জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর রাজনীতি সারাদেশ

আ.লীগ এখন বিদ্রোহের আগুনে পুড়ছে

আছাদুজ্জামান,হটনিউজ২৪বিডি.কম, ঢাকা:  আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদ্রোহের আগুনে পুড়ে ছারখার সরকারি দল আওয়ামী লীগ। একদিকে বিএনপির নেতৃত্বে বিরোধীরা নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনের পর আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আর তা মোকাবেলায় অনেকটাই হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারের। সেই সঙ্গে ‘শত্রু-মিত্র’ হিসেবে পরিচিত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ‘আছি-নাই খেলা’ তো আছেই। অন্যদিকে নিজেদের ঘরের আগুনও কম পোড়াচ্ছে না মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া দলটিকে। ইতোমধ্যে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী অর্ধশত নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে। আর এতে অনেকটাই হতাশা বিরাজ করছে দলটির তৃণমূল থেকে হাইকমান্ড পর্যন্ত। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বিভাগ, মহানগর, জেলা, উপজেলা ও পৌরসভার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে মনোনয়ন দেবেন, এমনটাই কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত ওই সিদ্ধান্ত রাখতে পারেননি দলের সভানেত্রী। তৃণমূলের সঙ্গে বৈঠক করেও কিছু প্রভাবশালী নেতার কারণে তিনি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মনোনয়ন দিতে পারেননি।

দলের অনেক নেতার দাবি, আওয়ামী লীগ সভাপতি ওইসব প্রভাবশালীদের ফাঁদে পা রাখায় অনেক যোগ্য নেতা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে মনোনীত অনেকেরই এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তাছাড়া কারও কারও বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও টাকা লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে। তাই দলীয়ভাবে মনোনয়ন না পেয়ে খোদ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই এখন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। এদের মধ্যে অর্ধশতাধিক নেতাই নিজেদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এতে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ও খোদ সভাপতি শেখ হাসিনার মধ্যেই হতাশার সঞ্চার হয়েছে বলে জানা গেছে।

দলের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এখন বিদ্রোহীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়ায় প্রভাবশালী নেতাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। কারণ যদি কোনো কারণে বিদ্রোহী প্রার্থী জয় লাভ করে সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার আস্থা হারাতে পারেন তারা। এরমধ্যে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সুপারিশেই কয়েকজনের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে বলে ওই সূত্রটি দাবি করেছে।

এদিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ার তালিকায় রয়েছেন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বর্তমান সংসদ সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান। তবে নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে নির্বাচনে লড়ার অভিজ্ঞতা আওয়ামী লীগের সুখকর নয়। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে ছোট বড় বেশিরভাগ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে মনোনীত বা সমর্থিত প্রার্থীর পরাজয় হয়েছে। তাই বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথাও ভাবছে আওয়ামী লীগ। তবে ব্যবস্থা নিলে তা আবার হিতে বিপরীতও হতে পারে বলে অনেক নেতারা ধারণা করছেন।

বর্তমান সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের শূন্য আসনে উপ-নির্বাচন, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন বা সমর্থন না পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রার্থী হন দলের অনেক বিদ্রোহী নেতা। তাদের কাছে আওয়ামী লীগের অনেক প্রার্থীকে পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে।

এবারও তৃণমূল নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে মনোনয়ন দেয়া হয়নি বলে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা আরো বাড়বে বলে অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিতরা। তাদের দাবি, মনোনয়ন প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের মতামতের কোন মূল্যায়ন করা হয়নি। এখানে দলের অন্যান্য নেতাদের মতামতের মূল্যায়ন করা হয়েছে। টাকার মূল্যায়ন করা হয়েছে। অনেক স্থানে বিতর্কিত ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। ফলে দলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিরোধী দলের রাজপথের আন্দোলনে না পাওয়াসহ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এমন দাবি করে নরসিংদী-৫ আসন থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা বাংলামেইলকে বলেন, ‘তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। যদি দেয়া হতো তাহলে আমিই মনোনয়ন পেতাম। এ আসনে বর্তমান শ্রমমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। যার জনসমর্থন আমার থেকে অনেক কম। অনেক আসনেই এমন হয়েছে। আর এ কারণে নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।’ কিশোরগঞ্জ-৫ আসন (তার পাশের আসন), যশোরের বেশ কয়েকটিসহ এ সংখ্যা অর্ধশতাধিক হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে দলের মনোনয়ন না পেয়ে দল থেকে পদত্যাগ করছেন মনোনয়ন বঞ্চিতরা। ঘোষণা দিচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদন্দ্বিতা করার। ইতোমধ্যে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেছেন কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ড. মিজানুল হক। একইসাথে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রার্থী ঘোষণার পরদিনই। এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী নাসিরুল ইসলাম। মিজানুল হক এই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এলাকাবাসীর দাবির প্রতি সম্মান রেখে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান।

নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী। দলীয় মনোনয়ন তিনিই পেয়েছেন। তবে এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য কেএম শফিউল্লাহ বীর উত্তম।

মুন্সীগঞ্জ-২ (টঙ্গিবাড়ী ও লৌহজং) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন। তবে এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাবেক এসপি মাহবুব উদ্দিন আহমেদ।

পটুয়াখালী-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি। তবে দলের মনোনয়ন পাবেন না অনুমান করে দলীয় মনোনয়নপত্রই তোলেননি নানা কারণে আলোচিত এই সংসদ সদস্য। এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন।

ঢাকা-৪ আসনে বর্তমান এমপি সানজিদা খানম। এই আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আওলাদ হোসেন। তবে দলীয় মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হওয়ায় এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন আওলাদ হোসেন।

ঢাকা-৬ আসনে বর্তমান এমপি মিজানুর রহমান খান। দলীয় মনোনয়ন তাকেই দেয়া হয়েছে। তবে এই আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা সাইদুর রহমান (সহিদ কমিশনার)। দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ায় সাইদুর রহমান এই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে লড়বেন বলে জানিয়েছেন।

ফেনী-১, ফেনী-২ ও ফেনী-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন বহুল আলোচিত, বিতর্কিত ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল হাজারী। তার পক্ষে জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে এ মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়। এই তিন আসনে আওয়ামী লীগের টিকিট পেয়েছেন যথাক্রমে খায়রুল বশর মজুমদার, নিজাম উদ্দিন হাজারী ও মো. আবুল বাশার।

ফরিদপুর-৪ আসনে নূর-ই-আলম চৌধুরী (নিক্সন চৌধুরী) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ। বর্তমানে এ আসনে সংসদ সদস্য কাজী জাফর উল্লাহর স্ত্রী স্থপতি নিলুফার জাফরউল্লাহ।

সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ব্যবসায়ী আবদুল মজিদ মণ্ডল। তবে এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেত্রী ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সোনিয়া সবুর আকন্দ।

পাবনা-১ (বেড়া একাংশ-সাঁথিয়া) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাবেক প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী আবু সাঈদ। এই আসনে আওয়মী লীগের প্রার্থী স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু।

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের এমপি সোলায়মান জোয়ার্দার দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে গত পাঁচ বছরে সোলায়মানের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করে এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ শামসুল আবেদিন।

চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন এমপি আলী আজগর টগর। আবারো তাকে মনোনয়ন দেয়ায় পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও দর্শনা পৌরসভার সাবেক মেয়র মতিয়ার রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য খান টিপু সুলতান। তার বিরুদ্ধে জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ও মনিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান স্বপন ভট্টাচার্য এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন।

এদিকে আওয়ামী লীগের ঊর্ধ্বতন নেতাদের দাবি, এলাকায় অবস্থান ও বয়সের দিকে লক্ষ্য রেখে এ প্রার্থী তালিকা করা হয়েছে। তারা বলেন, ‘দলের সংসদীয় বোর্ডে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে তৃণমূল নেতাদের মতামত ও এলাকায় প্রার্থীদের অবস্থান বিবেচনা করা হয়েছে।’

একজন করে প্রার্থী ঘোষণা করলেও কোনো কোনো এলাকায় একাধিক যোগ্য প্রার্থী রয়েছে বলে জানান হাইকমান্ডের নেতারা। আর এসব এলাকায়ই বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়ানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেন দলের কেউ কেউ। আবার বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলের জন্য ক্ষতিকারক বলেও মনে করেন তারা। তারা আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অনেক বড় দল। একটি এলাকায় একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকতেই পারে। এদের মধ্য থেকে সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। আর কেন্দ্র থেকে ঘোষিত সিদ্ধান্তই সবাইকে মেনে নিতে হবে।’ যারা মেনে নেবেন না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে দলের হাইকমান্ড।

বিদ্রোহী প্রার্থী দলের জন্য ক্ষতিকারক বলে স্বীকার করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বাংলামেইলকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বুঝেশুনেই দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন। তা সবাইকে মেনে নেয়া উচিৎ।’

