অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারহোল্ডার ঠকানোর হাতিয়ার কি?

ঢাকা, ২৪ ফেব্রুয়ারি (হটনিউজ২৪বিডি.কম) : ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠান মার্জার বা একীভূতকরণ বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ও স্বীকৃত রীতি। ব্যয়সংকোচনের মাধ্যমে মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যেই মূলত বিভিন্ন কোম্পানি একীভূত ও অধিগ্রহণ হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়ায় সাধারণ শেয়ারহোল্ডার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য বিভিন্ন দেশে আইনও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। প্রয়োজনীয় আইন ও তদারকি না থাকায় দেশের উদ্যোক্তারা পদ্ধতিটি কাজে লাগাচ্ছেন শেয়ারহোল্ডারদের ঠকানোর হাতিয়ার হিসেবে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশে একীভূত ও অধিগ্রহণের নামে উদ্যোক্তাদের দুর্বল কোম্পানির দায় তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। আবার তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির সম্পদ ও আয় অতিরঞ্জিত করে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে শেয়ার বিনিময়ের মাধ্যমে উদ্যোক্তারাই শুধু লাভবান হচ্ছেন। সম্প্রতি কেয়া কসমেটিকসের সঙ্গে এ গ্রুপের দুর্বল মৌলভিত্তির তিন কোম্পানির (বস্ত্র খাত) একীভূতকরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে যেসব কোম্পানি একত্রীকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে, সেগুলোর অধিকাংশেরই আয় কমে গেছে।

মূলত ‘দুইয়ে দুইয়ে পাঁচ’ হবে— এমন ব্যবসায়িক উদ্দেশেই ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠান একীভূত কিংবা অধিগ্রহণ করা হয় বলে মনে করেন আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুনিরুজ্জামান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশে একই খাতের ভিন্ন কোম্পানির মধ্যে এমন ঘটনা অহরহ ঘটে। তবে আমাদের দেশে খাতভিত্তিক ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে একই গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোয় এমনটি হচ্ছে। কী উদ্দেশে এ ধরনের একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ হচ্ছে, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদই তা ভালো বলতে পারবে।’

কোম্পানি আইনের একটি ধারাবলেই শুধু আদালতের অনুমোদন নিয়ে বর্তমানে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে একীভূতকরণ কিংবা অধিগ্রহণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত; যাতে প্রক্রিয়াটিকে বিনিয়োগকারী ঠকানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা না যায়।

কোম্পানি একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার প্রচলন হয় মূলত ১৮ শতকের শেষ দিকে। ১৯ শতকের শুরুতে এর ব্যাপ্তি ঘটলেও ১৯৮০ থেকে পদ্ধতিটি জনপ্রিয়তা পায়। একীভূতকরণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খাতে আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি শুরুতে মুখ্য থাকলেও পরে প্রশাসনিক দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও ব্যয়সংকোচনের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সাবেক প্রেসিডেন্ট আল মারুফ খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সাধারণত শেয়ারহোল্ডাররা লাভবান হলেই একীভূতকরণের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা পায়। তবে অন্যান্য দেশে যেসব উদ্দেশ্য সামনে রেখে একীভূতকরণ হয়, আমাদের দেশে সেটি হচ্ছে না। শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থার। তাই কমিশনের উচিত হবে, এ বিষয়ে যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা।’

বাংলাদেশে ২০০৫ সালে প্রক্রিয়াটি শুরু হলেও আইন প্রণয়নে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা। শুধু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নীতিমালা তৈরি করেছে। তাতে এ ধরনের প্রস্তাব আদালতে উপস্থাপনের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মতি নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে সাধারণত আলাদা মালিকানার ও একই খাতের কোম্পানি একীভূতকরণে প্রাধান্য পায়। এসব প্রতিষ্ঠান একীভূত হলে বিপণন ও প্রশাসনিক ব্যয় কমে আসে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে কোম্পানির মুনাফায়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটছে ঠিক এর উল্টো। দেশে এখন পর্যন্ত যত একীভূত বা অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, এর প্রায় সবই একই গ্রুপের কোম্পানি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোম্পানির ধরনেও ভিন্নতা রয়েছে। বস্ত্র খাতের কোম্পানির সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা সিরামিক পণ্য উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান একীভূত হয়েছে। যদিও এক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা নেই। তবে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে একীভূতকরণ সম্পন্ন হয়েছে, পরবর্তী সময়ে তার সুফল মেলেনি।

