বরিশাল বিনোদন ভোলা লাইফ স্টাইল

দ্বীপজেলায় প্রথম ছবির শুটিং

 এম. শরীফ হোসাইন, ভোলা:   ষাটের দশকের সারা জাগানো ত্রিভূজ প্রেমের ছবি ময়নামতির রিমেক হচ্ছে। পুরোনো ময়নামতির সত্ত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান চিত্রাফিল্মস আর জাজ মাল্টিমিডিয়া যৌথভাবে ময়নামতি ছবিটির রিমেক করছে। ইতোমধ্যেই ছবিটির শুটিং ও সম্পাদনার কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। ছবিটির সবচেয়ে ব্যতিক্রম বিষয় হচ্ছে, চলচ্চিত্রে নতুন এমন লোকেশনে ছবিটি চিত্রায়িত হয়েছে। লোকেশনটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম সমৃদ্ধ দ্বীপজেলা ভোলার। আমাদের ভোলা প্রতিনিধি এম. শরীফ হোসাইন ময়নামতি ছবিটির নানান কাহিনী তুলে ধরেছেন তার প্রতিবেদনে।সূত্রে জানা যায়, দেশের চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে এই প্রথম কোন ছবির শুটিং হলো দ্বীপজেলা ভোলায়। তাও আবার একটু-আধটু নয়, পুরো ছবিটির চিত্রই ধারন করা হয়েছে ভোলা থেকে। ভোলার খাল-বিল-নদী-নালা-বন-বাদাড় আর সাগর পাড়ের নৈসর্গিক স্পটগুলোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে পুরো কাহিনীর শুটিং। কেন দ্বীপজেলায় এই শুটিং এ প্রসঙ্গে একান্ত সাক্ষাতকারে ছবিটির পরিচালক জকির হোসেন রাজু বললেন, আমরা আমাদের চলচ্চিত্রে দেশের বিভিন্ন এলাকার চিত্র এক্সপোজ করেছি। এই ছবিটির লোকেশন ঠিক করতে গিয়ে আমি দেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরেছি। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গ পুরোটা ঘুরে ভোলাকে সিলেক্ট করেছি। ভোলার চিত্র দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা না হলেও এটা ব্যাতিক্রম। ছবিতে সম্পূর্ণ নতুন। এই লোকেশন দেখে দেশবাসী বলতে বাধ্য হবে, আমাদের বাংলাদেশ কত সুন্দর। ভোলাবাসীও জানতে পারবে তাদের ভোলাকে। আমরা এর মাধ্যমে এক নতুন বাংলাদেশকে আবিস্কার করছি।১৯৬৯ সালে দেশের শক্তিমান পরিচালক কাজি জহির ময়নামতি ছবিটি তৈরী করেন। এটি একটি লোকজ প্রেমের কাহিনী হিসেবে আজো দর্শকদের হৃদয় ছুয়ে যাচ্ছে। সেই কাহিনীটিকে সম্পূর্ণ নতুন রুপে আবার দর্শকদের সামনে নিয়ে আসছেন পরিচালক জাকির হোসেন রাজু। তিনি কাহিনী সম্পর্কে সংক্ষেপে বলেন, ময়নামতি একটি ত্রিভূজ প্রেমের কাহিনী। মতি এবং মনা দু’জনেই ভালোবাসে ময়নাকে। কিন্তু ময়না ভালোবাসে শুধুমাত্র মতিকে। তবে মনা এবং মতি কেউই ময়নাকে পায় না। ময়নার বিয়ে হয়ে যায় অন্য একজন শিল্পপতির সাথে। মনা ও মতির দুজনেরই চোখের পানি ঝরে। ময়নাকে হারিয়ে মনা নিঃস্ব হয়ে পরে। ময়নার সুখের জন্য মনা শিল্পপতিকে খুন করে ফাঁসির দন্ডে দন্ডিত হয়। অবশেষে ময়না এবং মতির মিলন হয়। আগের ময়নামতিতে অভিনয় করেছিলেন নায়ক রাজ রাজ্জাক এবং কবরী। আর রাজ্জাক-কবরীর পরিবর্তে এবার অভিনয় করছেন বাপ্পী এবং মাহি। পুরোনো ময়নামতি’র পাহাড়সম জনপ্রিয়তাকে ডিঙ্গিয়ে রিমেক ময়নামতিকে আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া কিংবা আগের জনপ্রিয়তাকে ছাপিয়ে ওঠা পরিচালকের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ বলেও মনে করেন ছবিটির পরিচালক। