস্থা তার চেয়েও খারাপ হবে।’

বিচারকদের নৈতিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বিএনপি প্রধান বলেন, ‘বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে না। তারা চাকরি হারানো ও পদোন্নতি না পাওয়ার ভয়ে সত্য বিচার করছে না। ১/১১ এর সময়ে হাসিনার নামে ১৫টি এবং তাদের নেতাকর্মীদের নামে প্রায় আট হাজার মামলা প্রত্যাহর করে নিয়েছে। কিন্তু একই সময়ে আমার নামে পাঁচটি ও অন্য নেতাদের নামে অসংখ্য মামলা থাকলেও সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়নি।’

বিচারকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘অনৈতিক বিচার করে এই দুনিয়ায় পার পেলেও আল্লাহর কাছে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তাই সময় থাকতে সত্য বিচার করুন। আমরা সঙ্গে আছি।’

খালেদা জিয়া নিজে কোনো ধরনের অন্যায় করেননি দাবি করে বলেন, ‘আমি কোনো অন্যায় করিনি। তাই দেশ ছেড়ে আমাকে যেতে বলা হলেও আমি যাইনি। আমার বিদেশে কিছু নেই। এখানে সবকিছু। জনগণকে নিয়ে থাকতে চাই। কিন্তু হাসিনা চলে গিয়েছিল। কারণ তিনি অনেক অন্যায়, দুর্নীতি করেছেন।’

১/১১ এর আলোচিত ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন সরকার তাকে (খালেদা জিয়া) ক্ষমতায় বসানোর কথা বলেছিল জানিয়ে বিএনপি প্রধান বলেন, ‘তাদের বৈধতা দিলে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর কথা বলেছিল। কিন্তু আমি আপোষ করিনি। তারা ক্ষমতায় বসানোর কে? জনগণের সঙ্গে থাকতে চেয়েছি।’

বর্তমান সরকারকে ‘নব্য মীরজাফর’আখ্যা দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তারা (সরকার) দেশ নিয়ে খেলা শুরু করেছে। অনেক রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। তাই এ দেশকে নিয়ে খেলতে দেওয়া যাবে না। এ মীরজাফর সরকার বিএনপির বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র করছে। তাদেরকে হটিয়ে সব দলের অংশগ্রহণে নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। পুরাতনকে ঝেড়ে ফেলে নতুনভাবে যাত্রা শুরু হবে। পরিবর্তন আনবোই আনবো।’

কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপিত শরীফুল আলমের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আ স ম হান্নান শাহ, নজরুল ইসলাম খান, বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, বিএনপির অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সালাম প্রমুখ। জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুর রহমান জনসভায় সভাপতিত্ব না করলেও বক্তব্য রাখেন।

শরিকদের মধ্যে কল্যাণপার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মাদ ইব্রাহীম, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, খেলাফত মজলিসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাওলানা ইসহাক, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ইসলামিক পার্টির চেয়ারম্যান আব্দুল মোবিন, ডিএল এর মহাসচিব সাইফুদ্দিন মনি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির সভাপতি ফরিদুজ্জামান ফরহাদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দ্রুত একটি নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির চলমান আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে দেশব্যাপী ধারাবাহিক সফরের অংশ হিসেবে বুধবার কিশোরগঞ্জে আসেন বিএনপি চেয়ারপারসন। দেশব্যাপী ধারাবাহিক জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির অংশ হিসেবে নীলফামারী ও নাটোরে জনসভা করেন খালেদা জিয়া।  আগামী ২৯ নভেম্বর কুমিল্লায়ও একটি জনসভা করবেন তিনি।