জাতীয় ঢাকা রাজনীতি

দেশ অচলের কর্মসূচি সোমবার থেকে!

 রেজা মাহমুদ, ঢাকা, ২৩ নভেম্বর:  দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে আগামী সোমবার। আর ওই দিন থেকেই দেশ অচলের অবরোধ কর্মসূচি দিতে পারে বিএনপির নেতৃত্বাধীন  ১৮দলীয় জোট। এখন পর্যন্ত এমন আন্দোলনের রোডম্যাপের আভাস দিয়েছে জোটটির একাধিক সূত্র। তবে তার আগে তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেন কি-না সেটি দেখতে চায় দলটি। এছাড়া নির্দলীয় সরকারের দাবিতে রোববার জেলা ও উপজেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি রয়েছে। এরপরই দলটি ‘আগ্রাসী রূপ’ দেখাতে চাইছে। এজন্য দলের নিস্ক্রিয় ‘সংস্কারপন্থি’ নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করে সর্বাত্মক আন্দোলনে নামতে চায়  দলটির হাইকমান্ড। সূত্র জানায়, নির্বচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার মতো কোনো কর্মসূচি এখনো দিতে পারেনি বিএনপি। তবে তিন দফায় হরতাল কর্মসূচি পালন করেছে দলটির নেতৃত্বাধীন জোট। কিন্তু তিন দফা হরতালের কর্মসূচিগুলো সফল করতে রাজপথে নামেন নি কোনো নেতা। ঘরে বসেই তারা সময় কাটিয়েছেন, অথবা থেকেছেন আত্মগোপনে।

বিএনপির হাইকমান্ড মনে করছে এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। সরকার একতরফা নির্বাচনে সফল হলে বিএনপির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। এমন আশঙ্কা থেকে কঠোর আন্দোলন করতে নেতাদের রাজপথে নামানোকে গুরুত্ব দিচ্ছে হাইকমান্ড।

সারাদেশের আন্দোলন হলেও ঢাকায় আন্দোলন কেন নিস্প্রভ, এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের ওপর নিজের ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।

গত বৃহস্পতিবার এক অনির্ধারিত বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপার্সন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘তৃণমূলের যে কর্মী নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নামছে, তার প্রাপ্তি কতটুকু? আর দল ক্ষমতায় গেলে যারা মন্ত্রী হবেন, তারা হাতগুটিয়ে বসে থাকছেন। আপনাদের কেউ ক্ষমতায় এনে দেবে না, আন্দোলন করে দাবি আদায় করতে হবে।’ আগামীতে আন্দোলন করতে না পারলে দলীয় পদ কেড়ে নেয়ারও হুমকি দেন তিনি।
ভবিষ্যতে নিরপক্ষে নির্বাচন হলে সেখানে যোগ্যতা প্রমাণের একমাত্র ‘মানদণ্ড’ হবে আন্দোলনের জন্য কে কতটা ত্যাগ স্বীকার করবে তার উপর। তদবির বা মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে যারা বিএনপির প্রার্থী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তাদের জন্য দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে। বাঁকা পথে নয়, এবার আন্দোলনে কার্যকর ভূমিকার উপর দলের মনোনয়ন নির্ভর করবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন।