দলের অপর এক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন বাংলামেইলকে বলেন, ‘সব নির্বাচনেই এমন হয়। তবে কেউ যেন দলের ক্ষতির কারণ না হয় সেটাই আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দেখবেন। এ জন্য সবাইকে বোঝানো হবে।’ নির্বাচনের আগেই তারা তাদের অবস্থান থেকে সড়ে দাঁড়াবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক সিনিয়র নেতা বাংলামেইলকে বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘গতবছর টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) উপনির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার কারণে আমানুর রহমান রানাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। জাতীয় নির্বাচনেও যদি কেউ এ কাজ করে, তবে তাকেও ছাড় দেয়া হবে না। তবে কেউ যদি দল থেকে পদত্যাগ করে নির্বাচন করে সেক্ষেত্রে দল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কিছু করার থাকবে না।’

কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত শেখ সেলিম। তিনি গত উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের পরিসংখ্যান টেনে বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমাকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয়ভাবে মননোয়ন দেয়া হয়নি। সে সময় আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছি। আর সব সময় নেতাদের মনোনয়ন সঠিক হয় না।’

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থী সারা বেগম কবরী বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না আমাকে কেন মনোনয়ন দেয়া হয়নি।’ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর এক দল করেছি। এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না কি করব।’

এছাড়া ইতোমধ্যে প্রার্থী ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নেত্রকোনা-৩, যশোর-৪, কুড়িগ্রাম ৩, গাইবান্ধা-৪, চট্রগ্রাম-৪, কিশোরগঞ্জ-২, ময়মনসিংহ-৭, ময়মনসিংহ-১১, ময়মনসিংহ-৩, নড়াইল-২ আসনসহ প্রায় অর্ধশতাধিক এলাকায় সংঘর্ষ হয়েছে।

এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে শুভঙ্করের ফাঁকি। দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর পর্যন্ত চোখে পড়েছে হিসাবের গরমিল। ঝিনাইদাহ-৩ আসনে প্রার্থী হিসেবে বর্তমান সংসদ সদস্য শফিকুল আজম খান চঞ্চলের নাম দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ ঘোষণা করলেও দপ্তরের পাঠানো তালিকায় তার নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে পরবর্তীতে দলটির দপ্তর থেকে কোনো সংশোধনীও আসেনি। ইতোমধ্যে অবশ্য চঞ্চলের আসন থেকে নবী নেওয়াজ নির্বাচন কমিশনে গিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে এসেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বাংলামেইলকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা যাদেরকে মনোনয়ন দিয়েছেন তারাই বিজয়ী হবেন। কারণ তিনি যোগ্যপ্রার্থী দেখেই মনোনয়ন দিয়েছেন। এখানে কারো কোনো সুপারিশে কিছুই হয়নি।’

আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস বাংলামেইলকে বলেন, ‘মনোনয়ন নিয়ে কোনো রকম কারচুপি করা হয়নি। আওয়ামী লীগের সভাপতি তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই তথ্যের ভিত্তিতে যাদের নাম প্রথমে এসেছে তাদেরকেই দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। যদি কেউ বিদ্রোহী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান প্রয়োজনে দল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’ মৃণাল কান্তি মুন্সিগঞ্জ -৩ আসন থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয় দলটি। জনমত উপেক্ষা করে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পরিবর্তে দল সমর্থন দেয় শামীম ওসমানকে। সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আইভি রহমান এক লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন শামীম ওসমানকে। এছাড়া কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান মিঠু ও নূর উর রহমান মাহমুদ। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি নরসিংদী পৌরসভা নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ছিল আওয়ামী লীগ। প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের ভাই কামরুজ্জামান কামরুলের বিরুদ্ধে নির্বাচন করেন নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোন্তাজ উদ্দিন ভুঁইয়া। ৩০ সেপ্টেম্বর গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের উপনির্বাচনে জয় লাভ করেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী সিমিন হোসেন রিমি। তবে সেখানেও রিমির বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন তারই চাচা আফসার উদ্দিন।

অবশ্য গত ৫ জুলাইয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দল থেকে মনোনিত আজমত উল্লাহর বিরোধীতা করেছিলেন দলের আরেক নেতা জাহাঙ্গীর আলম। তবে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে সে যাত্রায় বিদ্রোহী প্রার্থী না পেলেও এবার জাতীয় নির্বাচনে ফের সেই আশঙ্কাই দেখা দিয়েছে। কেউ সরাসরি দল থেকে পদত্যাগ করে, আবার কেউ দলে থেকেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার। কোনোভাবেই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের দমাতে পারছে না আওয়ামী লীগ।