অর্থ ও বাণিজ্য কৃষি খুলনা চুয়াডাংগা জাতীয়

চুয়াডাঙ্গার কৃষকরা ফুল চাষ করে সাবলম্বী হচ্ছে

 চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি, ২৪ নভেম্বর:  দেশের দক্ষিন-পশ্চিম অঞ্চলের রক্তাক্ত জনপদ চুয়াডাঙ্গার বাতাসে ভেসে বেড়ায় নানান ফুলের সুবাস। একটা সময় ছিল যখন এই অঞ্চলে রাত পোহালেই কোনোনা কোনো কৃষকের মাঠে পড়ে থাকতো মানুষের লাশ। এখন চুয়াডাঙ্গার মাঠে মাঠে বাতাসে দোল খাচ্ছে রজনীগন্ধাসহ নানান ফুলের ছড়া। প্রবাদ আছে ফুল যে  ভালবাসেনা সে মানুষ খুন করতে পারে। চুয়াডাঙ্গার কৃষকরা ফুলকে ভালবেসে মাঠে মাঠে নানান জাতের বাহারী রঙের ফুলের কাব্য ছড়িয়ে দিয়েছে। শুধু কাব্যই নয় ফুলের চাষ করে কৃষকরা অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজে পাচ্ছে হচ্ছে সাবলম্বী।চুয়াডাঙ্গার কৃষকদের পরম যত্ন ও স্নেহে উৎপাদিত ফুলের বহুবিধ ব্যাবহারের কারণে ফুলের চাহিদাও বহুগুনে বেড়ে গেছে। একটা সময় ছিল যখন মানুষ বাড়ির আঙিনা অথবা বাড়ির সামনের খোলা স্থানে ঘিরে মনোরম ও বাহারি রঙের সৌখিন ফুলের বাগান করতো। কিন্তু আজ আর ফুলের বাগান শুধু শখের নয়, যে কেউ ইচ্ছা করলে বাড়ীর আঙিনায়ও ফুলের বাগান করে উপার্জনের পথ খুঁজে পেতে পারে।চুয়াডাঙ্গা শহরেই একটি গোলাপ বিক্রি হয় ৫০ টাকায়। একটি ছোট্ট ফুলের তোড়া বিক্রি হয় ১শ’টাকায়। এটাই শেষ নয়, চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন কয়েক ট্রাক রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁধাসহ হরেক রকমের ফুল রপ্তানী হচ্ছে ঢাকা শহরে।ফুল চাষ করে কিংবা ফুলের ব্যবসা করে সচ্ছ্বলতা এনেছেন চুয়াডাঙ্গার শত শত কৃষক। চুয়াডাঙ্গার মাঠে এখন শোভা পাচ্ছে রজনীগন্ধা ফুলের ক্ষেত। ফুলচাষীরা বলছেন, ফুলের চাষ করে বড় ধরণের লোকসান হয়েছে এমন ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না। এ বছর রজনীগন্ধা ফুলের ক্ষেতে ফুল এসেছে কম। তারপরও কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। কারণ, ঢাকার বাজারে রজনীগন্ধা ফুলের দাম বেশ ভাল।

