জাতীয় প্রধান খবর রাজনীতি

সংলাপ ফের অনিশ্চয়তার আড়ালে

Khaleda-and-hasina-40020130505064645 আছাদুজ্জামান, ঢাকা, ৯ নভেম্বর: আরেকদফা হোচট খেল রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বহুল প্রতীক্ষিত ‘সংলাপ’। সেই সঙ্গে ধুসর হয়ে আসছে সমঝোতা নিয়ে জনগণের আশা-আকাঙ্খা। সংলাপ নিয়ে একের পর এক পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় জনগনের মধ্যেও বাসা বাঁধছে অজানা আতঙ্ক। শুক্রবার রাতে বিরোধী দল বিএনপির প্রভাবশালী তিন স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া এবং খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু ও ব্যক্তিগত সহকারী শিমুল বিশ্বাস সদস্যকে গ্রেফতারের পর এ আতঙ্ক আরও কয়েকগুন বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। যেমনটি বলেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সভাপতি বাদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘যখন সংলাপের জন্য একটি পরিবেশ তৈরী হচ্ছে, সেই মুহুর্তে এই গ্রেফতার সংলাপ এবং সমঝোতার পথে অন্তরায় হবে।’   ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গ্রেফতারের পরে সারা দেশে নাশকতা হচ্ছে। এতে সংলাপ সমঝোতার ক্ষেত্রে নেতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।’    বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এক তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘কোনো কারন ছাড়াই কেন্দ্রীয় নেতাদের আটক সংলাপের পথে অন্তরায় হবে। এর মাধ্যমে প্রমান হয় সরকার সংলাপের আন্তরিক নয়।’ বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘গ্রেফতার ঘটনা প্রমাণ করে সরকার গণবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।’ রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বিএনপি চেয়ারপারসনকে প্রধানমন্ত্রীর ফোন করার পর আশার আলো দেখতে শুরু করেছিলো দেশের মানুষ। তাদের আশা ছিলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দুই দলই নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থাতে পৌঁছাবে। কিন্তু বারবার সংলাপ ব্যর্থ হওয়ায় হতাশ হয়েছেন সাধারন মানুষ। উভয় দলের ‘অতীতপ্রীতি রীতি’ সংলাপকে অনিশ্চিত করে তুলেছে বলে মনে করছেন তারা। এদিকে শুক্রবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘হরতালে নিরীহ মানুষ খুন এবং খুনের পরিকল্পনায় জড়িত থাকায় বিএনপির তিন নেতাকে (মওদুদ আহমদ, রফিকুল ইসলাম মিঞা ও এম কে আনোয়ার) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার সংলাপের পরিবেশ নষ্ট করবে বলে মনে করেন চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল। তিনি বলেন, ‘সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে সবকিছু ফয়সালা করার চেষ্টা করছে। এভাবে সুষ্ঠু সমাধান সম্ভব নয়।’ এদিকে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ‘হরতাল ডেকে সহিংতায় উস্কানি দেয়ার অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছে।’

তবে জেষ্ঠ্য নেতাদের গ্রেফতারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এর বিরোধিতা করেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইফ জয়নাল আবদিন ফারুক। বলেন, ‘নির্যাতন করে আন্দোলন দমানো যাবে না। সংলাপে সরকারের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।’ বিএনপির আটক নেতাদের মুক্তি না দিলে আন্দোলন আরো তীব্র করা হবে বলে হুশিয়ারি করেছেন দলের যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। রাতের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘নির্যাতন করে আন্দোলন দমানো যাবে না। জনগন এর জবাব দেবে।’

সংলাপের সূচনা যেভাবে
১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। এজন্য তিনি বিরোধীদলীয় নেতার কাছে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের নামের তালিকা চান।

এর দু’দিন পর ২০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পেশাজীবীদের সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘নির্দলীয় সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়।’ পরদিন ২১ অক্টোবর হোটেল ওয়েস্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা দেন তিনি।

তার রূপরেখা অনুযায়ী, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০ জন উপদেষ্টার মধ্য থেকে বর্তমান সরকারি দল পাঁচজন এবং বিরোধী দল পাঁচজন সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন। তারাই আসন্ন নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা হবেন।

তবে তার এ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয় বলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানায় আওয়ামী লীগ।

এরপর ২২ অক্টোবর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংলাপের আয়োজন করার অনুরোধ জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে চিঠি দেন। আশরাফুল ইসলামও ফোন করেন মির্জা ফখরুলকে। চিঠির বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি। কিন্তু আবার ব্যর্থ হয় উদ্যোগ।

এরপর ২৫ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক সমাবেশে আল্টিমেটাম দেন খালেদা। বলেন, ‘২৬ অক্টোবরের মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থা না করলে ২৭ অক্টোবর থেকে টানা ৬০ ঘণ্টা হরতাল।’

তার এ আল্টিমেটামের পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় খালেদাকে ফোন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী ফোন দিলেন, গণভবনে আহ্বানও জানালেন। কিন্তু খালেদা হরতাল প্রত্যাহার করলেন না। তিনি বলেন, ‘এটা যেহেতু ১৮ দলের হরতাল, কাজেই তাদের সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে ২৮ তারিখের পর সংলাপ হতে পারে।’ বিভিন্ন শর্তে এ উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।

৭ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘সরকার শর্ত জুড়ে আলোচনার পথ রুদ্ধ করলেও আমরা এখনো সংলাপের জন্য অপেক্ষা করছি। ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব অনুযায়ী দুই দলের মহাসচিব পর্যায়ে আলোচনা শুরু করার জন্য আমরা এখনো অপক্ষো করছি। বিএনপি আশা করছে সরকার সংলাপের পথে ফিরে আসবে।’

এর একদিন পর ৮ নভেম্বর শুক্রবার রাতে বিভিন্ন অভিযোগে বিএনপির একাধিক নেতা গ্রেফতার হওয়ার পর ‘সংলাপের’ ভবিষ্যত কি হবে সেটি দেখতে অপেক্ষা করতে হবে ‘ভবিষ্যত’-এর দিকেই।