জাতীয়

কোকোর টাকার সদ্ব্যবহার অনিশ্চিত

ঢাকা, ১ মার্চ  (হটনিউজ২৪বিডি.কম) : বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা ২১ কোটি টাকা সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত আনা হলেও দুদকের ফান্ড থেকে সেই টাকা নিয়ে গেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ফলে দুর্নীতিবিরোধী কাজে ব্যয় করার শর্তে সিঙ্গাপুর থেকে ওই টাকা ফেরত আনা হলেও তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে। সূত্রটি জানায়, সিঙ্গাপুর থেকে অর্থ ফেরত আনতে সহযোগিতাকারী প্রতিষ্ঠান অক্টোখানকে কনসালট্যান্সি ফি বাবদ মোট টাকার ১০ শতাংশ অর্থাৎ মোট ২ কোটি ১০ লাখ টাকা ইতিমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি রাইজিংবিডিকে নিশ্চিত করে বলেছেন, বিগত জোট সরকারের আমলে আরাফাত রহমান কোকো ঘুষ হিসেবে মোট ২১ কোটি ৫৫ হাজার ৩৯৪ টাকা গ্রহণ করে সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংকে জমা রেখেছিলেন। বিষয়টি সিঙ্গাপুরের আদালতে প্রমাণিত হওয়ার পর সিঙ্গাপুর ওভারসিস ব্যাংক থেকে তিন দফায় টাকাগুলো দুদকের অ্যাকাউন্টে ফেরত আনা হয়। সিঙ্গাপুরের আদালত তখন শর্ত দিয়েছিল যে পুরো টাকা দুদককে শক্তিশালী করতে কিংবা দুর্নীতি প্রতিরোধের কাজে ব্যয় করতে হবে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় দুদকের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ২১ কোটির মধ্যে মাত্র আড়াই কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে। এখন নানা অজুহাতে বাকি টাকা দিতে দেরি করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাইজিংবিডিকে জানান, ২০১৩ সালের ২৭ আগস্ট সর্বশেষ কিস্তির মাধ্যমে পুরো টাকা দুদকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে অক্টোবরে পুরো টাকাই অর্থ মন্ত্রণালয় দুদকের কাছ থেকে নিয়ে যায়। তখন বলা হয়েছিল, দুদকের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জমা দিলে সরকার পুরো অর্থই সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ফেরত দেবে। অথচ দুদক তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনা জমা দিলেও এখন পর্যন্ত অর্থের অভাবে তা আলোর মুখ দেখছে না। এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘দুদককে শক্তিশালী করার শর্তে আমরা সিঙ্গাপুর সরকারের কাছ থেকে ২১ কোটি টাকা গ্রহণ করি। পরে অর্থ মন্ত্রণালয় সেই টাকা তাদের কাছে জমা দিতে বলে এবং আমাদের কাছে অর্থ ব্যয় করার কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চায়। আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, লজিস্টিক সহায়তা বৃদ্ধিসহ তিন বছরের একটি কর্মপরিকল্পনার বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করি।’ চেয়ারম্যান বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মন্ত্রণালয় মাত্র আড়াই কোটি ফেরত দিলেও বাকি টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে নানা রকম জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। পরে দেওয়া হবে জানানো হলেও তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন দুদক চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যান জানান, আড়াই কোটি টাকার মধ্যে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা অক্টোখানকে কমিশন হিসেবে পরিশোধ করতে হয়েছে। কারণ, অক্টোখান পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে সহায়তা করার জন্য মোট টাকার ৩০ শতাংশ দাবি করেছিল। পরে ১০ শতাংশ দেওয়ার শর্তে সমঝোতা হয়। দুদক চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘আমরা একাধিকবার মন্ত্রণালয়কে অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য বলে আসছি, কিন্তু তারা এখনো টাকা ফেরত দেয়নি। যেহেতু এই অর্থ দুদকের, তাই আজ না হয় কাল সব টাকাই ফেরত দিতে হবে মন্ত্রণালয়কে।’ দুদকের অন্য এক কর্মকর্তা জানান, এভাবে দুদকের ফান্ড থেকে টাকাটা অর্থ মন্ত্রণালয়ে নেওয়া ঠিক হয়নি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, যেখানে অর্থের অভাবে দুদক তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম গতিশীল করতে পারছে না, সেখানে এই অর্থ আটকে রাখা উচিত নয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে সিমেন্স কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য আরাফাত রহমান কোকো ঘুষ হিসেবে মোট ২১ কোটি ৫৫ হাজার ৩৯৪ টাকা গ্রহণ করেছিলেন। পাচার করা অর্থের মধ্যে প্রথম দফায় ২০১২ সালের ২২ নভেম্বর ১৩ কোটি ৪৪ লাখ ৮২ হাজার ২৩১ টাকা, দ্বিতীয় দফায় ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে সুদ বাবদ ১৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৭৮ টাকা এবং তৃতীয় দফায় গত অক্টোবরে ৭ কোটি ৪০ লাখ ২৪ হাজার ৩৮৫ টাকা সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় দুদককে স্টোলেন রিকভারি অ্যাসেট হিসেবে ফেরত পাঠানো হয়। দুদককে দুর্নীতি প্রতিরোধে পুরো টাকা ব্যবহার করতে হবে শর্ত ছিল । অবৈধভাবে সিঙ্গাপুরের ইউনাইটেড ওভারসিজ ব্যাংকে বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে ২১ কোটি টাকা পাচার করার অপরাধে মানি লন্ডারিং আইন, ২০০২-এর ১৩(২) অনুযায়ী ২০০৯ সালের মার্চ মাসে আরাফাত রহমান কোকো এবং সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী আকবর হোসেনের ছেলে ইকবাল হোসেন সায়মনকে আসামি করে কাফরুল থানায় একটি মামলা করে দুদক। দুদকের উপপরিচালক আবু সাঈদ বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেছিলেন। পরে মামলার রায়ে তাদের বিরুদ্ধে ছয় বছরের কারাদণ্ড এবং ৪৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।