জাতীয় বরিশাল ভোলা রাজনীতি

ভোলা-৩ আসনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন যুদ্ধ

ভোলা প্রতিনিধি: সম্ভাব্য ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পেতে রাজধানীতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে তিন তরুণ রাজনীতিবিদ। দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের। এ মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) নির্বাচনীয় এলাকার জনগণের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন নিয়মিত। মনোনয়ন দৌড়ে প্রত্যেকেই যার যার মতো করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া বিষয়ে এখনো কেউ নিশ্চিত হতে পারেননি। আওয়ামীলীগের মনোনয়নপত্র বিক্রির প্রথম দিন ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে দলীয় মনোনয়ন ফরম ক্রয় করেন এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) জসিম উদ্দিন। দ্বিতীয় দিন ১১ নভেম্বর দলীয় মনোনয়নপত্র ক্রয় করেন বিশিষ্ট শিল্পপতি ও বঙ্গবন্ধু টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার এসোসিয়েশন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মীর মোবাশ্বের আলী স্বপন। ১২ নভেম্বর একই আসনের মনোনয়নপত্র ক্রয় করেন ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন। দলীয় মনোনয়ন পেতে তিনজনই আশাবাদী।
প্রকৌশলী মীর মোবাশ্বের আলী স্বপন এর একজন সমর্থক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে এ নির্বাচনে জয় লাভ এতো সহজ হবে না। সে কারণে বিএনপির প্রভাবশালী প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে হারাতে হলে এ আসনে দরকার হবে একজন ক্লিন ইমেজের প্রার্থী। যিনি শুধু আওয়ামীলীগের প্রার্থী হবেন না। তিনি হবেন দল মত নির্বিশেষে সব মানুষের পছন্দের। আগামী নির্বাচনে দলকে আবারো ক্ষমতায় আনার জন্য আওয়ামীলীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিতদেরকেই সারা দেশে মনোনয়ন দেবেন। সেই বিবেচনায় এবার ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনের দলীয় মনোনয়ন পাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত স্নেহভাজন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ব বিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি ইঞ্জিনিয়ার মীর মোবাশ্বের আলী স্বপন। ওয়ান ইলেভেন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর যখন আওয়ামীলীগ সভানেত্রীকে বিদেশে পাঠানোর সময় শেখ হাসিনার সফর সঙ্গী ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার স্বপন।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার দেড় বছর পর যখন মেজর (অব.) জসিম উদ্দিন আইনি কারণে জাতীয় সংসদের সদস্য পদ হারিয়েছেন তখন উপ-নির্বাচনে এ আসনে মনোনয়ন যুদ্ধে অংশ নেন বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর জসিম।
ভোলায় আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে পরিচিত দলের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ মেজর জসিমকে বাদ দিয়ে ভোলা-৩ আসনে নুরন্নবী চৌধুরী শাওনকে প্রার্থী করতে দলীয় হাইকমান্ডকে চাপ প্রয়োগ করেন। ফলে উপ-নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান বর্তমান সংসদ সদস্য নুরন্নবী চৌধুরী শাওন। নুরন্নবী চৌধুরী শাওনের নির্বাচন পরিচালনার জন্য কেন্দ্র থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন তোফায়েল আহমদ।  কিন্তু এবারের পরিবেশ তার সম্পূর্ণ উল্টো। প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ এবার বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন না।
দলের বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছেন, আওয়ামীলীগের সভাপতিম-লীর সাবেক সদস্য ও বর্তমানে আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা এডভোকেট ইউসূফ হোসেন হুমায়ুন ও তোফায়েল আহমেদ এবার দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ার স্বপনকেই সমর্থন করবেন। তাছাড়া যুবলীগের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহবুবুর রহমান হিরণও প্রকাশ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের বিরোধীতা করছেন।
