জাতীয়

৫৬ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে

ঢাকা, ৩ মার্চ (হটনিউজ২৪বিডি.কম) : দেশে প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক স্কুলের উপযুক্ত ৫৬ লাখ শিশু স্কুলে যায় না। এদের একটি অংশ কখনো স্কুলে যায়নি, অন্য অংশটি ঝরে পড়া। স্কুলের বাইরে থাকা শিশুর হার ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে বাংলাদেশে বেশি, তবে পাকিস্তানের চেয়ে কম।

ইউনিসেফ ও ইউনেসকো ‘স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের নিয়ে বৈশ্বিক উদ্যোগ’ (গ্লোবাল ইনিসিয়েটিভ অন আউট-অব-স্কুল চিলড্রেন) নামের সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য দিয়েছে। প্রতিবেদনটি জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান—এই চারটি দেশের তথ্য এতে রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবারের আর্থিক অসংগতি ছাড়াও লিঙ্গ (জেন্ডার) বৈষম্য, বসবাসের স্থান, সামাজিক অবস্থা, শিশুশ্রম, জরুরি পরিস্থিতি—এসব কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু স্কুলের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
প্রতিবেদন বলছে, প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বয়সী (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী) শিশুদের স্কুলে নেওয়া ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে পিছিয়ে। বাংলাদেশে প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বয়সী শিশুর সংখ্যা দুই কোটি ৬০ লাখ। এদের মধ্যে ৫৬ লাখই স্কুলের বাইরে। এর অর্থ বাংলাদেশে প্রাথমিক স্কুল বয়সী ১৬ দশমিক ২ শতাংশ শিশু স্কুলে যায় না। এই হার ভারতে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নিম্ন মাধ্যমিক বয়সী ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু স্কুলে যায় না। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় এই হার যথাক্রমে ৫ দশমিক ৭ ও ৩ দশমিক ২ শতাংশ। দুটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অবস্থা পাকিস্তানের চেয়ে ভালো। পাকিস্তানে প্রাথমিকে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ ও নিম্ন মাধ্যমিক বয়সী ৩০ দশমিক ১ শতাংশ শিশু স্কুলে যায় না।

প্রাক-প্রাথমিক স্তরেও অনেক শিশু স্কুলে যায় না। এই হার বাংলাদেশে ৩৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক স্কুলে না যাওয়া শিশুরাই প্রাথমিকে ঝরে পড়ে বেশি।

তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব কাজী আখতার হোসেন দ্বিমত করে বলেন, ‘বিদ্যালয় গমনোপযোগী শিশুদের ভর্তি হওয়ার বিষয়ে আমাদের যে তথ্য (প্রায় শতভাগ), সেটিই সঠিক। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকে। তাঁদের প্রতিবেদন কোন বৈশিষ্টের ভিত্তিতে করা হয়েছে, সেটি না দেখে বলা যাবে না।’
সরকারি হিসাব হচ্ছে, প্রাথমিকের উপযুক্ত প্রায় শতভাগ শিশুই স্কুলে ভর্তি হয়। ঝরে পড়ার হার ২৮ শতাংশ। এই ঝরে পড়া শিশুদের সঙ্গে নিম্ন মাধ্যমিকে ভর্তি না হওয়া শিশু এবং নিম্ন মাধ্যমিকে ঝরে পড়া শিশু যুক্ত হয়ে সংখ্যাটি কী দাঁড়ায়, তা অবশ্য সরকারের কাছে নেই।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী প্রথম আলোকে বলেন, পরিসংখ্যান নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে। তবে স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের সংখ্যাটি উদ্বেগজনক। বিশেষ উদ্যোগ ও বাড়তি বিনিয়োগ করে এসব শিশুর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় আনতে হবে।

