অপরাধ জাতীয় প্রধান খবর রাজনীতি

কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা

ঢাকা: জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ এ মৃত্যুপরোয়ানার আদেশটি কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

এর আগে রোববার দুপুরে আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে দেয়া সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে রায় পুনর্বিবেচনার আপিলের বিষয়ে কাদের মোল্লার আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘যেদিন সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করা হয়েছে, সেদিনেই পূর্ণাঙ্গ রায়ের সার্টিফাইড কপি চেয়ে আপিল বিভাগে একটি আবেদন করা হয়েছে। আমরা সার্টিফাইড কপি হাতে পাওয়ার পর রিভিউ পিটিশন দায়ের করব। এক্ষেত্রে সংবিধান অনুযায়ী ৩০ দিন সময় দেয়া থাকলেও যতক্ষণ পর্যন্ত সময় লাগবে আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত সময় নেব। ৩০ দিনের আগে সাজা কার্যকর করার কোনো অধিকার কারা কর্তৃপক্ষের নেই।’

তিনি বলেন, ‘জেল কোড অনুযায়ী ১৫ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার সুযোগ রয়েছে।’

কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ ও সরকার বলছে, ‘জেল কোড অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির রায়ের সার্টিফাইড কপি হাতে পাওয়ার পর সাজা কার্যকরের ক্ষেত্রে ২১ দিনের আগে নয়, আবার ২৮ দিনের পরে নয়’ এমন যে বিধান রয়েছে তা কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের দেয়া সাজা কার্যকর করবে সরকার। তাই এক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।’

এর আগে ৫ ডিসেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দণ্ডাদেশ দিয়ে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের ঘোষিত ৭৯০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এরপরই শাহবাগ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আইন সংশোধন করে  এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিল গ্রহণ করেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ এবং কাদের মোল্লার করা আপিল খারিজ করে দেন।

দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুপিমকোর্ট কাদের মোল্লাকে ফাঁসির আদেশ দেন।

এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের প্রথম রায়।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে ৬ নম্বর অভিযোগে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। আপিল বিভাগ এ অভিযোগে যাবজ্জীবনের পরিবর্তে তার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এরআগে ৪ নম্বর অভিযোগে কাদের মোল্লা খালাস দেয়া হয়। নতুন এ রায়ে ওই অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়।

ট্রাইব্যুনাল ১, ২, ৩ ও ৫ নম্বর অভিযোগে যে রায় দিয়েছিলেন তা বহাল আছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে দু’টিতে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তিনটিতে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড দেন। অন্য একটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়।

কিন্তু রায় ঘোষণার পরই কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ গঠিত হয়। দেশব্যাপী এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে বাদী-বিবাদী উভয়পক্ষে আপিলের সমান সুযোগ রেখে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (সংশোধন) বিল-২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। আগে কোনো অভিযোগে আসামির সাজা হলে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ ছিল না।

এরপর গত ৩ মার্চ কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। পরদিন ট্রাইব্যুনালের দেয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করে অব্যাহতি চেয়ে আপিল করেন কাদের মোল্লা। এর পরিপ্রেক্ষিতে আপিলের শুনানি শুরু হয়।

কাদের মোল্লার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানিকালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন ওঠায় ২০ জুন আপিল বিভাগ এ বিষয়ে মতামত দিতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে জ্যেষ্ঠ সাত আইনজীবীর নাম ঘোষণা করেন।

তাদের মধ্যে পাঁচজন এ আপিলআইন কাদের মোল্লার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্যের পক্ষে এবং দুজন এর বিপক্ষে মত দেন।

এরপর গত ২৩ জুলাই আবদুল কাদের মোল্লার সাজার পক্ষে-বিপক্ষে করা আপিল আবেদনের ওপর রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি শেষ হয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাম মোস্তফা নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার অভিযোগে ২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর কাদের মোল্লাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়। এ মামলাটি করেছিলেন কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী মোজাফফর আহমেদ খান। ২০০৮ সালে পল্লবী থানায় আরও একটি মামলা হয় কাদের মোল্লাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এ মামলায় ২০১০ সালের ১৩ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে গত বছরের ১ নভেম্বর জমা দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনে হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়। ২৮ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।