অপরদিকে লালমোহন-তজুমদ্দিনের আওয়ামীলীগের  মনোনয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরণের ফ্যাক্টর হচ্ছেন লালমোহন উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ একেএম নজরুল ইসলাম। বিগত দিনে আওয়ামীলীগের মনোনয়নের ক্ষেত্রে তিনি দৌড়ঝাপ করলেও এবার তিনি চুপচাপ থাকছেন। বর্তমান সংসদ সদস্য নুরন্নবী চৌধুরী শাওনের মনোনয়নপত্র ক্রয়ের সময় তিনি ঢাকায় আসেননি। তার একান্ত আপনজন ও পারিবারিক আড্ডায় তিনি বর্তমান সংসদ সদস্যের মনোনয়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন।
লালমোহনের এক আওয়ামীলীগ নেতা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ যুবলীগের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বর্তমান সংসদ সদস্য নুরন্নবী চৌধুরী শাওন নির্বাচিত হয়ে ভোলার লালমোহন তজুমদ্দিনে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, রাস্তা, পুল ও তার নির্বাচনীয় এলাকায় বিভিন্ন অবাকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে অতীতের সব রের্কড ভঙ্গ করেছ। বিশেষ করে বিএনপির প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী মেজর হাফিজের বাড়ি সংলগ্ন লঙ্গলখালী পুল নির্মাণ করে তিনি লালমোহন চরফ্যাশনবাসীর আস্থা অর্জন করেছেন। লালমোহনে দু’টি কলেজ, দুইটি নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, একটি কাওমী ও একটি হাফিজীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, লাঙ্গলখালী ও হরিগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ দু’টি ব্রিজ, বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ, পাকা সড়ক, তজুমদ্দিনে একটি বি-গ্রেডের ফায়ার সার্ভিস নির্মাণ, মেঘনার ভাঙ্গন থেকে এ লালমোহন তজুমদ্দিনের মানুষকে রক্ষায় ১শ’ ২ কোটি টাকা বরাদ্দ করছেন বর্তমান এমপি নুরন্নবী চৌধুরী শাওন। কিন্তু এরপরও লালমোহন-তজুমদ্দিনের মানুষ তারও উপর ক্ষিপ্ত। এর প্রধান কারণ হচ্ছে ইব্রাহীম হত্যাকা-, টেন্ডারবাজী ও চাদাবাজী। অপরদিকে চরভূতা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সভাপতি হোসেন চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও আওয়ামীলীগ নেতা এমদাদুল ইসলাম তুহিনের সঙ্গেও শাওনের বিরোধ চলছে। তারা বর্তমান সংসদ সদস্য নুরন্নবী চৌধুরী শাওনের বিকল্প প্রার্থী খুজছেন।
এদিকে সাবেক সংসদ সদস্য মেজর জসিম উদ্দিন মনোনয়ন যুদ্ধে এগিয়ে রয়েছেন বলে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। মেজর (অব.) জসিম উদ্দিনের একটি ঘনিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন, তিনি দলের মনোনয়ন নিয়েই নির্বাচনীয় এলাকা লালমোহন-তজুমদ্দিনে আসবেন। মনোনয়নের বিষয়টি চুড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এলাকায় আসছেন না। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছিলেন মেজর জসিম। নির্বাচিত হয়ে মাত্র তিন মাসের মাথায় তিনি তার দলের মধ্যে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন।
খয়রাতির চাল বিক্রি থেকে শুরু করে লালমোহন বাজারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাদা নেয়ার অভিযোগে তিনি ব্যাপক সমালোচিত হন। তাছাড়া মেজর (অব.) জসিম উদ্দিনের ক্যাডাররা লালমোহন প্রেসক্লাবে হামলা করায় সুশীল সমাজের লোকেরা এটিকে ভালোভাবে নেয়নি। অপরদিকে আইনি জটিলতায় দেড় বছরের মধ্যে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান। তাছাড়া সাবেক এই সংসদ সদস্যের ভাই জিয়া উদ্দিন সরণ লালমোহনে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করেছিলেন। পাশা-পাশি লালমোহন বালিকা বিদ্যালয়ের সভাপতি ও লালমোহন বিআরডিবির চেয়ারম্যান পদ গ্রহণসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকা-ে জড়িয়ে পরেন। যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি মেজর জসিম।
এদিকে দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এলাকায় আসছেন না বর্তমান সংসদ সদস্য নুরন্নবী চৌধুরী শাওন। অপরদিকে একই আসন থেকে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ইঞ্জিনিয়ার মীর মোবাশ্বের আলী স্বপনের সমর্থকরা মনে করেন এ আসনটি ধরে রাখতে হলে ইঞ্জিনিয়ার স্বপনকেই মনোনয়ন দিতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৩ হাজার ৩শ’ ৬৬ ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মেজর (অব.) জসিম উদ্দিন। মেজর জসিম পান ৯৬ হাজার ৪শ’ ৮৪ ভোট এবং মেজর হাফিজ পান ৮৩ হাজার ১শ’ ১৮ ভোট। এরপর উপ-নির্বাচনে ৫০ হাজার ৩১৫ ভোট বেশি পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন যুবলীগের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক নুরন্নরী চৌধুরী শাওন। শাওন পান ৯৩ হাজার ৪শ’ ৭৩ ভোট এবং মেজর হাফিজ পান ৪৩ হাজার ১শ’ ৫৮ ভোট।