জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর রাজনীতি

কূটনীতিকরা নরম সুরে সরব

 মেহেদি হাসান, ঢাকা, ৮ জানুয়ারি :  বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল এবং জোটকে জরুরিভিত্তিতে অর্থবহ সংলাপে বসাতে আবারো সরব কূটনীতিকরা। চলমান সহিংসতায় বাংলাদেশের উন্নয়ন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সেজন্য কূটনীতিকরা নরম মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ভারতসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশ বাংলাদেশের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে যে বিবৃতি দিয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে এ ধরনের মন্তব্য করেছেন কূটনীতি বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। তিনি বলেছেন, ‘দেশের জনগণ এবং সম্পত্তির ওপর হামলা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। এজন্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের প্রত্যাশায় সাড়া দিয়ে শিগগির অর্থবহ সংলাপ করতে হবে। তার আগে সৃষ্টি করতে হবে শান্তিপূর্ণ সহায়ক পরিবেশ, যেখানে মানুষ সমবেত এবং শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশের চর্চা করতে পারবেন।’

মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘খুব কম সংখ্যক ভোটার উপস্থিতির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ফ্রান্স।’ একই সঙ্গে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই পুনরায় সংলাপ শুরুর আহ্বানও জানিয়েছে দেশটি।

ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দফতরের বিবৃতিতেও বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

তবে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক প্রতিবেশি দেশ ভারত। তারা বলছে, এই নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ারই অংশ। বাংলাদেশের মানুষ কীভাবে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন, তা নির্ধারণ করার এখতিয়ার একান্তই তাদের।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তাও বলেন, আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে নানা মহল থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হলেও যুক্তরাজ্য বলেছে ‘নতুন সরকার জনগণের কল্যাণে কাজ করবে। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি তাদের একপ্রকার সমর্থন ফুটে উঠেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রহমান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে-একথা সত্যি। এনিয়ে যত প্রশ্নই থাকুক, নতুন সরকারের উচিৎ হবে সব দলের অংশগ্রহণে আগামীতে একটি অর্থবহ নির্বাচনের উদ্যেগ নেওয়া। তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আর কিছু বলার থাকবে না।’

‘চলমান সহিংসতা প্রতিরোধের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে ভবিষ্যতে সবদলের অংশগ্রহণমূলক একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে তৎপরতা চালাবে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়। এজন্য তারা উৎসাহ দেবে, কিন্তু চাপ দেবে না।’ বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা যে বিবৃতি দিয়েছে তাতেও এমনটিই আভাস রয়েছে বলে মনে করছে কূটনৈতিক সূত্রগুলো।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হতাশার বিষয়টি পরিষ্কার। তারা এই নির্বাচনকে সবার অংশগ্রহণমূলক বলে মনে করছে না। আরেকটি নির্বাচনের কথা বলছে। সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনায় বসারও তাগিদ দিচ্ছে।

তবে নতুন সরকার গঠন হওয়া মাত্রই পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ এবং সংস্থা দিয়ে সরকারের ওপর প্রবল চাপ দেওয়ার কৌশল নিয়েছে বিএনপি। এজন্যে আন্তর্জাতিক লবিং বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গছে। একই সঙ্গে আন্দোলন অব্যাহত রাখলে দাবি আদায় সহজ হবে বলে মনে করছে দলটি।

প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ছাড়াই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনা সরকার দ্রুত এগোতে থাকলে এর বিপক্ষে কঠোর অবস্থান নেয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঘোষণার পর একে একে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং রাশিয়াও নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই নেতিনাচক মনোভাব এখন আর নেই বলে মনে করছেন কূটনীতি বিশ্লেষকরা।

উল্লেখ্য, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এর মধ্যে জার্মান রাষ্ট্রদূত আলব্রেখট কুনজে এবং কানাডার হাইকমিশনার হেদার ক্রুডেন এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তারা চাইছেন, বাংলাদেশে নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি যেনো কোনোভাবে অবনতির দিকে না যায়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সে লক্ষ্যেই তাদের নতুন করে এই তৎপরতা।