প্রযুক্তি

বিটিসিএলে কমছে গ্রাহক বাড়ছে ঋণ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিবেদক, ২৭ ফেব্রুয়ারি (হটনিউজ২৪বিডি.কম) :  বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড বিটিসিএল ক্রমশ মুখথুবড়ে পড়ছে। দিনদিন গ্রাহক কমছে। ১৫ লাখ সংযোগের গ্রাহক কমে তা এখন ৯ লাখে এসে ঠেকেছে। ফলে আয় কমেছে। এদিকে প্রতিষ্ঠানটির ঋণও বাড়ছে হুহু করে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বলে থেমে নেই দুর্নীতিও। সব মিলে এখানে দেখার যেন কেউ নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে টেলিযোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিটিটিবিকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়। তত্কালীন বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ডের (বিটিটিবি) নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। স্বায়ত্তশাসন পেলেও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনও উন্নতি ঘটাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। যে আশায় বিটিসিএলে রূপান্তর, তা আজ অবধি পূরণ হয়নি। বরং দিন-দিন রাষ্ট্রায়ত্ত এ কোম্পানির প্রতি গ্রাহকদের বিমুখতা বাড়ছে। প্রতিষ্ঠার ৭ বছরেও শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি বিটিসিএল।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই টেলিযোগাযোগ খাতের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিটিসিএলকে ঘিরে সবার ছিল ব্যাপক আগ্রহ। কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সেলফোনের সহজলভ্যতা এবং বিটিসিএলের সংযোগ-গ্রহণ ও পরবর্তী সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংস্থাটির অপেশাদারি মনোভাবই সাধারণের আগ্রহকে নষ্ট করে ফেলেছে। কোম্পানি হওয়ার পর প্রথম বছর মুনাফা করলেও পরের বছরগুলোয় টানা লোকসান থেকে বেরোতে পারছে না বিটিসিএল। বরং প্রতিবছর লোকসান বাড়ছে। সর্বশেষ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৪৪ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে কোম্পানিটিকে। প্রকৃতপক্ষে এর পরিমাণ আরও বেশি বলে মনে করেন কেউ-কেউ।
বিটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক টেলিফোন কল থেকে একসময় এক হাজার থেকে ১২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত আয় হলেও গত অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ৪০১ কোটি টাকায়। তবে স্থানীয় আয় আগের মতোই আছে। শেষ হওয়া অর্থবছরে স্থানীয় খাতে বিটিসিএল আয় করেছে ৬৫৪ কোটি টাকা। গেল অর্থবছরে বিটিসিএল আয় করেছে ১ হাজার ৫৬ কোটি টাকা, ব্যয় ১ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। আয় কমার কারণ হিসেবে কোম্পানির কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক টেলিফোন কল থেকে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক কল টারমিনেশনের ক্ষেত্রে এখন অনেক অপারেটর তৈরি করেছে সরকার।

২০১১-১২ অর্থবছরে বিটিসিএল আয় করেছিল ২ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা, ব্যয় করেছে ২ হাজার ১০৯ কোটি টাকা। এর আগের বছর আয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা, ব্যয় করেছিল ১ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। একইভাবে ২০০৯-১০ অর্থবছরে আয় ও ব্যয় ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ২৪১ কোটি এবং ১ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। তবে কোম্পানি হওয়ার পর প্রথম বছরে বিটিসিএলের আয়-ব্যয়ের মধ্যে একটা ভারসাম্য ছিল। ওই বছর ২ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ১০৯ কোটি টাকা।
দেখা গেছে, বিটিসিএলের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালে সংযোগ সক্ষমতা ছিল ১৪ লাখ ৭০ হাজার। বিপরীতে গ্রাহক রয়েছে ৯ লাখ। এ ক্ষেত্রে সংযোগ সক্ষমতার ৪০ শতাংশই অব্যবহূত থাকছে। ২০১২ সালে সংস্থাটির সংযোগ কমে আগের বছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ আর গত বছর ৪ শতাংশ।

