ঢাকা নারয়ণগঞ্জ লাইফ স্টাইল

বোস কেবিনে চায়ের খোঁজে

লাইফস্টাইল প্রতিবেদক, ঢাকা, ২৯ জানুয়ারি :  অনেকের কাছেই অজানা হতে পারে। তবে বোস কেবিনের প্রতিষ্ঠাতা ভুলু বাবুর কড়া লিকারের চা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র পান করেছিলেন। প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত নারায়নগঞ্জ শহরের প্রসিদ্ধ বোস কেবিন প্রাচীন খাবারের দোকানও বটে।
স্থানীয়দের অনেকেই আছেন, যারা দিনের একটি সময় বোস কেবিন যাবেন। এমন লোকের মধ্যে আছেন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্রকার, গায়ক, শিক্ষক, অভিনেতা, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ। আর তারা যাবেনই বা কেন, নারায়ণগঞ্জে গত ৯৩ বছর ধরে এই রেস্তোরা তাদের সঙ্গী হয়ে থেকেছে, আছেও।

যেভাবে শুরু বোস কেবিন :
নারায়ণগঞ্জ ১ নম্বর ও ২ নম্বর রেলগেইটের মাঝামাঝি, ফলপট্টির কাছাকাছি রেললাইনের পাশেই বোস কেবিন। রেস্তোরাটি দেখতে মোটেই জাঁকজমকপূর্ণ নয়। আধাপাঁকা টিনের চালা দেওয়া একটি ঘরে ভিতরে এই রোস্তারা। জরাজীর্ণ পরিবেশ হলেও তা প্রসিদ্ধ নামেই। লোকে এক তাকে চেনে বোস কেবিন নামেই।

১৯২১ সালে একটি টংঘরে বোস কেবিনের যাত্রা শুরু। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নৃপেন চন্দ্র বসু। তিনি ভুলুবাবু নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। ২০ বছর বয়সে জীবিকার সন্ধানে বিক্রমপুরের ষোলঘর থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। শুরুতে ছোট টংঘরে কড়া লিকারের চা, লাঠি ও বাটার বিস্কুট নিয়ে বসেন। তখনই তার দোকান জনপ্রিয় হতে থাকে। ধীরে ধীরে দোকানের কলেবর বাড়তে থাকে, নাম হয় নিউ বোস কেবিন।
ভুলুবাবুর নাতি তারক চন্দ্র বসু বলেন, ‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু নারায়নগঞ্জ এলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। খবর পেয়ে দাদা ভুলুবাবু, কড়া ও হালকা লিকারের দুই কেতলি চা বানিয়ে ছুটলেন নেতাজীর কাছে। সেই চা খেয়ে তখন খুবই খুশি হয়েছিলেন নেতাজী, আশীর্বাদও করেছিলেন।’

তারক আরও জানান, নেতাজীর চা প্রীতির কথা সবার মতো স্বাধীনতাকামী ভুলুবাবুও জানতেন। এরপর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পরে বোস কেবিনের চায়ের খ্যাতি। অবশ্য এর বিশেষ কারণও ছিল। রঙের জন্য সে চা আসত আসাম থেকে। দুই রকম চায়ের সুষম মিশ্রণে তৈরি হতো এক অসাধারণ চা, যা পান করে তৃপ্তিতে ভরে ওঠেননি এমন চাপ্রেমী কমই আছেন।

পাকিস্তানের অভ্যুদয়ের প্রথম দশকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতারা প্রায়ই নারায়ণগঞ্জে যাতায়াত করতেন। বোস কেবিনের বিখ্যাত চা, কাটলেট কিংবা বাটার টোস্ট না খেয়ে তাঁরা কখনো ফিরতেন না। এই উপমহাদেশের অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব এসেছেন বোস কেবিনে। এখনো সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনীতিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ ভিড় করেন এখানে। চায়ের টেবিলে ওঠে আলোচনার ঝড়। চা পানের টানেও শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখনো আসে বোস কেবিনে। বোস কেবিন সামাজিক যোগাযোগেরও একটি কেন্দ্র। এই যোগাযোগ রক্ষার জন্যও অনেকে নিয়মিত আসেন এখানে।

বোস কেবিনের চা ও খাবার :
প্রচণ্ড ভিড় হয় এই রোস্তারায়। প্রায়ই এত মানুষ খেতে আসে যে, বসার জায়গার জন্য বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। জমকালো না হলেও বেশ পরিপাটি, গোছালো ও রুচিকর পরিবেশ। পেছনের দিকে বসার বিস্তর জায়গা। এক পাশে টিউবওয়েল, আরেক পাশে খাবার তৈরির ঘর। এখানে খাবার পানি হিসেবে টিউবওয়েলের পানিই ব্যবহার করা হয়।
বোস কেবিনে ঢুকে টিউবওয়েলের শীতল পানিতে হাত মুখ ধুয়ে প্রথমে নিজেকে জিরিয়ে নিন। তারপর খাবারের অর্ডার দিন। এখন বোস কেবিনের খাবারের মেন্যুতে আগের মতো অনেক পদের দেখা না মিললেও আছে পুরোনো অনেক কিছুই। সকালের নাস্তায় পাওয়া যায়  ৫ টাকা দরে পরটা।  ডাল ও হালুয়া ৮ টাকা। ডিমের ৬  রকম পদ। এছাড়াও খাসি, মুরগির মাংসের তরকারি।
দুপুর ১২টা থেকে পাওয়া যায় আলুর চপ। যারা দাম রাখা হয় ১৫ টাকা। পোলাও ৪০ টাকা। মোরগ পোলাও ৮০ টাকা। কারি ৮০ টাকা। চিকেন কাটলেট ৭০ টাকা।
বোস কেবিনের চায়ের খুব নামডাক। যে চা নেতাজী খেয়েও প্রশংসা করেছিলেন, সেই কড়া লিকারের চা বড় বড় কাপে পান করতেই পারেন ১০ টাকায়। সারাদিনই এখানে চা পাওয়া যায়।
এই বিখ্যাত কেবিনটি খোলা থাকে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত।

ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন :
বাসে করে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যেতে ৩০ টাকা ভাড়া লাগে। গুলিস্থান থেকে উৎসব, বন্ধন, বিআরটিসি বা বোরাক বাস সার্ভিসে সরাসরি কালীরবাজার নেমে রিকশায় বা হেঁটে চেম্বার রোডে গেলেই পেয়ে যাবেন বোস কেবিন। চাইলে রেলগাড়ি বা লঞ্চেও নারায়ণগঞ্জ যাওয়া যায়। চায়ের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি ঘুরে আসতে পারেন নারায়ণগঞ্জ শহরও।