হটনিউজ স্পেশাল

পৃথিবীতে মুক্তিদাতার আগমন

অগাস্টিন সুজন
২৫ ডিসেম্বর। বড়দিন। বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হয় যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন হিসেবে। যিশুর জন্ম হলো মানবরূপে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার পৃথিবীতে আগমন। খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস পৃথিবীতে যিশুর আগমন হয়েছিল মানুষের মুক্তির (নাজাত) জন্য। যিশু এসে মানবজাতির জন্য তাঁর জীবন উৎসর্গ করেন। তার সেজন্যই খ্রিস্টের জন্ম খ্রিস্টানদের কাছে এত তাৎপর্যপূর্ণ।

বড়দিন উৎযাপনের দু’টো দিক বা উপলক্ষ্য আছে। একটি ধর্মীয়। অপরটি সামাজিক। ধর্মীয় দিকের মধ্যে পড়ে আনন্দ বা উৎসবমূখর আবহে যিশুর জন্মের জন্য ¯্রষ্টার স্তব ও এবাদত করা। মানবজাতির জন্য এমন মহামূল্য উপহার দানের জন্য ¯্রষ্টার ধন্যবাদ জানানো। অন্যদিকে সামাজিক দিকের মধ্যে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, উপহার আদান-প্রদান, ক্রিসমাস ট্রি-ঘর-বাড়ি সাজানো, কেক কাটা, পিঠা খাওয়া, সুস্বাদু ও মনোমুগ্ধকর খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা।

বড়দিন শব্দটি এসেছে ইংরেজি ‘ক্রিসমাস’ শব্দটি থেকে। ’ক্রিসমাস’ শব্দটি ’ক্রাইস্ট’ (খ্রিস্ট) এবং ‘মাস’ (উৎসব) এই দু’টোর শব্দের মিলিত রূপ। শব্দগত অর্থে ’ক্রিসমাস’কে ‘খ্রিস্টোৎসব’ বলা যেতে পারে।

২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালন করা হয় বলে অনেকের ধারণা এই দিনেই যিশু খ্রিস্ট জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ধারণা ঠিক নয়। প্রকৃতরূপে যিশুর জন্মগ্রহণের সঠিক দিন-ক্ষণ পাওয়া যায় না। অধিকাংশ ধর্মীয় ইতিহাসবিদ ও বাইবেল বিশারদদের মতে যিশুর জন্ম হয়েছিল এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে। রোমান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৬ষ্ঠ খ্রিস্ট্রপূর্বাব্দের ১৭ই এপ্রিল যিশুর জন্ম হয়।

দিনক্ষণ সঠিকভাবে জানা না গেলেও, যিশুর জন্ম উৎযাপন বর্তমানে এক সার্বজনীন রূপ পেয়েছে। ৩য় শতাব্দিতে রোমান স¤্রাট কন্সটানটাইন প্রথম বড়দিন উৎযাপনের সূচনা করেন। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় ৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে রোমে সর্বপ্রথম বড়দিন উৎযাপন শুরু হয়। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য দেশেও।

তবে শুরু থেকেই ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন বা যিশুর জন্মদিন হিসেবে পালিত হয়ে আসে নি। রোমান সেইন্ট অগাস্টিনের চার্চ ২০ মে তারিখে বড়দিন হিসেবে পালন করতো। কিছু কিছু চার্চ দিনটি পালন করতো ২৫ মার্চে। আবার ৬ জানুয়ারি বড়দিন পালনের তথ্যও পাওয়া যায়। এতসব দিনবিভ্রাটের কারণে পরবর্তী পোপের নির্দেশক্রমে ২৫ ডিসেম্বরই বড়দিন বা যিশুর জন্মদিন হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বড়দিনের ধর্মীয় উপলক্ষ্য:
বড়দিন পালনের মূল উদ্দেশ্য যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন উৎযাপন করা। বড়দিন উৎযাপনের জন্য গির্জাগুলোতে আয়োজন করা বিশেষ প্রার্থনার। মানবমুক্তির উদ্দেশে যিশুর পৃথিবীতে আগমনের জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন বড়দিনের প্রার্থনার প্রধান অঙ্গ। মূলত সৃষ্টিকর্তার স্তবস্তুতি এতে প্রাধান্য পেয়ে থাকে। এছাড়া যেরুজালেমের বেথলেহেম নগরে যিশুর জন্মের কাহিনী পাঠ এবং এর ওপর বিশেষ আলোচনা হয়ে থাকে।

