জাতীয় প্রধান খবর

চলছে ভোট গ্রহণ

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা, ৫ জানুয়ারি : সারা দেশে এক যোগে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে। রোববার সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিরতিহীনভাবে চলবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। জাতীয় সংসদের ৩শ`টি একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকার মধ্যে ১৪৭টি আসনে এ ভোটগ্রহণ চলছে।
১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ইতিমধ্যে বিজয়ী হয়েছেন। নির্বাচনে ১২টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ৩৯০জন প্রার্থী বিভিন্ন প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এর একটি বড় অংশ অর্থাত্ ১০৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এ নির্বাচনকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষার এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি গণতন্ত্র হত্যার নির্বাচন বলে অভিহিত করেছে।
আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র রক্ষায় এবং ভোটের অধিকার প্রয়োগের জন্য ভোটারদের নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিএনপি দলমত নির্বিশেষে নির্বাচন বর্জনের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানায়। দুই দলের এই পরস্পর বিরোধী অবস্থানের কারণে নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইতিমধ্যে ১৫০টির মতো ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিসংযোগ-অবরোধ এবং হরতালের মধ্যেই ভোটগ্রহণের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী সামগ্রী পাঠানো হয়েছে।
সেনাবাহিনী-র‌্যাব-বিজিবি-পুলিশ-আনসার নির্বাচনী এলাকায় টহল জোরদার করেছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ স্বচ্ছ নির্বাচন হবে বলে দাবি করেছেন। তিনি ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বিকল্প ব্যবস্থায় ওইসব কেন্দ্রে অথবা তার পার্শ্ববর্তী স্থানে ভোটগ্রহণ হবে। ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৯ জেলায় ভোট হবে। ভোট হচ্ছে না-চাঁদপুর, রাজবাড়ী, জয়পুরহাট, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলায়। এই জেলাগুলোর সব আসনেই প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছেন।

নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রায় সাড়ে চার লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। নির্বাচনী সামগ্রী প্রেরণ ও নজরদারীর জন্য পাবর্ত অঞ্চলের ৩ জেলার ৩৩ কেন্দ্রে ব্যবহার করা হবে হেলিকপ্টার। ১৮ হাজার ২০৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ৭৫ ভাগই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিশন। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে তিনস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

নির্বাচনে বিরোধী জোটের নাশকতার পাশাপাশি কিছু আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর লোকজন পেশিশক্তি ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। বেশকিছু জেলাকে নাশকতা প্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই জেলাগুলো হলো-ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, শেরপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নেত্রকোনা, সাতক্ষীরা, যশোর, মেহেরপুর, খুলনা, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নীলফামারী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, গাইবান্ধা, হবিগঞ্জ, নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার। নির্বাচন উপলক্ষে সারাদেশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। এবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাড়ে চার লাখ সদস্যের বাহিনী নিয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে সশস্ত্র বাহিনী ৫০ হাজার, পুলিশ ৮০ হাজার, র‌্যাব সাড়ে আট হাজার, বিজিবি ১৬ হাজার, আনসার আড়াই লাখ ও কোস্টগার্ড ২০০। ভোটকেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকবে পুলিশ, আনসার ও গ্রাম পুলিশ। মহানগর এলাকার বাইরের সাধারণ ভোটকেন্দ্রে একজন পুলিশসহ ১৪ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে দু`জন পুলিশসহ ১৪ জন দায়িত্বে থাকবেন।

মহানগর এলাকার প্রতি কেন্দ্রে তিন পুলিশসহ ১৬ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পাঁচ পুলিশসহ ১৮ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিত পুলিশ গতকাল শনিবার থেকে দায়িত্ব পালন শুরু করেছে, অবস্থান করবে ভোটগ্রহণের পরদিন পর্যন্ত। আনসার বাহিনী গত বুধবার থেকে দায়িত্বে আছে। আর সশস্ত্র বাহিনী ২৬ ডিসেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন করছে। তারা মাঠে থাকবে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। বিজিবি, কোস্টগার্ড, র‌্যাব ও আর্মড পুলিশ ১ থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবে।

নির্বাচনে মোট ৯ কোটি ১৯ লক্ষ ৬৫ হাজার ৯৭৭ জন ভোটারের মধ্যে এবার ভোট দিবেন ৪ কোটি ৩৯ লক্ষ ৩৮ হাজার ৯৩৮ জন। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হবে। ১৪৭ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র হচ্ছে ১৮ হাজার ২০৮টি। আর ভোটকক্ষ ৯১ হাজার ২১৩টি।

এ আসনগুলোতে ১২টি রাজনৈতিক দলেরসহ মোট ৩৯০ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ভোটযুদ্ধে থাকছেন। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১২০ জন, জাতীয় পার্টি-জাপার ৬৫ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি ২৭, জাসদ ২১, ওর্য়াকার্স পার্টি ১৬, বিএনএফ ২২, গণতন্ত্রী পার্টি ১, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ৬, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ৩, গণফ্রন্ট ১, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ১ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।

এছাড়াও ১০৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। নির্বাচনে দায়িত্বে আছেন রিটার্নিং অফিসার ৫৯, সহকারী রিটার্নিং ২৮৭ জন, প্রিজাইডিং অফিসার ১৮ হাজার ২০৮, সহকারী প্রিজাইডিং ৯১ হাজার ২১৩, পোলিং অফিসার ১ লাখ ৮২ হাজার ৪২৬, ইলেকটরাল ইনকোয়ারি কমিটি ১০৩ (২ সদস্য), জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১৪৭ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ২৯৪ জন। এছাড়া দুর্গম এলাকা বিবেচনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পার্বত্য তিন জেলার ৩৩টি কেন্দ্রে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের ২২টি সংস্থার ১০ হাজার ২০৫ জন, এবং অন্যান্য ৮টি সংগঠনের ৩ হাজার ১৩৬ জন পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন।

বিদেশীদের মধ্যে ভারত ও ভূটান এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে।

নির্বাচন হচ্ছে না ১৫৩ আসনে

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৩ ডিসেম্বর প্রত্যাহারের শেষদিনে ১৫৪ আসনে কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিল না। ফলে স্ব স্ব আসনের রিটার্নিং অফিসাররা প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেন। এর মধ্যে হাইকোর্টের রায়ে কুমিল্লা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এ এস এম কামরুল ইসলামের প্রার্থিতাকে বৈধ বলে ঘোষণা করে। ফলে ইসি ওই আসনে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে এখন ১৫৩ আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এই আসনগুলোর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ১২৭, জাতীয় পার্টি (জাপা) ২০, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টি-জাসদ ৩, ওর্য়াকার্স পার্টি ২ এবং জাতীয় পার্টি-জেপি ১ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। ফলে এসব আসনে আর নির্বাচন লাগছে না।

উল্লেখ্য, গত ১৯ নভেম্বর বর্তমান কমিশন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতশেষে ২৫ নভেম্বর দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। এতে ৫ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়। ২ ডিসেম্বরের মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে ৫ ও ৬ ডিসেম্বর তা যাচাই-বাছায়ের দিন ধার্য করা হয়। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল ১৩ ডিসেম্বর। ১৪ ডিসেম্বর সব প্রার্থীর মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেয় রিটার্নিং অফিসার (জেলা প্রশাসক)। ১৫ ডিসেম্বর থেকে প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়ে চলে ৩ ডিসেম্বর শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত। ৩০০ আসনে ভোটকেন্দ্র ছিল ৩৭ হাজার ৭০৮টি। আর ভোটকক্ষ ছিল ১ লক্ষ ৮৯ হাজার ৭৮টি।