কারা স্কুলের বাইরে: ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে যেসব শিশু এখন স্কুলে যায় না, তাদের ৩৪ শতাংশ কোনো এক পর্যায়ে ঝরে পড়া শিশু। শ্রীলঙ্কায় এই হার ৬৪ শতাংশ। স্কুলে যায় না এমন ভারতের ৩৯ শতাংশ ও পাকিস্তানের ৫১ শতাংশ শিশু কোনো দিন প্রাথমিক স্কুলেই যায়নি।

বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরের শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার হার উদ্বেগজনকভাবে কম। প্রাথমিকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে শেষ শ্রেণী পর্যন্ত না গিয়ে ঝরে পড়ার হার ৪০ শতাংশ, ভারতে ২০ শতাংশ। অন্যদিকে দুটি দেশেই প্রাথমিক স্তর শেষ করার পর ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হয় না।

বাংলাদেশের চিত্র: বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক—এই তিন স্তরেই তুলনামূলকভাবে কম ভর্তি হয়। শহরের চেয়ে গ্রামের শিশুরা প্রাক-প্রাথমিকে কম ভর্তি হয়।
মেট্রোপলিটন এলাকার বস্তির শিশু তুলনামূলকভাবে কম প্রাথমিক স্কুলে যায়। শিক্ষিত মায়ের শিশুর তুলনায় কম শিক্ষিত মায়ের শিশুরা প্রাথমিক স্কুলে কম যায়। প্রাথমিক স্কুলে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের হার বেশি। শিশুশ্রম এ ক্ষেত্রে বাধা।

নিম্ন মাধ্যমিক স্তরেও পরিস্থিতি একই রকম। মেট্রোপলিটন এলাকার বস্তির শিশু, কম শিক্ষিত মায়ের শিশু স্কুলে কম যায়। এ ক্ষেত্রেও ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে পিছিয়ে।

কোন শিশুরা স্কুল থেকে বেশি ঝরে পড়ে তারও আশঙ্কার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। যেসব শিশুর প্রাক-প্রাথমিক স্কুলের অভিজ্ঞতা নেই, প্রাথমিকে তারা বেশি ঝরে পড়ে। অন্যদিকে ছেলে শিশুদের নিম্ন মাধ্যমিকে প্রবেশের হার কম। কিন্তু নিম্ন মাধ্যমিকে মেয়ে শিশুদের টিকে থাকার হার কম।

করণীয়: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারটি দেশই শিশুদের স্কুলে নিতে স্কুল ভবন নির্মাণ ও অবৈতনিক শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশে ও ভারতে ঘটা করে পাঠ্যবই বিতরণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম কমাতে এবং শ্রেণীকক্ষের ভেতরের মান বাড়াতে কাজ করা দরকার। সুশাসন ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন হয়েছে আংশিক।

এ ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, বাইরে থাকা শিশুদের স্কুলে আনতে ‘রিচ আউট-অব-স্কুল চিলড্রেন’ প্রকল্প ও প্রাথমিকে ঝরে পড়া শিশুদের জন্য ‘সেকেন্ড চান্স এডুকেশন’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। উপবৃত্তির পরিধি বাড়িয়ে উপকারভোগী শিশুর সংখ্যা ৪৫ লাখ থেকে ৮৭ লাখ করা হয়েছে। স্কুলে ৩০ লাখ শিশু টিফিনও পাচ্ছে।

রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, শিক্ষার্থীপিছু সরকারি বরাদ্দ বাড়াতে হবে। স্কুলে দুপুরের খাবারকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে নিতে হবে।

ইউনিসেফ ও ইউনেসকো প্রতিবেদনে স্কুলে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারে ক্ষীণ এমন শিশুদের ব্যাপারে মনোযোগী হতে এবং পিছিয়ে পড়া ভৌগোলিক এলাকার ও বিশেষ গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে বলেছে। তারা বলেছে, সৃজনশীল উদ্যোগ না নিলে স্কুলশিক্ষায় বৈষম্য থেকেই যাবে এবং জীবন উপভোগ থেকে অনেক শিশু বঞ্চিত থাকবে। (ইউনিসেফ ও ইউনেসকোর প্রতিবেদন) প্রথম আলো