ঢাকা বিনোদন সাহিত্য

দিন বদলের প্রত্যাশায় বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবের সমাপ্তি

 আফিফা জামান, ঢাকা, ২ ডিসেম্বর:  বেশ কিছুদিন ধরেই হরতাল-অবরোধে জর্জরিত নাগরিক জীবন যাপন। বিশেষ করে সন্ধ্যা হলেই নাশকতার আশঙ্কা পেয়ে বসে রাজধানীবাসীদের। তাই আয়োজকেরা চিন্তিত ছিলেন, বিরোধী দলের এমন জ্বালাও পোড়াও কর্মসূচিকে পাশ কাটিয়ে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের উৎসবে মানুষজন আসবেন তো?

কিন্তু গান আর সুর পাগল মানুষ সেই চিন্তাকে উড়িয়ে দিয়েছেন তুরি মেরেই। তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন সুর সঙ্গীতের মূর্ছনায় ভাসতে কোন বাধাই তাদের আটকাতে পারে না। তাই তো চারদিন ব্যাপি ‘বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব-২০১৩’ উপভোগ করতে দেখা গেল হাজার হাজার শ্রোতা দর্শকের ভিড়। দুনিয়া কাঁপানো সব সঙ্গীত বিদুষীদের বাদ্য-সুর-রাগের মূর্ছনায় আনন্দে উদ্বেলিত মানুষের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে মেতে উঠেছিল রাজধানীর উৎসব প্রাঙ্গণ আর্মি স্টেডিয়াম।

কলকাতার আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমীর সহযোগীতায় বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত চার দিনব্যাপি ‘বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব-২০১৩’ উৎসবটি শেষ হয়ে গেল গত ১ ডিসেম্বর, রোববার। এটি শুরু হয়েছিল ২৮ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার। উৎসবের বিভিন্ন রকম সহোযোগীতা, স্পন্সর ও পার্টনার ছিল স্কয়ার, মাছরাঙা টেলিভিশন, ব্রাক ব্যাংক, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, রেডিও এবিসি, বিসনেস টাইম, চারবেলা চারদিক, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। প্রতিদিনই সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত হাজার হাজার শ্রোতা-দর্শকের আগমনে রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে সরব থেকেছে আর্মি স্টেডিয়াম।

শেষদিনে মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মত। সেই উপস্থিতি দেখে শেষ দিনের অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বললেন, ‘অবরোধের চোখ রাঙানিকে ঝেড়ে ফেলে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে বাঙ্গালি ও বাংলাদেশের দিন বদল হয়েছে। এগিয়ে চলেছে বিশুদ্ধ সংস্কৃতির চেতনায়। এমনি করেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ এই প্রত্যাশা করি। বিজয়ের মাসের প্রথম দিনে এখানে দাঁড়িয়ে আমি বলে যেতে চাই, আজকের এই আয়োজনের সাফল্য আমাদের বিশ্বাস করায় পথ হারাবে না বাংলাদেশ।’

অনুভব করলাম, মতিউর রহমানের আবেগ মেশানো বক্তব্য শেষে করতালিতে মুখরিত আর্মি স্টেডিয়াম যেন বাংলাদেশের দিন বদলকেই অভিনন্দিত করে গেল গেল।

সুরের সেরা স্বজনদের নিয়ে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব-২০১৩ এর চতুর্থ দিনের উৎসবটি উৎসর্গ করা হয় কিংবদন্তি সেতারবাদক পন্ডিত রবি শঙ্করকে। এদিনের অধিবেশনের প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব) এ কে খন্দকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। আয়োজকদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের লিটু ও আইটিসি এসআরএর নির্বাহী পরিচালক রবি মাথুর। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।