এজন্য কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে রাজধানীকে আটটি ভাগে বিভক্ত করে আট গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দিয়েছেন খালেদা জিয়া। শুধু মহানগর নেতাদের ওপর আন্দোলনের ব্যর্থতার দায় না চাপিয়ে দলের স্থায়ী কমিটি ও কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদেরও রাজপথে নেমে আসার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সারাদেশে আন্দোলন জোরদার করতে দলের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও এলাকাগুলো হচ্ছে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহকে খিলক্ষেত, কাফরুল, ক্যান্টনমেন্ট, বনানী, রামপুরা, বাড্ডা ও গুলশান; মির্জা আব্বাসকে মতিঝিল, খিলগাঁও, সবুজবাগ, পল্টন ও মুগদা; গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে মোহাম্মদপুর, আদাবর, দারুস সালাম, পল্লবী, মিরপুর শাহআলী; সহ সভাপতি সাদেক হোসেন খোকাকে শাহবাগ, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি, বংশাল, গেন্ডারিয়া, ওয়ারী; যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমানকে ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, লালবাগ, নবাবগঞ্জ ও হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীর চর; বরকত উল্লাহ বুলুকে উত্তরা, উত্তরখান ও দক্ষিণখান, তুরাগ, বিমানবন্দর; মহানগরের সদস্য সচিব আবদুস সালামকে শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল; যুগ্ম আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন আহমেদকে ডেমরা, শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী।

এদিকে আগামী সোমবারের মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ। আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে।

নির্বাচন কমিশনের এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা না করে তফসিল ঘোষণা করলে সারাদেশ অচল করে দেয়া হবে। এজন্য ভেদাভেদ ভুলে কঠোর আন্দোলনের জন্য নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়েছেন তিনি।

জানতে চাইলে দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংকট নিরসনের সম্ভাব্য সবরকম চেষ্টা করেছে বিএনপি। কিন্তু সরকার আসলেই আন্তরিক না। দেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা অনুযায়ী নির্দলীয় সরকারের দাবিতে এখন কঠোর আন্দোলন ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

এনডিপির চেয়ারম্যান গোলাম মোর্তজা বলেন, ‘যে দিন তফসিল ঘোষণা করা হবে সেদিন থেকে নির্বাচন কমিশনের পানি, বিদ্যুৎসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু বন্ধ করে দেয়া হবে। কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে।’

এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ বলেন, ‘সংগ্রাম আন্দোলনের মধ্য নিয়ে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করে নির্বাচন করতে বাধ্য করা হবে। সরকার যতই আগ্রাসী রূপ দেখান না কেন, ১৮ দল ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করবে।’

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর থেকে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে বিএনপি নেতৃত্বধীন ১৮ দলীয় জোট। এ নিয়ে দফায় দফায় হরতাল কর্মসূচিও দিয়েছে দলটি।

ইতোমধ্যে পর পর তিন সপ্তাহের প্রথম ২ সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টার ও পরে ৮৪ ঘণ্টার টানা হরতাল করা হয়েছে। একই সাথে সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছিলো। সর্বশেষ গত মঙ্গলকার নির্দলীয় সরকারের বিষয়ে সরকারকে সংলাপে বসাতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের হস্তক্ষেপ চান বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া। দলটি এখন তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ নেন কি না সেটি দেখতে চায়।

এদিকে দলের পাশাপাশি ১৮ দলীয় জোটের শরিক ও দলের নিস্ক্রিয় ‘সংস্কারপন্থি’ নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করে সর্বাত্মক আন্দোলনে নামতে চায় বিএনপির হাইকমান্ড। এ নিয়ে দলের মহাসচিবও কথা বলেছেন ১/১১ এর সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত এসব নেতার সঙ্গে।

শুক্রবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ১৮ দলের সমাবেশে বেশ কিছু সংস্কারপন্থি নেতাকে উপস্থিত থাকতেও দেখা গেছে। বরিশালের সাবেক এমপি জহিরউদ্দিন স্বপন, যশোরের সাবেক এমপি রফিকুল ইসলাম তৃপ্তি, নরসিংদীর সাবেক এমপি সরদার সাখাওয়াত হোসেন, রাজবাড়ীর ওমর খৈয়াম, সিলেটের কাজল ছাড়াও আরো বেশ সংখ্যক সংস্কারপন্থি নেতা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে (অব.) মাহবুবুর রহমান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘সংলাপের আশা করেছিলো বিএনপি। কিন্তু আপাতত কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এজন্য বাধ্য হয়েই কঠোর আন্দোলনে যাচ্ছে দলটি।’