জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর রাজনীতি

উপজেলা নির্বাচন আধিপত্যের জন্যই

 মেহেদি হাসান, ঢাকা, ৩১ জানুয়ারি :  ক্ষমতা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জমে উঠেছে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। উপশহর ও গ্রামাঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে  উপজেলা পরিষদ কার্যকর প্রতিষ্ঠান না হলেও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের  ক্ষমতা প্রদর্শনের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।যে কারণে নতুন সরকারকে বৈধতা না দিয়ে, চরম বৈরি সম্পর্কের মধ্যেও  নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি। উপজেলা পরিষদ কতটা কার্যকর ফের সেই প্রশ্ন উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির চতুর্থ নির্বাচনের আগে। পরিষদে সীমিত অর্থায়ন থাকলেও এর রয়েছে বিশাল আন্ত:কোন্দল। ত্রিমুখী ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে উপজেলা পরিষদ ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উপজেলা পরিষদ স্থানীয় সরকারের উন্নয়নে ততটা ভূমিকা না রাখলেও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতা, দাপট আর আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

ইউনিয়ন পরিষদের পর উপজেলা পরিষদ স্থানীয় সরকারের দ্বিতীয় স্তরের প্রশাসনিক ধাপ। যে কারণে কোনো রাজনৈতিক দলই এই ক্ষমতা থেকে দূরে থাকতে চায়না। স্থানীয় রাজনীতিতে শীর্ষ নেতৃত্বে যারা থাকেন তাদের জাতীয় সংসদ সদস্য পদের পরে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের প্রতি আকাঙ্খা থাকে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের স্থানীয় প্রভাব, দাপট ধরে রাখতে ও প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটাতে উপজেলা পরিষদ’কে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়।

রাজনীতির এই অবস্থান থেকে আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে দলটি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে। অবৈধ ঘোষণা করেছে ওই নির্বাচন ও সরকারকে। তবে স্থানীয় রাজনীতির দাপট   ও ক্ষমতা বজায় রাখতে অংশ নিচ্ছে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে।  মুখে যে ভাষাতেই সরকারের সমালোচনা করুক না কেন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে এই সরকারকে আনুষ্ঠানিক বৈধতা দিচ্ছে বিএনপি।

বড় তিন দল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং বিএনপি অংশ নেওয়ায় ইতোমধ্যে জম্পেস হয়ে উঠেছে উপজেলা পরিষদের নির্বাচন। প্রচার প্রচারণা এখন তুঙ্গে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে শীতল আবহ ছিল তার থেকে চরম উষ্ণ হয়ে উঠেছে নির্বাচনী মাঠ।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ অবশ্য বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর মোড়কে হবেনা । তারপরও প্রার্থীরা কোনো না কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় দলীয় প্রভাব কিছুটা থাকবে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় এসে উপজেলা ব্যবস্থা চালু এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচন করেছিলেন। ৯০’র গণঅভুত্থানে ক্ষমতা ছাড়ার আগ পর্যন্ত তার আমলে আরো একবার হয়েছিল উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। এর প্রায় ১৮ বছর পরে ২০০৯ সালে মহাজোট সরকারের সময় উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ধারাবাহিকতায় ফের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চতুর্থবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই নির্বাচন।

উপজেলা পরিষদ কতটা কার্যকর সেই প্রশ্ন উঠেছে গত পাঁচ বছরে উপজেলা পরিষদের কার্যক্রম নিয়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, গত পাঁচ বছরের বেশিরভাগ সময় কটেছে উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মাঝে মতপার্থক্যের ভেতর দিয়ে।

এই কারণে উপজেলা পরিষদ কাঙ্খিত পর্যায়ে কার্যকরী হতে পারেনি বলে মনে করেন উপজেলা চেয়ারম্যানরা।

ময়মনসিংহের সদর উপজেলার চেয়ারম্যান ফয়জুর রহমান ফকির বলেন বর্তমানে উপজেলা চেয়ারম্যানদের ক্ষমতা খুবই সীমিত।

তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে উপজেলা চেয়ারম্যানরা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে বছরে ৮২ লাখ টাকা, একটি জেলায় টিআর এবং কাবিখা বরাদ্দ থেকে ২০ শতাংশ এবং ভূমি হস্তান্তর করের মাত্র এক শতাংশ পেয়ে থাকেন।

এসব বারাদ্দ থেকে তারা সীমিত উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নেন বলে জানান তিনি। এছাড়া অধিকাংশ কাজের ক্ষেত্রে উপজেলা চেয়ারম্যানদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ফয়জুর রহমান ফকির বলেন, মাসে চার-পাঁচদিন উপজেলা পরিষদে উপস্থিত হলেই দাপ্তরিক কাজ শেষ হয়ে যায়।

তিনি জানান, উপজেলা পর্যায়ে সরকারের ১৭টি বিভাগের ৭০টি কমিটির মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়। এসব কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আর উপদেষ্টা থাকেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। কাজগুলো ইউএনও এবং এমপি মিলে করে ফেলেন। কাজগুলো উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে আসেও না এবং চেয়ারম্যানের প্রয়োজনও পড়েনা।

গত পাঁচ বছরে অধিক ক্ষমতায়নের দাবিতে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা সরকারের সঙ্গে নানা দেন-দরবার করেছেন। কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হয়নি। স্থানীয় সরকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরাও সেটা মনে করেন।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, উপজেলা পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তা, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং এমপিদের মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি। কারণ প্রায় দুই দশক ধরে উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থার কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

ড. আহমেদ বলেন, শুধু আইন করে উপজেলা পরিষদের সমস্যার সমাধান করা যাবেনা। এটা ধীরে ধীরে কাজ করার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে। যেহেতু উপজেলা নির্বাচনের ধারাবাহিকতা রক্ষা হচ্ছে, আশা করি এ সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা যাবে।

সরকার বিভিন্ন সময় উপজেলা পরিষদকে ক্ষমতায়নের কথা বলেছে । কিন্তু তাতে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি বলে মনে করেন উপজেলা চেয়ারম্যান এবং বিশেষজ্ঞরা।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন, উপজেলা পরিষদকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া উচিত।

তিনি স্বীকার করেন, বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় এমপি এবং উপজেলা চেয়ারম্যানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিলো। তবে অনেক জায়গায় কাজের চেয়ে ব্যক্তিগত বিষয় বেশি প্রাধান্য পেয়েছে ।

ইমাম বলেন, “এবার উপজেলা পরিষদকে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু বানানোর চেষ্টা করা হবে। উপজেলা পরিষদকে চলতে দেওয়া হবে তার নিজস্ব গতিতে।”