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৪৩ বছর আগে কাজি জহির রাজ্জাক-কবরীকে নিয়ে যে ময়নামতি করেছেন, আমি জাকির হোসেন রাজু আজকের বাপ্পী-মাহিকে নিয়ে সেই জায়গায় পৌঁছানো খুবই কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং। এই কাজটি করতে গিয়ে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। আজকের দর্শক যাতে করে কোনভাবেই হতাশ না হন আমি সেদিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছি। চেষ্টা করেছি ছবিটিকে আগের চেয়েও ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে। আমি আশা করছি সফল হব, দর্শক হতাশ হবেন না, ভালো কিছু পাবেন।ময়না এবং মতির মত গ্রামীণ চরিত্রে বিশেষ করে রাজ্জাক-কবরীর আলোড়ন সৃষ্টিকারী চরিত্রে অভিনয় করতে পেরে বাপ্পী ও মাহি উভয়ই এই সুযোগকে তাদের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি বলে মনে করছেন। একান্ত সাক্ষাতকারে ছবির অভিনেতা বাপ্পী বলেন, রাজ্জাক স্যারের চরিত্রে অভিনয় করা এটা আমার জন্য একটা বড় ধরনের পাওয়া। বিশাল ব্যাপার। আনএক্সপেক্টটেড ব্যাপার। এটা বলে বুঝানো যাবেনা। ছবির অভিনেত্রী মাহি বলেন, ময়নামতি ছবিটি কাজি জহিরের একটি বিখ্যাত ছবি। এই ছবির সাথে অন্য ছবির পার্থক্য অনেক। এই ছবিতে কবরি ম্যাডামের চরিত্রে অভিনয় করা ডেফিনেটলি আমার কাছে অন্য রকম একটি ছবি। অনেক পার্থক্য। আগের ময়নামতি যেভাবে দর্শকদের আকৃষ্ট করেছিল, এবারের ময়নামতিও তেমনিভাবে দর্শক মনে জায়গা করে নিতে পারবে বলে মনে করছেন নতুন প্রজন্মের এই দুই অভিনেতা-অভিনেত্রী। তাদের অভিব্যক্তি জানতে চাইলে অভিনেত্রী মাহি বলেন, এই ছবিটি সফল হবে। দর্শকরা দেখতে আসবে। সেই জেনারেশনের রাজ্জাক-কবরী কেমন অভিনয় করলো। আর এই জেনারেশনের বাপ্পী-মাহি কেমন করছে তা দেখার জন্যই দর্শকরা অবশ্যই হলে আসবে। ছবিটি আগের ময়নামতিকে ছাড়িয়ে যেতে না পাড়লেও তার কাছাকাছি পৌঁছবে। অভিনেতা বাপ্পী বলেন, আমি দর্শকদের কথা দিয়েছিলাম ডিফ্রেন্ট কারেক্টর নিয়ে আসবো। এটা সেই কারেক্টর। এখানে দর্শকরা নতুন কিছু পাবে। তারা দু’জনেই ছবিটির ব্যবসায়িক সাফল্য নিয়ে বেশ আশাবাদী। এই জুটি এর আগে আরো ৬টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। কিন্তু এই ছবিটিতে অভিনয় করতে পারা তাদের জন্য বেশ আনন্দ এবং গর্বের বলেও দাবী করেছেন। অন্যান্য ছবির চেয়ে এই ছবিতে তাদের অভিনয়েও একটু ভিন্নতা ছিল বলে মনে করছেন তারা। এ সম্পর্কে অভিনেতা বাপ্পী বলেন, এটি আমাদের ৬ষ্ঠ ছবি। মাহি এমনিতেই একজন ভালো অভিনেত্রী। এই ছবিতে সে আরো ভালো অভিনয় করেছে। আমি মতি হিসেবে কেমন করেছি জানিনা, তবে মাহি ময়না হিসেবে অনেক ভালো করেছে। এটি একটি অনেক ভালো কাজ হয়েছে।