জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর রাজনীতি

তারানকোর তৎপরতায় সুখবর নেই!

 নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, ১০ ডিসেম্বর:  বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে যুতসই সমাধানের পথ বের করার চেষ্টা চালাচ্ছেন জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। সফরে এসে তিন দিনে ২০টিরও বেশি বৈঠকে টানা আলোচনা করেছেন তিনি। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে কিছুটা ছাড় দিয়ে সংলাপে বসার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের আওতার মধ্যে থেকে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা খর্ব করে সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন তিনি।

বরাবরের মতো আওয়ামী লীগ আলোচনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে তারানকোর উপস্থিতিতে এই আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে তারা শেখ হাসিনাকেই নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী রাখার অবস্থানে অনড় আছে।

দুই দলের শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, তারানকো সংবিধানের আওতার মধ্যেই সংকট নিরসনে দুই দলকে আলোচনায় বসার পরামর্শ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি উভয় পক্ষে আলোচনা শুরুর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা কমিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনকে কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনার কথা বলেন।

গতকাল বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা গওহর রিজভীর গুলশানের বাসভবনে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গেও দ্বিতীয় দফা বৈঠক করেন তারানকো। ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে আওয়ামী লীগের নেতারা ২৪ জানুয়ারির মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে মত দেন। তাঁরা সংসদ ভেঙে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের বিপক্ষে তাঁদের যুক্তি তুলে ধরেন।

এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বরাবরই শেখ হাসিনাকে সরকারপ্রধান না রাখার ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে তারানকোকে।

সূত্র জানায়, তারানকো বিএনপিকে জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে সমাধান করার কোনো পন্থা থাকলে তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে বলে আওয়ামী লীগ জানিয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তারানকো নির্বাচনের সময় জাতিসংঘের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও ‘স্বল্প-ক্ষমতার’ প্রধানমন্ত্রীর কথা বলেন।

নির্বাচনের সময় শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকলে সমঝোতা সম্ভব নয়। সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচনের জন্য শেখ হাসিনাকে সরে যেতে হবে বলে তারানকোকে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া।

বিএনপির সিনিয়র পর্যায়ের দুজন নেতা বলেন, তারানকোর সফরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে একথা এখনই বলা যাবে না। তাঁরা মনে করছেন, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, তারানকোর এই সফরে সমাধান আসবে না। তবে বিএনপি তারানকোকে আশ্বস্ত করেছে, তারা আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে।

এদিকে তারানকোর সঙ্গে বৈঠকের পর রাতে খালেদা জিয়া দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি নেতাদের রাজপথের আন্দোলন জোরদার করার নির্দেশ দেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। তিনি ১৫ ডিসেম্বর ঢাকায় সমাবেশে সব নেতাকে উপস্থিত থাকতে বলেন।

বৈঠকে উপস্থিত স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেছেন, দলীয় প্রধানের কথা শুনে মনে হয়নি, তারানকো-তৎপরতা কোনো সমাধান দিতে পারবে।

জামায়াতের সাথে বৈঠকে তারানকোর কাছে আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দলটির নেতৃবৃন্দ। গতকাল সকালে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল রাজধানীর একটি হোটেলে তারানকোর সঙ্গে বৈঠক করে।

বৈঠক শেষে আবদুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের জানান, সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়েও কথা হয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে আবদুর রাজ্জাক বলেন, সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি না হলে সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে না।

এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে রেখে কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়। এর বাইরে আলোচনা হলে তারা অংশ নেবে। আলোচনায় যুক্ত দুই দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।

তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তারানকো বলেন, ‘চলমান অচলাবস্থার শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি। রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছা থাকলে, তাঁদের মাঝে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকলে এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনায় বসার আগ্রহ থাকলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সংক্ষিপ্ত আলোচনায় নির্বাচনের তফসিল নিয়ে সংশ্লিষ্ট নানা পক্ষের মতগুলো সিইসির কাছে তুলে ধরেন তারানকো। এ সময় সিইসি জানান, এসব মতের সঙ্গে তিনিও একমত। একমাত্র প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মাঝে সমঝোতা হলেই তফসিল পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু সমঝোতা না হলে আগেভাগেই আইনের বাইরে গিয়ে ইসি তফসিলে কোনো পরিবর্তন আনার পক্ষপাতী নয়।

সিইসি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এখনো চলছে। দেখা যাক কী হয়। এ নিয়ে এখন আর কোনো মন্তব্য করব না।’

এই অবস্থায়ও চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান নিয়ে আশাবাদী তারানকো। নির্বাচন কমিশনে সিইসির সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের কাছে গতকাল দুপুরে মুখ খোলেন তিনি। তবে আশাবাদের কথা জানালেও সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি তারানকো।