বাইবেল অনুযায়ী স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মে যিশুর জন্ম হয় নি। তার জন্মে পৃথিবীর কোনো পুরুষের প্রয়োজন হয় নি। যিশুর মা মেরির গর্ভধারণ হয়েছিল পবিত্র আত্মার (পাক রুহ) মাধ্যমে। ওই সময় যোসেফ (ইউসুফ) নামে এক কাঠমিস্ত্রির সঙ্গে মেরির বিয়ের কথাবার্তা পাকাপাকি হয়ে ছিল। যোসেফের সঙ্গে মেরির বিয়ের আগেই ঈশ্বর একজন স্বর্গদূত (ফেরেস্তা) পাঠিয়ে যিশুর জন্মের সংবাদ দিয়েছিলেন। দূতের কথা মেরি নিজেও প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেন নি। তাঁর গর্ভে যিশুর জন্ম হবে শুনে তিনি আশ্চর্য হয়ে স্বর্গদূতকে বলেছিলেন, ‘এটা কীভাবে সম্ভব? কোনো পুরুষের সঙ্গে এখনো তো আমার শারীরিক সম্পর্ক হয় নি।’

কিন্তু দূত তাকে বললেন যে এটাই ঈশ্বরের (আল্লাহ) পরিকল্পনা। বাইবেল অনুযায়ী পাক রুহ মেরির গর্ভে এলেন। এতে তিনি গর্ভধারণ করলেন। যথাসময়ে জন্ম হলো যিশুর। মানবরূপে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা নেমে এলেন পৃথিবীতে।

পৃথিবীতে যিশুর আগমনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবজাতির মুক্তি বা নাজাত। আর এই নাজাতের পরিকল্পনা স্বয়ং আল্লাহই করেছিলেন। তিনি সকল মানুষের গুনাহের জন্য নিজের জীবন দিলেন। আর এ উদ্দেশ্যে তাকে আসতে হয়েছে মাটির ধরায়। তার এই আগমনের মহান উদ্দেশ্যকে মানবমুক্তির অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টির মাহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তার ঠিক সেই কারণেই বিশ্বব্যাপী খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা বড়দিনকে এত গুরুত্ব দিয়ে উৎযাপন করে থাকে।

বড়দিনের সামাজিক দিক:
বড়দিনের সামাজিক দিকের মধ্যে পড়ে আতœীয়-স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া। নতুন পোশাক পরে বড়দিনের বিশেষ গির্জায় সামিল হওয়া।

বড়দিন উপলক্ষ্যে খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা শেকড়ের টানে ছুঁটে যান আপনজনের কাছে। কাছের মানুষদের সঙ্গে যিশুর জন্মদিন উৎযাপনের উপলক্ষ্যটা হারাতে চান না কেউই। সামর্থ অনুযায়ী একে অন্যের সঙ্গে উপহার আদান-প্রদান করেন। কাটা হয় বড়দিনের কেক। বাড়িতে বাড়িতে তৈরি হয় বিশেষ পিঠা।

ক্রিসমাস ট্রি-সাজানো বড়দিনের আরও একটি বিশেষ অঙ্গ। ঘরে ঘরে রংবেরঙের কাগজ ও বাতি দিয়ে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো হয়। তবে উৎসবের এই অংশটিও আদি খ্রিস্টানদের নয়। যে রোমানরা গাছের উপাসনা করতো, তারাই পরে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে এই ঐতিহ্য ও আচার পালন বড়দিনের সঙ্গে সংযুক্ত করে।

সান্তা ক্লজ:
বড়দিনের অন্যতম এক চরিত্র সান্তা ক্লজ। শিশুদের কাছে সান্তা ক্লজ দারুণ জনপ্রিয়। প্রচলিত ধারণা হলো সান্তা ক্লজ বড়দিনের আগের রাতে শিশুদের জন্য উপহারের ডালি নিয়ে আসেন। বড়দিনের সকালে শিশুরা ঘুম থেকে উঠে ঘরে (বেশিরভাগ সময় বিশেষত ইউরোপে চিমনির পাশে) রাখা ঝুঁড়িতে সান্তা ক্লজের রেখে যাওয়া উপহার নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে।

আসলে সান্তা ক্লজ হলো একটি মিথ বা পৌরাণিক  কাহিনী। কালের পরিবর্তনে অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনীর মতো সান্তা ক্লজও বর্তমানে এই রূপ পেয়েছে। বাস্তবতা হলো শিশুরা যখন ঘুমিয়ে থাকে মা-বাবা বা আত্মীয়-স্বজন তাদের ঘরে উপহার রেখে দেন। সকালে শিশুরা ঘুম থেকে উঠে সান্তা ক্লজ উপহার দিয়ে গেছে বলে খুশিতে মেতে ওঠে।

