ঢাকা বিনোদন

বিজয় দিবসে বিশেষ রচনা

 শানজানা জামান, ঢাকা, ১৬ ডিসেম্বর : আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের চারদশক পেরিয়েছে। দেশ আর্থ-সামাজিক ভাবে এগিয়েছে অনেক। আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় যাওয়ার জন্য সংগ্রাম করছি।

রাজনৈতিক ভাবেও গণতান্ত্রিক দেশের কাতারে যাওয়ার জন্য একধরণের পরিবর্তন চলছে প্রতিনিয়ত। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে আমাদের সংস্কৃতিতে বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রভাব দেখা যায় সবচাইতে বেশি।

সেদিক থেকে চলচ্চিত্র এখনো অনেক পিছিয়ে। বোদ্ধারা এমনটাই বলেন। তারা আরো বলেন, এখনো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যথাযথ সিনেমা তৈরি হয়নি। তবে ‘ওরা ১১জন’ থেকে ‘গেরিলা’ পর্যন্ত যেকটি ছবি তৈরি হয়েছে সেগুলোতে আমাদের মুক্তির সংগ্রামের নয়মাসের একটি ছবি দেখতে পাই। আগামীতে হয়তো আরো অনেক চলচ্চিত্রই হবে মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে। তবে এই চারদশকে যেকটি সিনেমা এদেশে মুক্তি পেয়েছে সেগুলোকেও খাটো দেখার কোন উপায় নেই।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। ১৯৭২ সালের মার্চ মাস। আল মাসুদের কাহিনী অবলম্বনে ‘ওরা ১১ জন’ শিরোনামে ছবিটির কাজ শুরু করেন। ১৯৭২ সালেই এ ছবিটি মুক্তি পায়। ছবিটির প্রযোজনা করেন মাসুদ পারভেজ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণটির কিছু অংশ এই ছবিটিতে দেখানো হয়েছে। এ ছবিটিতে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা অভিনয় করেছেন। প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছেন খসরু, রাজ্জাক, শাবানা, মুরাদ, হাসান ইমামসহ আরও অনেকেই। ছবিটির শুটিং হয়েছে রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাসে। এই ছবিতে ব্যাবহৃত সকল অস্ত্র ও গোলা-বারুদ মুক্তিযুদ্ধের সময়ের। এ ছবিতে নকল কোন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। শুটিং হয়েছে রণক্ষেত্র বাছাই করে।

তৎকালিন ডেপুটি স্পিকার কর্ণেল (অব.) শওকত আলী সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সহযোগীতা করেছিলেন। একই বছর সুভাষ দত্ত নির্মাণ করেন, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। ববিতা অভিনীত সর্বপ্রথম পুরস্কার প্রাপ্ত ছবি এটি। শুটিং হয়েছে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে। ছবিতে সামরিক যানবাহন থেকে শুরু করে হেলিকপ্টার পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে। কুমিল্লা সেনাসিবাসে একটি পরিত্যক্ত ক্যাম্প খুঁজে পেয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ ক্যাম্পে নারীদের আটকে রেখে নির্যাতন করা হত। সেই ক্যাম্প থেকে এ ছবির শুটিংয়ের শুরু করেছিলেন প্রয়াত পরিচালক সুভাষ দত্ত ।

১৯৭২ সালে আরো নির্মিত চলচ্চিত্র হল আনন্দ পরিচালিত ‘বাঘা বাঙালী’, ফকরুল আলম পরিচালিত ‘জয় বাংলা’। ১৯৭৩ সালে পরিচালক আলমগীর কবির মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মাণ করেন ‘ধীরে বহে  মেঘনা’ চলচ্চিত্রটি । এতে অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ, জয়শ্রী কবির, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। এটি আলমগীর কবিরের প্রথম চলচ্চিত্র।

একই বছরে খান আতাউর রহমান পরিচালিত ছবি ‘আবার তোরা মানুষ হ’। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তরুণ প্রজন্ম কি করছে তা নিয়ে তৈরি হয় ছবিটি। ১৯৭৩ সালে নির্মিত অন্যান্য ছবিগুলো হল, আলমগীর কুমকুম পরিচালিত ‘আমার জন্মভূমি’, চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘সংগ্রাম’।

১৯৭৪ সালে নারয়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘আলোর মিছিল’। রাজ্জাক-সুজাতা অভিনীত পুরস্কার প্রাপ্ত ছবি এটি। এ ছবিতে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেন ববিতা। ’৭৪ এ আরো নির্মিত ছবির মধ্যে রয়েছে, মোহাম্মদ আলী পরিচালিত ‘বাংলার ২৪ বছর’, আনন্দ পরিচালিত ‘কার হাসি কে হাসে’। সত্তর দশকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মোট ১৩টি ছবিই নির্মাণ হয়।

তবে লক্ষ্যনীয় বিষয়, সত্তর দশকে এতগুলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মাণ হলেও আশির দশকে নির্মাণ হয়েছে মাত্র ৩টি ছবি। তাও আবার শুধু ১৯৮১ সালে। ছবিগুলো হলো, এজে মিন্টু পরিচালিত ‘বাধন হারা’, শহীদুল হক খান পরিচালিত ‘কলমীলতা’ এবং মতিন রহমান পরিচালিত ‘চিৎকার’। অবশ্য ৯০’এর দশকে এসে মুক্তিযুদ্ধের ছবির সংখ্যা আবার বৃদ্ধি পেয়ে মোট ৭-এ দাড়ায়।