জানা গেছে, ২০০৫ সালে বিটিটিবির সংযোগ সক্ষমতা ছিল প্রায় ১০ লাখ। আর বিটিসিএলে রূপান্তর হওয়ার পর ২০০৮ সালে সক্ষমতার ৩৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ ছিল অব্যবহূত। ২০০৯ সালে ৩৪ শতাংশ, ২০১০ সালে ২৬ দশমিক ৭২ শতাংশ, ২০১১ সালে ২৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ, ২০১২ সালে ৬৫ দশমিক ৫১ শতাংশ অব্যবহূত ছিল। জানা গেছে, বিটিসিএল গ্রাহক বাড়াতে ল্যান্ডফোনের নতুন সংযোগ মূল্য আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম করা হয়েছে। ঢাকায় সংযোগমূল্য ২ হাজার আর চট্টগ্রামে ১ হাজার টাকা। অন্যান্য বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা শহরে ৬০০ টাকা। কলরেটও আগের তুলনায় কমানো হয়েছে। এত সস্তা সংযোগও আগ্রহ বাড়াতে পারেনি গ্রাহকের।
এদিকে বিটিসিএলের গ্রাহকদের জন্য স্বল্পমূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহারে সুযোগ দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য অর্জন নেই। যদিও এ সেবা গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। শতাধিক ইউনিয়নে বিটিসিএলের ইন্টারনেট সার্ভিসের মাধ্যমে ই-তথ্যকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। বিটিসিএলের ইন্টারনেট সার্ভিস দেশের ৫০০টি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে।

গ্রাহক কমলেও প্রতিবছরই সংযোগ সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করছে সংস্থাটি। অথচ সংযোগ সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশ অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে। আবার এ-ও ঠিক, প্রতিষ্ঠানটির প্রতি গ্রাহকের আগ্রহ না থাকলেও প্রতিবছর তার উন্নয়নে নিজস্ব তহবিলসহ সরকারি অর্থায়ন ও বিদেশি ঋণে বড় অঙ্কের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এসব প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতির ঘটনা ঘটে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিটিসিএল কর্মকর্তাদের সহায়তায় ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকলের (ভিওআইপি) মাধ্যমে প্রায় ৬০৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সংস্থাটির সাবেক এমডিসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়, বিটিসিএল কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরস্পর যোগসাজশে একটি চক্র আন্তর্জাতিক কলের ডাটা মুছে ফেলে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এখনও এর সুরাহা হয়নি।

এদিকে আবার বিটিসিএলের গ্রাহকদের জন্য স্বল্পমূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহারে সুযোগ দেয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য অর্জন নেই। যদিও এ সেবা গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। শতাধিক ইউনিয়নে বিটিসিএলের ইন্টারনেট সার্ভিসের মাধ্যমে ই-তথ্যকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। বিটিসিএলের ইন্টারনেট সার্ভিস দেশের ৫০০টি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে। এর মধ্যে দুই শতাধিক ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) গ্রাহক রয়েছে। এদের ১০ মেগাবাইট থেকে শুরু করে চাহিদা অনুযায়ী ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করা হয়। উচ্চ ব্যান্ডউইথ গ্রাহকদের জন্য প্রতি মেগা বিট/সেকেন্ড ব্যান্ডউইথের দাম ৪ হাজার ৮০০ টাকা। ব্যবহারের পরিমাণের ওপর ১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ হারে ছাড়ও দেয়া হয়। বিটিসিএলের ইন্টারনেট সার্ভিসের জন্য বর্তমানে সাড়ে ৭ গিগাবিট ব্যান্ডউইথ রয়েছে। এখান থেকে সাড়ে ৫ গিগাবিট ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হচ্ছে। গ্রাহকের অভাবে বাকি ব্যান্ডউইথ রয়েছে অব্যবহৃত।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতি গ্রাহকের আগ্রহ না থাকলেও প্রতি বছর তার উন্নয়নে নিজস্ব তহবিলসহ সরকারি অর্থায়ন ও বিদেশী ঋণে বড় অঙ্কের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এসব প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতির ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিটিসিএল কর্মকর্তাদের সহায়তায় ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকলের (ভিওআইপি) মাধ্যমে প্রায় ৬০৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সংস্থাটির বর্তমান ও সাবেক পাঁচ এমডিসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়, বিটিসিএল কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরস্পর যোগসাজশে একটি চক্র আন্তর্জাতিক কলের ডাটা মুছে ফেলে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।