সান্তা ক্লজের এই কাহিনীর পেছনে আছে বিশাল এক ইতিহাস। সান্তা ক্লজ হলো সেইন্ট নিকোলাসের ডাচ উচ্চারণ। সেইন্ট নিকোলাস ২৭০ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কের পারারায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মায়রার বিশপ। নিকোলাস একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা ছিলেন। ৩২৫ খ্রিস্টাবে অনুষ্ঠিত নিসিয়া কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য ছিলেন নিকোলাস। ৩৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৬ই জানুয়ারি তিনি মারা যান। ১০৮৭ খ্রিস্টাব্দে একদল নাবিক নিকোলাসের অস্থি তুরস্ক থেকে ইতালির বারির একটি মঠে নিয়ে যান। মঠটি ছিল একটি দেবীর যিনি শিশুদেরকে নানা উপহার দিতেন বলে স্থানীয়রা বিশ্বাস করতেন। নিকোলাস ওই দেবীর জায়গা দখল করেন। ভক্তরা প্রতি বছর ৬ই জানুয়ারি নিকোলাসের প্রয়ানদিনে একে অন্যকে উপহার দিতেন।

নিকোলাসের খ্যাতি খুব দ্রুত ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। জার্মান এবং সেল্টিকরা তখন ওডেনের উপাসনা বা এবাদত করতো। এই ওডেন ছিলেন থর, ব্যালডার ও তিউর বাবা। ওডেনের ছিল লম্বা সাদা দাড়ি এবং তিনি প্রতি বছর শরতের এক সন্ধায় আকাশ থেকে ঘোড়ায় করে নেমে আসতেন। নিকোলাস ধীরে ধীরে ওডেনের জায়গা দখল করেন। সেল্টিকরা তার যে রূপ দাড় করায় সেটা হলো বড় সাদা দাড়িওয়ালা এক বৃদ্ধ, যিনি ভারী শীতের পোশাক পরে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ান।

১৮০৯ সালে ঔপন্যাসিক ওয়াশিংটন আরভিন (রিপ ভ্যান উইঙ্কেল ও দ্য লিজেন্ট অব স্লিপি’র জন্য বিখ্যাত) নিকারবকার হিস্ট্রি নামে ডাচ সংস্কৃতির ওপর একটা ব্যঙ্গরচনা (স্যাটায়ার) লেখেন। সেখানে তিনি একাধিকবার সেইন্ট নিকোলাসের ডাচ নাম ’সান্তা ক্লজ’-এর উল্লেখ করেন যিনি  বড় সাদা দাড়িওয়ালা এক বৃদ্ধ এবং ভারী শীতের পোশাক পরে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ান।

খুব দ্রুতই খ্রিস্টধর্মানুসারীরা নিকোলাসকে একজন সেইন্ট হিসেবে গ্রহণ করেন এবং প্রচার করেন যে ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ নিকোলাস ঘরে ঘরে বাচ্চাদের জন্য উপহার রেখে যান।

১৮২২ সালে ড. ক্লেমেন্ট মুর সান্তা ক্লজকে নিয়ে একটা কবিতা লেখেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন সান্তা ক্লজ ঘরের চিমনি দিয়ে প্রবেশ করে শিশুদের ঝুঁড়িগুলো উপহারে পূর্ণ করে দেন।

বর্তমান সময়ে সান্তা ক্লজের যে ছবি দেখা যায়, তার ¯্রষ্টা চিত্রকর টমাস ন্যাস্ট। তিনি ‘হারপার উইকলি’র জন্য দু’হাজারেরও বেশি সান্তা ক্লজের কার্টুন এঁকেছিলেন। তার আঁকা সান্তা ক্লজের ছবিই বেশি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।

পরিশেষে বলতে হয় ধর্মীয় ও সামাজিক উভয় উপলক্ষ্যের সংমিশ্রণে বড়দিন আজ এক সার্বজনীন রূপ পেয়েছে। ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে বিশ্বজুড়ে বড়দিনে মানুষ যিশুর জন্ম উপলক্ষ্যে মেতে ওঠে উৎসবের আনন্দে। তবে ব্যাহ্যিক উৎসব-আয়োজনই নয়,  যিশু খ্রিস্টের আদর্শ যখন ছড়িয়ে পড়বে সবার মাঝে, তখন বড়দিন হয়ে উঠবে সুন্দর ও স্বার্থক।