ঢাকা প্রযুক্তি

ঢাকার ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যত অচল!

পৃথিবীর সব চেয়ে বেশি মানুষ বসবাস করা শহরের একটি ঢাকা। অতিমাত্রায় মানুষের পদার্পণের কারণে রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে তীব্র যানজটের কবলে আক্রান্ত হয়ে আছে। এ সমস্যা সমাধের লক্ষ্যে ২০০৯ সালে কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকায় স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করা হলেও কার্যত তা অচল হয়ে পড়ে আছে!

জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ট্রাফিক পুলিশের দ্বন্দ্বের জের ধরে এখন সেই সিগন্যাল বাতি সময়মতো জ্বলে ওঠে ঠিকই, কিন্তু অনুসরণ করে না ট্রাফিক পুলিশ। এ অবস্থায় যানজট নিরসনে ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকার ৬৫টি ট্রাফিক সিগন্যাল ইন্টারসেকশনে ‘টাইমার কাউন্টডাউন’ যন্ত্র বসাচ্ছে। ইতোমধ্যে ৩৫টি ইন্টারসেকশনে পরীক্ষামূলকভাবে এ যন্ত্র চালু করা হয়েছে। কিন্তু টাইমার কাউন্টডাউন যন্ত্রও অনুসরণ করছে না ট্রাফিক পুলিশ। তারা এখনও বাঁশি, লাঠি, রশি ও হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতির মতো এ যন্ত্রটিও যানজট নিরসনে কতটা ভূমিকা রাখবে, এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ঢাকার যানজট নিরসনের অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর ৭০টি স্থানে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানো হয়। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০০৮ সালের শেষ দিকে। ২০০৯ সালের ২২ নভেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল চালু হয়। তখন স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি মেনে চলার জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টিসহ কঠোর শাস্তির ঘোষণাও দেওয়া হয় পুলিশের পক্ষ থেকে।

তখন ট্রাফিক পুলিশ সবুজ, হলুদ ও লাল বাতির মাধ্যমে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। চালকরাও তা অনুসরণ করছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর পুলিশের কঠোরতা শিথিল হয়ে যায়। আবার রাজধানীর যানজট নিরসন পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে আসে। একপর্যায়ে ডিসিসি-পুলিশ দ্বন্দ্বের জের ধরে ট্রাফিক পুলিশ ওই সিগন্যাল বাতি অনুসরণ না করে হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে ঢাকার ট্রাফিকব্যবস্থা আধুনিকীকরণের সুফল পাচ্ছে না রাজধানীবাসী। তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে যানজট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থা। যে কারণে যানবাহন চলছে এখনও ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায়।

ডিএসসিসি ও ডিএনসিসির কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী মার্চের মধ্যে ৬৫টি সিগন্যালে ‘টাইমার কাউন্টডাউন’ যন্ত্র স্থাপন কাজ শেষ করা হবে। এ যন্ত্রের ব্যবহার হলে বর্তমানের চেয়ে অন্তত ১০ ভাগ ট্রাফিক মোবিলিটি বৃদ্ধি পাবে। কোন ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি কতক্ষণ থামবে, তা ওই সিগন্যালের পুলে স্থাপিত টাইমার কাউন্টডাউন যন্ত্রে ভাসতে থাকবে। নির্দিষ্ট সময় থেকে কাউন্টডাউন করে শূন্যে নেমে আসার পর সবুজ বাতি জ্বলার সঙ্গে-সঙ্গে সিগন্যাল থেকে গাড়িগুলো ছেড়ে যেতে পারবে। এ পদ্ধতি পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করা গেলে রাজধানীর যানজট কমে আসবে বলে তারা মনে করেন।

জানা গেছে, পিক আওয়ারে সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা এবং বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ২ মিনিট পর-পর সিগন্যাল পড়বে। অফপিক আওয়ারে সকাল ৬টা থেকে ৮টা, বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৪টা এবং রাত ৮টা থেকে ১০ পর্যন্ত আড়াই মিনিট পর-পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিগন্যাল পড়বে।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির কেইস প্রকল্পের পরিচালক মো. শিহাব উল্লাহ বলেন, দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আগামী মার্চে ৬৫টি সিগন্যালে ‘টাইমার কাউন্টডাউন’ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। টাইমার পরিপূর্ণভাবে কাজ করার জন্য শক্তি জোগাতে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুত্-চালিত সোলার প্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে যে-কোনও সময় সোলার প্যানেলের জমাকৃত চার্জ ফুরিয়ে গেলে ট্রাফিক সিগন্যালের টাইমিং ব্যবস্থা যেন মুহূর্তের জন্যও থমকে না যায় এজন্য এতে বিদ্যুত-সংযোগও দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, রাজধানীবাসীর দৈনন্দিন মূল্যবান কর্মঘণ্টা বাঁচাতে প্রতিদিনের যানজট থেকে স্বস্তি দিতে ও যানজটে সৃষ্ট কষ্ট, যন্ত্রণা লাঘব করতেই অত্যাধুনিক পদ্ধতির টাইমার কাউন্টডাউন যন্ত্র স্থাপনের এ উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে টাইমার কাউন্টডাউন চালু করা প্রসঙ্গে ডিসি ট্রাফিক (দক্ষিণ) খান মোহাম্মদ রেজোয়ান বলেন, কোনও স্টাডি ছাড়া কোটি-কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত ওইসব সিগন্যাল মেনে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা হলে ঢাকায় যানজট আরও বাড়বে। কারণ ওই টাইমার কাউন্টডাউন ঘড়িতে প্রতিটি সড়কমুখে সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সকালে সচিবালয়মুখী গাড়ি বেশি থাকে। দুপুরে তার উল্টো হয়। তাই একেক সময় টাইম কাউন্টডাউনের তারতম্য দরকার। যেটা মাঠে কাজ করা ট্রাফিক পুলিশই ভালো জানে।