জাতীয়

মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার: রাষ্ট্রপক্ষের নেতৃত্ব পর্যায়ে প্রকাশ্য বিরোধ

ঢাকা, ১২ মার্চ  (হটনিউজ২৪বিডি.কম) : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে নেতৃত্ব পর্যায়ে বিরোধ চলছে। সাম্প্রতিক দুটি ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি ও প্রধান সমন্বয়কের মধ্যে এই বিরোধ প্রকাশ্যে চলে এসেছে।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি (চিফ প্রসিকিউটর) গোলাম আরিফ টিপু দাবি করেন, প্রধান সমন্বয়কের নিয়োগ অবৈধ। প্রধান সমন্বয়ক (চিফ কো-অর্ডিনেটর) ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমানের দাবি, তাঁর নিয়োগ বৈধ। কারণ, সরকার তাঁকে এই পদে নিয়োগ দিয়েছে।

মাত্র কয়েক দিন আগে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ সম্পর্কে আরেক কৌসুলি মোহাম্মদ আলীর বক্তব্য এবং এ নিয়ে লিখিত অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের পারস্পরিক আস্থা ও সৌজন্যর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে। এর আগে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় নতুন করে যুক্তি উপস্থাপনের আরজি জানিয়ে মোহাম্মদ আলী সহকর্মীদের বিরোধিতার মুখে পড়েন। রাষ্ট্রপক্ষের এ ধরনের কাজকে অদক্ষতার পরিচায়ক বলে মন্তব্য করেন বিচারসংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব ঘটনা ঘটে থাকলে তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এতে প্রতিপক্ষের হাত শক্তিশালী হবে এবং সার্বিকভাবে বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আমরা অবিলম্বে সংকট নিরসনের জন্য আইনমন্ত্রী, প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। কৌঁসুলিদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা বা কোন্দল যা-ই বলুন, সে জন্য যদি বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে দেশের মানুষ কাউকে ছাড় দেবে না।’

রাষ্ট্রপক্ষের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত সোমবার (১০ মার্চ) রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি হূষিকেশ সাহা প্রধান সমন্বয়ক এম কে রহমানের নির্দেশনায় প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের একটি সভা আহ্বান করেন। ওই নোটিশ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি জরুরি অফিস আদেশ জারি করেন প্রধান কৌঁসুলি। এতে বলা হয়, চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের সব প্রসিকিউটরের নিয়োগ হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর ৭ ধারার অধীনে। একমাত্র চিফ প্রসিকিউটর নিজে কোনো সভা ডাকতে পারেন। তাঁর নির্দেশ ছাড়া ডাকা সভা অবৈধ এবং বাতিলযোগ্য।

এর আগে ৫ মার্চ গোলাম আরিফ রাষ্ট্রপক্ষের কার্যক্রমকে গতিশীল করতে কৌঁসুলিদের দায়িত্ব ও কর্মপরিধি পুনর্বণ্টন করে অফিস আদেশ দেন। প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ের বিভিন্ন দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য ১৬ জন কৌঁসুলিকে বিভিন্ন ধরনের দায়িত্ব দেওয়া হলেও ছয়জনকে কোনো দায়িত্বে রাখা হয়নি। তাঁরা হলেন সৈয়দ রেজাউর রহমান, মোহাম্মদ আলী, আলতাব উদ্দিন আহমেদ, আবদুর রহমান হাওলাদার, মীর ইকবাল হোসেন ও নূরজাহান বেগম। প্রধান কৌঁসুলির এ সিদ্ধান্তেরও বিরোধিতা করেছেন প্রধান সমন্বয়ক।

জানতে চাইলে গোলাম আরিফ টিপু প্রথম আলোকে বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের আইনের ৭ ধারায় বলা আছে, ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনার জন্য সরকার এক বা একাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে পারবেন, তাঁরা প্রসিকিউটর হিসেবে গণ্য হবেন। আর ওই ব্যক্তিদের একজনকে সরকার চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে পদায়ন করতে পারবেন। ট্রাইব্যুনালের আইনে চিফ কো-অর্ডিনেটরের (প্রধান সমন্বয়ক) কোনো পদ নেই। আইন লঙ্ঘন করে নিয়োগ দেওয়ায় এই পদ অবৈধ।’ কৌঁসুলিদের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিজ বিবেচনায় এটা তিনি করতেই পারেন।

এম কে রহমান বলেন, সরকার তাঁকে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘আমার নিয়োগ কি বাতিল করা হয়েছে?’ দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রধান কৌঁসুলি তাঁকে না জানিয়ে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করতে পারেন না। যেহেতু তিনি কৌঁসুলিদের প্রধান সমন্বয়ক, তাই এ দায়িত্ব তাঁর।
গত বছরের ৩০ জানুয়ারি আইন মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমানকে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

রাষ্ট্রপক্ষের সূত্রগুলো জানায়, ১০ মার্চ জরুরি অফিস আদেশের মাধ্যমে প্রধান সমন্বয়কের নির্দেশে ডাকা সভা প্রধান কৌঁসুলি অবৈধ বলে পাল্টা আদেশ জারি করলেও প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ের গ্রন্থাগারে একটি সভা হয়েছিল। ২২ জন কৌঁসুলির মধ্যে ১৪ জন উপস্থিত ছিলেন। প্রধান সমন্বয়ক এম কে রহমান ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘পত্রপত্রিকার মাধ্যমে আমরা জেনেছি, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি চলছে। এই ভুল বোঝাবুঝি নিরসনের জন্য আমি খুব শিগগির কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি।’(প্রথম আলো)