একসময় সারাদেশের মতো চুয়াডাঙ্গার মানুষরাও শখ করে ফুলের বাগান করতেন বাড়ির আঙ্গিনায়। বাড়ির শোভাবর্ধনই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এখন দিন বদলেছে। এখন ফুলচাষ হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে। চুয়াডাঙ্গা জেলায় মূলত রজনীগন্ধা, গোলাপ ও গেন্দা ফুলের চাষ হয় বাণিজ্যিকভাবে। এখন চলছে রজনীগন্ধার মৌসুম। জেলার বিভিন্ন এলাকার মাঠে মাঠে চোখে পড়ছে রজনীগন্ধার ক্ষেত।রজনীগন্ধা চাষীরা জানান, ফুলচাষ ভদ্র চাষ হিসেবে পরিচিত। ঝামেলা কম। চাষ শুরুর তিন মাস পর থেকে রজনীগন্ধা বিক্রি করা যায়। বাজারজাতের কোনো অসুবিধা নেই। ক্ষেত থেকেই ফুল ব্যবসায়ীরা রজনীগন্ধা কিনে নিয়ে যান। অনেক কৃষক নিজেরাই ঢাকার বাজারে নিয়ে রজনীগন্ধা বিক্রি করে আসেন। চুয়াডাঙ্গার ভিমরুল্লা গ্রামের জেনারুল ইসলাম এবছর ১০ বিঘা জমিতে রজনীগন্ধার চাষ করেছেন। তিনি জানান, ‘রজনীগন্ধা ফুলের একটি ক্ষেত তৈরির পর দু‘বছর পর্যন্ত খুব ভালভাবে ওই ক্ষেত থেকে ফুল বিক্রি করা যায়। বিঘাপতি খরচ হয় ১৮-২০ হাজার টাকা। একবিঘা জমি থেকে ২০-৩০ হাজার টাকা পর্যন্তও লাভ হয়ে থাকে। এবছর ক্ষেতে ফুল ধরেছে কম। ঢাকার বাজারে পাইকারি একটি রজনীগন্ধার স্টিক বিক্রি হচ্ছে ৪ টাকা থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত। এমন দামে বিক্রি হলে কোনোক্রমেরই লোকসান হওয়ার কথা নয়, বরং বেশ ভাল লাভ হওয়ার কথা।’

ভিমরুল্লা গ্রামের জেনারুল ইসলাম ছাড়াও লাল্টু, মতিয়ার, আশাদুল, জহিরুলসহ আরো অনেকে ৫ থেকে ১০ বছর ধরে রজনীগন্ধা ফুলের চাষ করছেন।

রজনীগন্ধা চাষীরা আরো জানান, ‘রজনীগন্ধা ক্ষেতের প্রধান শত্রু অতিবৃষ্টি। অতিবৃষ্টির কারণে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফুল আসে দেরিতে। ওইসময় কিছুকিছু রোগ-বালাইও দেখা দেয়। তবে, শীত শুরু হলে এমনিতেই আর কোনো রোগ-বালাই থাকে না। গাছ হয়ে ওঠে তরতাজা। ফুলও আসে দ্রুত।চুয়াডাঙ্গার হাটকালুগঞ্জ ও ভিমরুল্লা গ্রামে গেলে দেখা যাবে সারা মাঠ জুড়ে বাতাসে দোল খাচ্ছে রজনীগন্ধা ফুল।সিএন্ডবি পাড়ার রজনীগন্ধা চাষী ওমর আলী ও আব্দুর রাজ্জাক রাজা জানান, ‘একবিঘা জমিতে ২০০ থেকে ৫০০টি পর্যন্ত ফুল পাওয়া যায়। দু‘জনই বলেন, এবছর উৎপাদন কম হলেও দাম বেশ ভাল।’কৃষক জেনারুল ইসলাম জানান, ‘আর্থিক লাভের আশায় সবাই ফুলচাষ করে না। নিজের ফুলক্ষেতের পাশে দাঁড়ালে এমনিতেই মন ভাল হয়ে যায়।’অন্য এক কৃষক বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গার একটি বদনাম রয়েছে, ‘সন্ত্রাসী-চরমপন্থী ‘উৎপাদনের’ ক্ষেত্রে চুয়াডাঙ্গার মাটি বেশ উর্বর। মাঠে মাঠে ফুলচাষ করে আমরা প্রমাণ করেছি, চুয়াডাঙ্গার বাতাসে শুধু বারুদের গন্ধ নেই, ফুলের সুবাসও আছে।’চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক হরিবুলা সরকার বলেন, ‘এবছর চুয়াডাঙ্গা জেলায় ৫০ হেক্টর জমিতে রজনীগন্ধার চাষ হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবছরও জেলার রজনীগন্ধা চাষীরা লাভবান হচ্ছেন।’