আন্তর্জাতিক জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর

নেলসন ম্যান্ডেলা স্মরণে মাদিবা

ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকা, ৬ ডিসেম্বর: বিশ্বটাকে বর্ণবাদের খোলসমুক্ত করে অবশেষে বিদায় নিলেন মানবতাবাদী নেলসন ম্যান্ডেলা। আফ্রিকায় যিনি ‘মাদিবা’ নামে পরিচিত। মাদিবা মানে ‘পিতা’। আফ্রিকার পিতার মৃত্যু হয়েছে। শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে গোটা আফ্রিকা, মানবতাবাদী বিশ্ব।
গতকাল বৃহস্পতিবার দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা যখন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের পর্দায় মাদিবার মুত্যুর খবর নিয়ে হাজির হলেন, তখন তিনিও কাঁদছিলেন। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শোকের ছায়ায় বিমূঢ় হয়ে যায় কৃষ্ণাঙ্গ দুনিয়া।

জীবনে নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে মানবতাবাদী বিশ্বের মুকুটমণি হয়েছেন ম্যান্ডেলা। সংগ্রামের শতবর্ষী এক মহাকাব্যের জন্ম দিয়ে মহাকালের পথে পাড়ি দিলেন তিনি।
তার মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং বিশ্বনেতারা।

মাদিবার জীবনের কিছু স্মরণীয় ঘটনা

১. ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সকেইয়ের এনভেসোতে জন্মগ্রহণ করেন ম্যান্ডেলা।

২. জন্মের পর তার নাম রাখা হয় রোহিলালা দালিবহুংগা ম্যান্ডেলা। আঞ্চলিক ভাষায় রোহিলালা শব্দের অর্থ ‘গাছের ডাল টানা’। তবে কথ্য ভাষায় এর অর্থ ‘গোলমাল সৃষ্টিকারী’। তিনি যখন মিশনারি বিদ্যালয়ে পড়তেন, তখন তার একজন শিক্ষক তার নাম রেখেছিলেন ‘নেলসন’। উল্লেখ্য, তার পরিবার থেকে তিনিই প্রথম স্কুলে যান।

৩. ছাত্রবিক্ষোভে যোগ দেওয়ার অভিযোগে ম্যান্ডেলাকে ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। অবশ্য উইটস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেন তিনি।

৪. টেম্বু গোষ্ঠীর নেতা জোংগিনতাবা দালিন্দেবো তরুণ ম্যান্ডেলার বিয়ের আয়োজনের চেষ্টা করেছিলেন। এতে ম্যান্ডেলা ইস্টার্ন কেপ  ছেড়ে পালিয়ে জোহানেসবার্গে চলে যান। সেখানে তিনি একটি খনিতে নৈশপ্রহরীর চাকরি নেন।

৫. ম্যান্ডেলা একসময় আলেক্সান্দ্রার শহরতলিতে থাকতেন। তবে পরে সোয়েটোর অর্লান্ডোতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওয়াল্টার সিসুলু ও তার মায়ের সঙ্গে বাসায় ওঠেন।

৬. ম্যান্ডেলার প্রথম স্ত্রী ইভলিন মেজ ছিলেন একজন নার্স ও সিসুলুর আত্মীয়। এই দম্পতির চার সন্তান। ১৯৫৮ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

৭. আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) সশস্ত্র শাখার প্রধান ছিলেন ম্যান্ডেলা। এ ছাড়া তিনি বন্ধু অলিভার ট্যাম্বোর সঙ্গে মিলে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মালিকানাধীন আইনি সহায়তাকেন্দ্র গড়ে তোলেন।

৮. সশস্ত্র সংগ্রামে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে ম্যান্ডেলা ১৯৬২ সালে দেশ ছাড়েন। মরক্কো ও ইথিওপিয়ায় গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন তিনি।

৯. ম্যান্ডেলাকে শত শত পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কানাডার সম্মানজনক নাগরিকত্ব, ব্রিটিশ লেবার পার্টি ও সে দেশের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাবের সম্মানজনক সদস্য। এ ছাড়া একটি পারমাণবিক কণার নাম রাখা হয়েছে ‘ম্যান্ডেলা পার্টিকল’। একটি প্রাগৈতিহাসিক কাঠঠোকরা ও একটি অর্কিডের নামকরণও হয়েছে ম্যান্ডেলার নামে।

১০. কারাগারে থাকাকালীন বর্ণবাদী সরকার ম্যান্ডেলাকে ছয়বার মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি রাজি হননি। একবার তিনি বিবৃতি দেন, ‘জনগণের সংগঠন (এএনসি) যদি নিষিদ্ধ থাকে, তাহলে আমাকে কোন ধরনের মুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে?’

১১. ম্যান্ডেলা ১৯৭০-এর দশকে একটি স্মৃতিকথা লেখেন। সেটির পাণ্ডুলিপি পলিথিনে মুড়িয়ে কারাগারের বাগানে পুঁতে রাখা হয়। কর্তৃপক্ষ বাগানে একটি দেয়াল তুলতে গেলে ব্যাপারটি ধরা পড়ে যায়। শাস্তি হিসেবে ম্যান্ডেলার পড়াশোনার সব সুযোগ বন্ধ করে  দেওয়া হয়।

১২. দ্বিতীয় স্ত্রী উইনি মাদিকিজেলা ম্যান্ডেলার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি আমিনা কাশালিয়া নামের এক বান্ধবীকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু আমিনা তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ৮০তম জন্মদিনে ম্যান্ডেলা বিয়ে করেন গ্রাসা ম্যাশেলকে।

১৩. বর্ণবাদী সরকার এএনসিকে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও এএনসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দেখতে থাকে। মাত্র পাঁচ বছর আগে, অর্থাৎ ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ম্যান্ডেলা ও তার সংগঠনকে সন্ত্রাসীর তালিকা থেকে বাদ দেয়।

১৪. ম্যান্ডেলার জন্মদিন ১৮ জুলাইকে ‘নেলসন ম্যান্ডেলা ইন্টারন্যাশনাল ডে’ হিসেবে ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ।

১৫. কারাগারে ম্যান্ডেলাকে মাত্র দুই মিটার চওড়া ও আড়াই মিটার লম্বা একটি প্রকোষ্ঠে রাখা হয়। শোয়ার ব্যবস্থা ছিল মেঝেতে। আর  মলমূত্র ত্যাগের জন্য শুধু ছিল একটি বালতি। প্রথম দিকে প্রতি ছয় মাসে একজনমাত্র দর্শনার্থীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও একটি চিঠি লিখতে পারতেন ম্যান্ডেলা।

তথ্যসূত্র : বিসিবি, গার্ডিয়ান, ডেইলি মেইল।