অভিনেত্রী মাহি বলেন, বাপ্পীর সাথে অনেকগুলো ছবি করেছি। সবগুলো ছবি থেকে এই ছবিতে কেন যেন ও একটু ডিফ্রেন্ট ছিল। অন্য সব ছবি থেকে এই ছবিতে ওর সাথে কাজ করে আমার খুব ভালো লেগেছে। থ্যাংকস বাপ্পীকে।পুরোনো ময়নামতি ছবির ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন ছিড়ে যায়’ গানটির শুটিং হয়েছে ভোলার সর্ব দক্ষিণের ঢালচর তাড়–য়া সমুদ্র সৈকতের বনাঞ্চল আর দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ঘাসের মাঠে। এছাড়াও ‘জীবন বলেছে তুমি সেই প্রিয়জন’ গানটির শুটিং হয়েছে সেখানে। গানের লোকেশন সম্পর্কেও নায়িকা বাপ্পী ও মাহী’র অনুভূতি ভিন্ন রকম। লোকেশন সম্পর্কে জানতে চাইলে অভিনেতা বাপ্পী বলেন, এ লোকেশনটি সম্পূর্ণ নতুন। এর আগে এখানে কোন ছবি হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ এই লোকেশনটি কখনো দেখেনি। অভিনেত্রী মাহি বলেন, ভোলা একটি ডিফ্রেন্ট লোকেশন। এখানে এসে আমার ডিফ্রেন্ট অভিজ্ঞতা হয়েছে। ট্রলারে বসে মেকআপ করেছি। মেকআপ নড়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে শুটিং করেছি। এখানকার লোকেশন অসম্ভব-অসম্ভব সুন্দর। এক নতুন অভিজ্ঞতা। গত ২১ নভেম্বর ২০১৩ থেকে ৪ জানুয়ারী ২০১৪ টানা ৪৫ দিন ময়নামতি ছবির শুটিং হয়েছে ভোলায়। শুটিং শেষে পুরো ইউনিট এখন ঢাকায় চলে এসেছে। মার্চ-এপ্রিলের দিকে ছবিটি দেশের বিভিন্ন হলে প্রদর্শিত হবে। ভোলার ২টি হলেও একই সঙ্গে ছবি মুক্তি পাবে। ছবিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মনার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন শক্তিমান অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলন। এছাড়া আলী রাজ, সোহেল খান, মঞ্জু, শামীম, রতন ও চিকন আলীসহ ভোলার স্থানীয় কয়েকজন শিল্পী এতে অভিনয় করেছেন। পরিচালক জাকির হোসেন রাজুর পাশে রয়েছেন পরিচালক মোঃ ফিরোজ। নৃত্য পরিচালনায় আছেন মাসুম বাবুল। গান গেয়েছেন মনির খান, পলাশ, ন্যান্সিসহ অনেকে। আগের ময়নামতির চেয়ে বর্তমান ময়নামতি ছবিটি আধুনিক মনস্ক ব্যক্তিদের মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরী হওয়ায় এই রিমেক ছবিটির গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা আগের ময়নামতি’র জনপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন ছবিটির বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বরত কলা-কুশলীরা।