উৎসবের শেষ দিনের প্রথম পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসেন নৃত্যশিল্পী তামান্না রহমান। মুদ্রার সঙ্গে ভাবের অপূর্ব প্রকাশে মণিপুরী নৃত্য উপস্থাপন করেন এই শিল্পী। তার নৃত্যশৈলী মুগ্ধ করেছে দর্শনার্থীদের প্রাণ। একে একে তিনি গৌরাঙ্গস্ফুর্তি, দশ অবতার ও কালিয়া দামন পরিবেশন করেন। তাঁর সঙ্গে নৃত্যে সহযোগিতা করেন জয়ন্তী সামান্থা ও সুব্রত দাস। মৃদঙ্গে সঙ্গত করতে ব্রজেন কে. সিনহা থিঙ্গম, বেহালায় অম্লান হালদার, সেতারে ফিরোজ খান ও বাঁশিতে সৌম্যজ্যোতি ঘোষ। কণ্ঠসঙ্গীতে ছিলেন প্রিমিলা সরখৈবাম। নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন গুরু কলাবতী দেবী। পরিবেশনা শেষে তামান্না রহমান ও কলাবতী দেবীর হাতে উৎসব স্মারক তুলে দেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী হাশেম খান।

পরের পর্বে আসেন সুচিশ্রী রায়। কিন্নরকন্ঠী এই কন্ঠশিল্পী আগ্রা-গোয়ালিয়রের বলিষ্ঠ গায়কী ও পুরাব অঙ্গের মিশ্রণে সুরের খেলায় বিভোর করে রাখেন শ্রোতাদের। তারপর সন্তুরের মধুময় সুর লহরীতে সঙ্গীতানুরাগীদের মনে স্নিগ্ধতা বীজ বুনে দেন রাহুল শর্মা।

রাহুলের শেষে আসেন উলহাস কাশালকার। তার ভরাট ও মধুমাখা কণ্ঠসঙ্গীতের মায়াবী খেলায় সচকিত হয়ে ওঠে শ্রোতার শ্রবণ ইন্দ্রিয়। পালাক্রমে প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র রুদ্রবীণা বাজিয়ে আসর মাতিয়ে তোলেন ওস্তাদ বাহাউদ্দিন ডাগল। শিল্পীর ডাগরবাণী ঢংয়ের পরিবেশনায় বিশাল স্টেডিয়ামের প্রান্তরজুড়ে যেন বয়ে যায় শব্দের ঝঙ্কার। আপ্লুত হয় সঙ্গীতরসিকের অন্তর।

তবে ওই দিন সবাই অপেক্ষায় ছিলেন পন্ডিত পন্ডিত রবিশঙ্করের। সেই অপেক্ষার পালা ফুরালো যন্ত্রের বাজনা শেষে। শ্রোতাদের করতালিতে কণ্ঠসঙ্গীত নিয়ে মঞ্চে আসেন ওস্তাদ রশীদ খান। রামপুর ঘরানার এই বিশ্বখ্যাত শিল্পী অনবদ্য সুরের খেলায় মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন শ্রোতাদের মন। হৃদয় নাচানো স্বরের চড়াই-উৎরাই এবং নিখাদ ও সরল উপস্থাপনায় আলোড়িত করে রাখেন উৎসব প্রাঙ্গণ।

সবশেষে বেগম পারভীন সুলতানার কণ্ঠসঙ্গীতের পরিবেশনাটিও ছিল দারুণ উপভোগ্য।

যখন ঘোষণা আসল উৎসব শেষ, দর্শক শ্রোতা যেন বিশ্বাসই করতে চাইছিলেন না। চারদিন ধরে আসা যাওয়ায় এই উৎসবাঙ্গনও যে ফুরিয়ে যেতে পারে তা বুঝি ভাবনাতেই ছিল না কারও। সময় তবুও সময়!

কমছে স্টেডিয়ামের লাইট। আস্তে আস্তে কমতে শুরু করলো উপস্থিতিও। শীতের চাদরে ডেকে রাত যখন বিদায়ের পথে, তখন বাদ্য-সুর আর কন্ঠের মায়ায় হৃদয় পূর্ণ করে হাজার হাজার মানুষদের সাথে আমিও বিদায়ের পথ খোঁজে নিলাম। এই আয়োজনে, এই প্রাঙ্গণেই আবারও দেখা হবে আগামীতে- এই প্রত্যাশায়; সুস্থ সংস্কৃতির লালন ও চর্চায় সকল অস্থিরতা আর সঙ্কট কাটিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ- এই প্রত্যাশায়।