জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর রাজনীতি

রাষ্ট্রপতির সীমাবদ্ধতায় আশাহত ১৮ দল!

আছাদুজ্জামান,হটনিউজ২৪বিডি.কম,২০নভেম্বর,ঢাকা:  চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের শেষ ভরসাস্থল হিসেবে বঙ্গভবনে গেলেও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সাংবিধানিকভাবে তার সীমাবদ্ধতার কথা জানানোয় আশা ভঙ্গ হলো ১৮ দলের। কারণ, এর ফলে বেগম খালেদা জিয়া যে রাষ্ট্রপতিকে আসল প্রস্তাবটিই দিতে পারেননি! বৈঠক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় ১৮ দলীয় জোটনেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন। এর আগেই বিএনপি ও ১৮ দলের বাকি ১৯ সদস্য বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে বসেন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ২০ সদস্যের প্রতিনিধি দল। কিন্তু বৈঠক শেষে তাদেরকে হতাশ হতে হয়। চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের লক্ষ্যে সংলাপের উদ্যোগ নিতে বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারের উদ্দেশে একাধিকবার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে তেমন সাড়া না পাওয়ায় গত ২৫ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশ থেকে সংলাপের উদ্যোগ নিতে সরকারকে দুই দিনের আলটিমেটাম দেন খালেদা জিয়া। ‍অন্যথায় ২৭ অক্টোবর থেকে টানা তিনদিনের হরতালের হুমকি দেন তিনি। ফলশ্রুতিতে গত ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় বেগম খালেদা জিয়াকে ফোন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফোনালাপে বেগম জিয়াকে হরতাল প্রত্যাহার করে ২৮ অক্টোবর রাতে গণভবনে সংলাপ ও নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী। বিএনপি চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। কিন্তু ২৮ অক্টোবর হরতালের কর্মসূচি থাকায় ওই দিন গণভবনে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেন খালেদা জিয়া এবং ২৯ অক্টোবর হরতালের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর যেকোনো দিন যেকোনো জায়গায় সংলাপে বসার কথা জানান বিরোধী দলীয় নেতা। কিন্তু এরপর প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা ‘সংলাপের দরজা এখনো খোলা রয়েছে’ বলে জানালেও সংলাপের ব্যাপারে তাদের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কাযকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। আর এর মধ্যেই গত সোমবার নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠিত হয়। বিএনপি ওই সর্বদলীয় সরকারকে প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি এটিকে মহাজোট সরকারের পুরানো মন্ত্র্রিসভার সম্প্রসারণ বলে দাবি করে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির আবেদনের প্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে আরো উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র নায়েবে আমির অধ্যাপক একেএম নজির আহমেদ, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী, খেলাফত মজলিশের আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, এনপিপির চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নিলু, বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি, এনডিপির চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্রি. জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। এদিকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠককে কেন্দ্র করে গত সোমবার রাত সাড়ে  ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বিএনপি এবং জোটের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন খালেদা জিয়া।

বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ‘রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ জানাবেন বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া। একইসঙ্গে ১৮ দলীয় জোটের অবস্থান তুলে ধরে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান পদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিকল্প চাইবেন তিনি। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনে কোনোভাবেই অংশগ্রহণ করবে না ১৮ দল। তারা মনে করে, শেখ হাসিনার অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই নির্বাচনকালীন সরকার প্রধানের পদ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরে যেতেই হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হলে তাতেও আপত্তি থাকবে না ১৮ দলের!’

অবশেষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ২০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সেই বহু কাঙ্ক্ষিত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বৈঠকের শুরুতেই ভেঙ্গে যায় স্বপ্ন, আশাহত হয় ১৮ দল। কারণ, শেখ হাসিনার পরিবর্তে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে ১৮ দল কাকে চায়-সেই প্রস্তাবটি যে রাষ্ট্রপতিকে দিতে পারেননি খালেদা জিয়া!

বৈঠক সূত্র জানায়, ‘বঙ্গভবনে বৈঠকের শুরুতেই রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সাংবিধানিকভাবে তার সীমাবদ্ধতার কথা জানান খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ২০ সদস্যের প্রতিনিধি দলকে। রাষ্ট্রপতির ওই কথার প্রেক্ষিতে বৈঠকের ফলাফল নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন তারা। ফলে ১৮ দল যে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাকে কোনোভাবেই মানবেন না এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে শেখ হাসিনার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হলে তাতে যে ১৮ দলের আপত্তি থাকবে না-এই প্রস্তাবটি আর রাষ্ট্রপতির কাছে দেননি বেগম জিয়া।

অবিলম্বে সংঘাত, হানাহানি ও হিংস্রতার পথ পরিহার করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সরকার যাতে সমঝোতার পথে অগ্রসর হয় সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানান বেগম খালেদা জিয়া।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈঠকে উপস্থিত ১৮ দলীয় জোটের এক শীর্ষনেতা বিবার্তাকে বলেন, ‘বৈঠকের শুরুতেই রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সাংবিধানিকভাবে তার সীমাবদ্ধতার কথা জানানোয় আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। ফলে আমরা রাষ্ট্রপতিকে মূল প্রস্তাব দেয়া থেকে বিরত থাকি এবং চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে রাষ্ট্রপতিকে সংলাপের উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ জানাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘বৈঠক সফল না হওয়ায় এখন আন্দোলন ছাড়া আমাদের সামনে আর বিকল্প কোনো পথ সম্ভবত থাকলো না।’