খুলনা জাতীয় যশোর

ফুলের রাজ্য গদখালীতে কোটি টাকার ফুল খাচ্ছে গরু ছাগলে

Pic-2 রিপন হোসেন, যশোর থেকে :  টানা হরতালে যশোরের গদখালীর ফুল বাজারে ব্যাপক ধ্বস নেমেছে। পরিবহন সংকটের কারনে ব্যবসায়ীরা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় ফুল পাঠাতে পারছেন না। বেচা কেনায় ধ্বস নামায় কৃষকরা  ক্ষেত থেকে ফুল তোলার আগ্রহ হারাচ্ছেন। নিরুপায় হয়ে অনেকে যারা ক্ষেত থেকে ফুল সংগ্রহ করে গদখালীর পাইকারী বাজারে আনছেন বিক্রি করতে না পেরে সেই ফুল ফেলে দিচ্ছেন । রাস্তার পাশে সেই ফুল খাচ্ছে গুরু ছাগলে। ব্যবসায়ী ও হাটমালিকরা জানান গত ৮৪ ঘন্টার টানা হরতালে এই অঞ্চলের কৃষকদের ৫০ লাখ টাকার পুল নষ্ট হয়ে গেছে। হাটমালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকার। যশোরের গদখালী দেশের ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে এই বাজারে শুরু হয় ফুলের কেনাবেচা। কৃষকরা তাদের ক্ষেতে উৎপাদিত ফুল নিয়ে হাজির হয় এই বাজারে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা এই বাজারে আসেন ফুল কিনতে। কেনা ফুল বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমে পৌঁছে যায় ঢাকাসহ সংশ্লিষ্ট গন্তব্যে। কিন্তু টানা হরতালে গদখালীর ফুল বাজারে ধ্বস নেমেছে। পাইকারী ব্যবসায়ীরা না আসার কারনে পানির দামে কৃষকরা তাদের ফুল বেচতে বাধ্য হচ্ছেন।

পানিসারা গ্রামের ফুলচাষী ইদ্রিস আলী জানান, এক সপ্তাহ আগেও প্রতি ১ শো গোলাপ ফুল বিক্রি হয়েছে  ২শো থেকে  ৩শো টাকায়। কিন্তু হরতালের বাজারে সেই ফুল বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা শ দরে।আর গাঁদা ফুলের কোন দরদাম নেই। শংকরপুর গ্রামের রতœ শেখ জানালেন, টানা হরতালের কারনে বাজারে কোন পাইকার আসছেন না। পরিবহন চলাচল বন্ধ। ফলে ক্ষেতের ফুল ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে। পানিসারা গ্রামের আব্দার ফারুকের সাথে কথা হয় তার ফুলের ক্সেতে। তিনি গোলাপ আর রজণীগন্ধা ফুল কেটে কেটে ক্ষেতের আইলে ফেলে দিচ্ছেন। কারন জিঙ্গাসা করতেই বললেন, টানা হরতালের কারনে ফুলের কোন খদ্দের নেই। ফুল সময় মতো তুলে বাজারে না নেওয়ার ফলে সব ফুটে নষ্ট হয়ে গেছে। ফুটন্ত ফুল তাই কেটে ফেলে দিতে হচ্ছে।  নইলে আগামীতে ভালো ফলন পাওয়া যাব না। এদিকে ফুলের বেচাকেনা না হলেও ক্ষেতের পরিচর্যা থামানো যাচ্ছে না। আগাছা পরিস্কার থেকে শুরু করে গাছের পরিচর্যা, সার প্রয়োগ সব কিছুই করতে হচ্ছে।এদিকে বাজারে ফুল বেচাকেনায় ধ্বস নামার কারনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা হতাশায় ভুগছে। অনেকে বলছেন ফুলকে কাঁচামালের আওতাভুক্ত করে যদি হরতালের আওতামুক্ত করা না হয় তাহলে এই চাষ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোন বিকল্প থাকবে না। কারন ফুল অত্যান্ত ব্যয়বহুল একটি চাষ।

গদখালী ফুলের হাটের আড়তদার নজরুল ইসলাম জানান, বাজারে ফুলের দাম না থাকায় কৃষকরা ক্ষেত থেকে ফুল তোলার আগ্রহ হারাচ্ছেন। কৃষকরা বলছেন বাজারে ফুলের বেচা কেনা নেই। দাম কম। হরতালের আগে ফুলের যে দাম ছিলো এখন তার সিকি দামেও বিক্রি হচ্ছে না। ফলে জোনের দাম না ওঠার কারনে তারা ফুল তোলা বন্ধ করে দিয়েছেন।

স্থানীয় পাইকার ও আড়তদারদের দাবি, হরতালের কারনে পরিবহন সংকট চরমে উঠেছে। গদখালী বাজার থেকে ফুল কিনে তারা পরিবহন যোগেঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠান। কিন্তু হরতালের কারনে তাদের সে সুযোগ নেই। যার কারনে তারা ফুল কেনার আগ্রহ হারাচ্ছেন। স্থানীয় যে সব ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা ফুল কিনতেন তারাও হরতালের কারনে ফুল কেনা বন্ধ রেখেছেন।

হাট মালিকরা বলছেন, গদখালী বাজারে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে ফুলের বেচা কেনা । প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার ফুল কেনাবেচা হয়। দুপুরের পর কেনা ফুল  নিয়ে পাইকাররা পরিবহন যোগে পৌঁছে যান নিজ নিজ গন্তব্যে। কিন্তু টানা হরতালের কারনে পাইকারী ব্যবসায়ীরা আসছেন না। স্থানীয় ক্রেতারাও ফুল বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। যার ফলে কৃষকরা লাখ লাখ টাকার ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। ফুলের জনক হিসেবে পরিচিত পানিসারা গ্রামের শের আলী সরদার জানান, বর্তমানে এই অঞ্চলের ২০ হাজার হেক্টর জমিতে সারা বছর জুড়ে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চাষ হচ্ছে। যার মধ্যে গোলাপ, লিলিয়াম, জারবেরা, গ্লাডিউলাস, ভুট্টা, রজণীগন্ধা, গাঁদা ইত্যাদী  ফুল বিশেষ ভাবে পরিচিত। এক বিঘা জমিতে জারবেরা বা লিলিয়াম ফুলের চাষ করতে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু এভাবে রাজনৈতিক সহিংসতা আর হরতালের কবলে পড়ে কৃষকরা সর্বশান্ত হচ্ছেন। ফুলের কোন কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় কৃষকরা তাদের ফুল সংরক্ষণ করতে পারছেন না। ফলে ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ টাকার ফুল। আর এর ফলে এই সেক্টরের সাথে জড়িত ৩০ হাজার মানুষের জীবন জীবিকা পড়েছে হুমকির মুখে।