এ বিষয়ে বিএসইসির কমিশনার আরিফ খান জানান, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর আইন পর্যালোচনা করে শিগগিরই নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, দেশে একীভূতকরণ প্রক্রিয়াটি প্রথম শুরু করেন সালমান এফ রহমান। ২০০৫ সালে তার মালিকানাধীন বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে বেক্সিমকো ইনফিউশন একীভূত হয়। দুটি কোম্পানিই ওষুধ খাতের হওয়ার পরও মুনাফার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারেনি একীভূত হওয়া কোম্পানিটি। ২০০৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বেক্সিমকো গ্রুপের পদ্মা টেক্সটাইল মিলসের সঙ্গে বেক্সিমকো টেক্সটাইলস, বেক্সিমকো ডেনিমস ও বেক্সিমকো নিটিং একীভূত হয়। পরে পদ্মা টেক্সটাইলস বেক্সটেক্স নাম ধারণ করে ও ২০১১ সালে বেক্সিমকো লিমিটেডের সঙ্গে একীভূত হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ অনলাইন লিমিটেড, ঢাকা সাংহাই সিরামিক, শাইনপুকুর সিরামিক, শাইনপুকুর হোল্ডিংস ও বেক্সিমকো ফিশারিজ একীভূত হয় বেক্সিমকো লিমিটেডের সঙ্গে। তবে একাধিক কোম্পানি একীভূত করেও বেক্সিমকো লিমিটেডের মুনাফা বাড়ানো যায়নি। ২০১২ সালে কোম্পানিটির আয়ে বড় ধরনের ধস নামে। ২০১১ সালে কোম্পানিটির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ২০ টাকা ৫০ পয়সা হলেও পরের বছর তা ৩ টাকা ৮৩ পয়সায় নেমে আসে। আর চলতি হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে তা নেমে এসেছে ৭৭ পয়সায়।

একইভাবে ২০০৮ সালে তৃপ্তি ইন্ডাস্ট্রিজকে একীভূত করে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটি মুনাফা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। তবে এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয় সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট। ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি ওশেন কনটেইনার্স একীভূত হওয়ার পরও সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের আয় বাড়েনি, বরং কমেছে।

একীভূতকরণ বিষয়ে সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেডের পরিচালক সৈয়দ ফজলুল হক বলেন, ‘একই খাতের দুটি কোম্পানি একীভূতকরণের ফলে আমাদের শক্তি বেড়েছে। উন্নত মানের সেবাও দিতে পারছি। তবে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে সেবামূল্য কমে যাওয়ায় সাময়িকভাবে কোম্পানির ইপিএস কমে গেছে। পাশাপাশি লভ্যাংশ হিসেবে শেয়ারহোল্ডারদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বোনাস শেয়ার ইস্যুর কারণেও ইপিএস কমায় প্রভাব ফেলেছে। আমরা আশা করছি, দীর্ঘমেয়াদে একীভূতকরণের সুফল পাওয়া যাবে।’

একই দশা কেয়া কসমেটিকসেরও। ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর কেয়া ডিটারজেন্ট ও কেয়া সোপ কেমিক্যালস লিমিটেড একীভূত হওয়ার আগে কেয়া কসমেটিকসের ইপিএস ছিল ৫ টাকা ২৬ পয়সা। একীভূত হওয়ার পরই কোম্পানিটির ইপিএস ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০১৩ সালে ইপিএস নেমে এসেছে ১ টাকা ৫৫ পয়সায়। এ অবস্থায় নতুন করে একই গ্রুপের অন্য খাতের আরো তিন কোম্পানিকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছেন কেয়া কসমেটিকসের উদ্যোক্তারা।