১৯৯৩ সালে লেখক শাহরিয়ার কবিরের লেখা এবং নাসির উদ্দীন ইউসুফ-এর পরিচালনায় নির্মিত ছবি ‘একাত্তরের যীশু’। ছবির প্রধান চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন পীযূষ বন্দোপাধ্যায়, হুমায়ূন ফরীদি, জহির উদ্দিন পিয়াল, আবুল খায়ের, আনওয়ার ফারুক, কামাল বায়েজীদ ও শহীদুজ্জামান সেলিম। এছাড়া বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইব্রাহীম বিদুৎ, শতদল বড়ুয়া বিলু, সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল, ফারুক আহমেদ, ইউসুফ খসরু, দেলোয়ার হোসেনসহ আরো অনেকেই। ১৯৯৩ সালে হারুন উর রশীদ পরিচালিত ‘মেঘের অনেক রঙ’। ১৯৯৪ সালে তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত ‘নদীর নাম মধুমতি’।

১৯৯৫ সালে কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রথম নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমনি’। এ ছবিতে নায়ক হিসেবে মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে অভিনয় করেন আসাদুজ্জামান নূর। ছবির নায়িকা বিপাশা হায়াত। এ ছবিতে আবুল হায়াতই তার বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি পরিবারের বিভিন্ন ঘটনা নিয়েই এ ছবি নির্মিত। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। ১৯৯৫ সালে তারেক মাসুদ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘মুক্তির গান’। সিনেমাটি প্রযোজনা করেন ক্যাথরিন মাসুদ।

একই বছর তৌকির আহমেদ পরিচালিত ছবি ‘জয়যাত্রা’ মুক্তি পায়। এ ছবিতে নায়কের ভূমিকায় আজিজুল হাকিম এবং নায়িকা বিপাশা হায়াত। পাকিস্থানি বাহিনীর পরিত্যাক্ত গাড়িগুলো ব্যবহার করে ছবির শুটিংয়ে। বগুড়া সেনানিবাস থেকে এসব গাড়ি সংগ্রহ করা হয়। সেনাবাহিনীসহ সকল সামরিক বাহিনী এই চলচ্চিত্র নির্মাণে সহযোগীতা করেছেন। সেলিনা হোসেন এর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবি ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে। একই বছরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পায় ছবিটি। তারেক মাসুদ পরিচালিত ও ক্যাথরিন মাসুদ প্রযোজিত ১৯৯৯ সালে নির্মিত ছবি ‘মুক্তির কথা’।

১৯৯৮ সালে নির্মিত হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবন মেঘের দিন’। ২০০৪ সালে হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে আরেকটি বিশেষ ছবি ‘শ্যামল ছায়া’। ছবিটির শুটিং করা হয়েছিল শীতলক্ষ্যা নদীতে। ২০০৪ সালে চাষী নজরুল ইসলামের ‘মেঘের পর মেঘ’ ২০০৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তি পায় চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ছবি ‘ধ্রুবতারা’। এ ছবির বিশেষ ভূমিকায় অভিনয় করেন মৌসুমী। মৌসুমী অভিনীত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম ছবি। বিক্রমপুরের সমেশপুরে এ ছবির শুটিং হয়।

২০১১ সালে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু নির্মাণ করে বিশেষ চলচ্চিত্র ‘গেরিলা’। এ ছবিতে রয়েছে ট্রেনের ব্যবহার। মজার ব্যাপার, পাকিস্তান আমলের ট্রেন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক  খোঁজ করার পর পরিচালক পার্বতীপুরে পরিত্যক্ত অবস্থায় কতগুলো বগি খুঁজে পান। কিন্তু বগিগুলোর ফ্লোর নেই, আসন নেই, জানালা দরজা নেই। তবুও, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ৬টি বগি নিজ খরচে কাজ করিয়ে পরিচালক ছবির কাজ করেছিলেন। ট্রেনটিতে ব্যবহার হয় ১৯৫৬ সালের স্টিম ইঞ্জিন। এছাড়া রুবাইয়াত এর ‘মেহেরজান’।

শাহজাহান চৌধুরীর ‘আত্মদান’। ছবিতে অভিনয় করেছেন নিরব ও নিপুন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষুকের গল্প নিয়ে খালিদ মাহমুদ মিঠু নির্মাণ করে ‘গহীনে শব্দ’। ছবিতে মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাসুম আজিজ। সোহেল আরমান পরিচালিত ‘এই তো প্রেম’। ইলাজার ইসলাম পরিচালিত ‘দীপ নেভার আগে’। এ ছবিটি জাহানারা ইমামের উপন্যাস ‘একাত্তরের দিনগুলি’ অবলম্বনে নির্মিত।

মুক্তিযুদ্ধের নির্মিত চলচ্চিত্র ‘কারিগর’। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত স্বাধীনতা দিবসকে উদ্দেশ্য করে, গত ২৩ মার্চ বলাকা সিনেওয়ার্ল্ডে মুক্তি পেয়েছে এ ছবিটি। এ ছবিতে অভিনয় করেছেন রোকেয়া প্রাচী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, সুষমা সরকার, রাণী সরকার, হিমা মৃধা, গোলাম মোস্তফা, মাসুদ আলম বাবু, শামীম খান প্রমুখ। ছবিটির কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা ও পরিচালনা করেছেন আনোয়ার শাহাদাত। এটি ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ১৩ তম চলচ্চিত্র।