ঢাকা প্রযুক্তি

বিজয় দিবসের রচনা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

 আছাদুজ্জামান, ঢাকা, ১৬ ডিসেম্বর:  জাতীয় পতাকাকে বুকে জড়িয়ে তোলা ছবি কিংবা ‘দেখা হবে মিছিলে, কথা হবে স্লোগানে’-এ ধরণের দৃপ্ত চেতনার বহিঃপ্রকাশ প্রায়শই লক্ষ্য করা যাচ্ছে নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপ, গুগল প্লাস ইত্যাদি আগে প্রায় সম্পূর্ণভাবেই আত্মকেন্দ্রিক ভাবনা প্রকাশে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্বশীলতার অনুভূতি প্রকাশেও এ মাধ্যমগুলোর প্রচুর ব্যবহার হচ্ছে।

মনের ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বাংলাদেশেও সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চেতনার বিকাশে ফেসবুক, টুইটার, গুগল প্লাস, স্কাইপসহ নানান ধরণের ব্লগের ভূমিকা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের প্রামাণ্য চেতনার গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার হিসেবে গড়ে উঠেছে এ মাধ্যমগুলো। বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্ম বর্তমানে দেশকে নিয়ে তাদের উচ্ছ্বাস কিংবা হতাশা প্রকাশের ক্ষেত্রে বেছে নিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকেই।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমূল বদলে যাওয়া নতুন প্রজন্মকে নিয়ে বিভিন্ন সময়েই হতাশা প্রকাশ করতে দেখা যেত অনেককেই। দেশ নিয়ে যারা ভাবেন, দেশের ইতিহাস যারা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাঁদের অনেকেই তরুণ সমাজের অধিকাংশ সময় অনলাইনে ডুবে থাকার বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেননি। এভাবে করে এই প্রজন্ম শেকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে কিনা এটিই ছিল মূল ভাবনা।

কিন্তু বর্তমানে বিশিষ্টজনদের একটি বড় অংশ তরুণদের নিয়েই আশাবাদী হতে চাচ্ছেন। তার প্রমাণ মেলে ড. জাফর ইকবালের এই কথাগুলো থেকে। প্রজন্ম চত্বরে উপস্থিত হয়ে তিনি বলেছিলেন-“আজ আমি এসেছি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবার জন্য! আমি পত্রিকায় লিখেছি- যে এই নতুন জেনারেশন খালি ফেসবুকে লাইক দেয়, এরা আর কিছু করে না। আমি লিখেছি- এরা খালি ব্লগ করে, এরা আর কিছু করে না- এরা রাস্তায় নামে না। তোমরা আমাকে ভুল প্রমাণিত করেছো।” তরুণদের যে জাগরণ জাফর ইকবাল স্যারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছে, তাঁকে মুগ্ধ করেছে তার সূচনাও কিন্তু ফেসবুককে কেন্দ্র করেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো তরুণপ্রজন্মকে তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভুলিয়ে দেয়ার বদলে তা সম্পর্কে সচেতনতায় ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। মুক্তবুদ্ধি চর্চায় আগ্রহ বাড়ছে তাদের।

সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যাপক বিষ্ফোরণ ঘটে কাদের মোল্লার বিচারের প্রথম রায়কে কেন্দ্র করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আগে থেকেই সোচ্চার ছিল দেশের মানুষ। ২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে গোটা দেশের সচেতন জনগন। মুহূর্তেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক, টুইটার আর স্কাইপেতে।

শাহবাগের যে প্রজন্মচত্বর একসাথে লাখো মানুষকে জড়ো করে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে ফেসবুকে আহ্বানের মাধ্যমেই আন্দলনের উদ্যোক্তাগণ এর সূচনা করেন। শুরুতে গুটিকয়েক তরুণ রায়ের বিরুদ্ধে শাহবাগে অবস্থান নিলেও আন্দোলনের এ বিশালতা লাভের পেছনে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ব্যাপক ভূমিকা।

এ আন্দোলনের ফলেই সংবিধান সংশোধন হয়ে রায়ের বিপক্ষে আপীলের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং অনেক নাটকীয়তার জন্ম দিয়ে অবশেষে কাদের মোল্লার ফাঁসির মাধ্যমে আন্দোলনের বিজয় সূচিত হয়। প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনে মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে একসময় ভাঁটা পড়লেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ঠিকই সক্রিয় ছিলেন আন্দোলনের সমর্থকগণ।

অনলাইনে সক্রিয় ছিল বিরুদ্ধ শক্তিও, চলতে থাকে তাদের নানামুখী অপপ্রচার। তথ্য-প্রমাণ ও ধারালো যুক্তির মাধ্যমে সেই অপপ্রচারের জবাবও দেয়া হয়। মোট কথা কাদের মোল্লার বিচারের রায়ের  ব্যাপারে জনগণকে সংগঠিত করার গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিরাট ভূমিকা আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর। সেই সাথে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আটক ও অভিযুক্ত সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা যেন অব্যাহত থাকে সে ব্যাপারেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে প্রচুর প্রচারণা ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সাথে সম্পর্কিত দিনগুলোতে লাল-সবুজে সেজে উঠছে সবার প্রোফাইল পেজটি। বিনিময় হচ্ছে দেশমাতৃকা সম্পর্কে নানান অনুভূতির কথা। তবে অনুভূতি প্রকাশের বিষয়টি এখন আর নির্দিষ্ট দিনের গণ্ডিতে আটকে নেই। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম সম্পর্কে নিজেদের মনের জমাট বাঁধা কথাগুলোকে এখন যখন ইচ্ছে সহজেই ছড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপ ইত্যাদি ব্যবহার করে।

অনেকেই দেশকে নিয়ে তাঁদের ভাবনাকে সামষ্টিক রূপ দেয়ার আশায় তৈরি করছেন নানা গঠনমূলক পেজ। দেশের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে এমন অনেক সংস্থাও তথ্য প্রযুক্তির এই বিশেষ দিকটিকে ব্যবহার করছেন প্রয়োজন অনুযায়ী।

তবে প্রযুক্তির এই শুভ দিকের পাশাপাশি এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করেই আবার দেশের উন্নয়ন পরিপন্থী নানা কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে, এগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে নানা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ তৈরিতে এবং সহিংসতার উস্কানি প্রদানের ক্ষেত্রে। এই বিষয়গুলিতে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের নজরদারির পাশাপাশি দেশের স্বার্থেই  সচেতন থাকতে হবে সবাইকে।