এক্ষেত্রে একীভূত হতে যাওয়া তিন কোম্পানির সম্পদমূল্য ও মুনাফার প্রকৃত চিত্র গোপন করে নিরীক্ষকের সাহায্যে লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাগজে-কলমে লাভজনক দেখানো হয়েছে। একীভূত হলে তিন কোম্পানির হাজার কোটি টাকার ব্যাংকঋণ কেয়া কসমেটিকসের ওপর বর্তাবে। এতে শেয়ারহোল্ডাররা লাভবান না হলেও কোম্পানির উদ্যোক্তারা কেয়া কসমেটিকসের প্রায় সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা মূল্যের শেয়ার পাবেন।

দেশে এ-বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ আইন না থাকায় শুধু আদালতের অনুমোদন নিয়েই তালিকাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে একীভূত হওয়া যায়। ফলে সরাসরি তালিকাভুক্ত না হলেও পরোক্ষভাবে তালিকাভুক্ত হয়ে শেয়ারবাজারের সব সুবিধা নেয়া যায়। একই সঙ্গে নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে কারসাজির মাধ্যমে ইচ্ছামতো শেয়ারের মূল্য ও বিনিময় হার নির্ধারণের সুযোগ থাকায় আইপিওর চেয়ে বেশি মুনাফা পাওয়া যায়।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, একীভূতকরণ বা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় কোম্পানিগুলো শেয়ারের সম্পদমূল্য বা বিনিময় হারের যে প্রস্তাব করে, কোনো প্রতিপক্ষ না থাকায় আদালতে তার হুবহু অনুমোদন পেয়ে যায়। এক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় কোম্পানির একীভূতকরণ প্রস্তাবও যাচাই করছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এ বিষয়ে ল ফার্ম দ্য লিগ্যাল সার্কেলের ফাউন্ডার ও একীভূতকরণ বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার অনিতা গাজী রহমান বলেন, কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি একীভূতকরণের প্রক্রিয়া শুরুর প্রথমেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জকে জানাতে হয়। এক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার্থে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জ চাইলে পক্ষভুক্ত হয়ে শুনানিতে অংশ নিতে পারে। কমিশনের প্যানেল আইনজীবী রয়েছেন, যারা দক্ষ। কমিশন চাইলেই সংশ্লিষ্ট মামলায় অংশগ্রহণ করতে পারে। এমনকি শেয়ারহোল্ডারও তার অধিকার রক্ষার্থে মামলায় পক্ষভুক্ত হতে পারে। কিন্তু এর কোনো নজির নেই।

এদিকে নানা বিতর্কের পর ভারতে সম্প্রতি একীভূত বা অধিগ্রহণসংক্রান্ত আইন তৈরি হয়েছে। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের স্বার্থ রক্ষায় ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কোম্পানি আইন সংশোধন করে একীভূত বা অধিগ্রহণ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা জারি করেছে ভারতীয় শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা (এসইবিআই)। এতে একীভূতকরণের স্কিম আদালতে উপস্থাপনের আগে স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে অনাপত্তিপত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া স্কিমটি আদালতের অনুমোদনের পর অতালিকাভুক্ত কোম্পানিকে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে অনুমোদনও নিতে হবে।

এছাড়া লিস্টিং রেগুলেশনে পরিবর্তন এনে একীভূত স্কিম আদালতে উপস্থাপনের ন্যূনতম এক মাস আগে তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে তা অনুমোদনের জন্য স্টক এক্সচেঞ্জে দাখিলের জন্য বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থাও তা বিশ্লেষণ করবে। বিশ্লেষণ করা হবে ভ্যালুয়েশন ও আর্থিক প্রতিবেদনসহ অন্যান্য বিষয়। আর এসইবিআইয়ের লিস্টিং রেগুলেশন অনুসারে আদালতের অনুমোদন পাওয়ার পর একীভূত হওয়া তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিকে আইপিও শর্ত থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করতে হবে। কেস-টু-কেস ভিত্তিতে এসইবিআই তা অনুমোদন করবে।বণিকবার্তা।