৬ আষাঢ়, ১৪২৫, বুধবার, ২০ জুন, ২০১৮, দুপুর ১:৩১
জাতীয়, ঢাকা, প্রধান খবর, সারাদেশ, স্বাস্থ্য দেশে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে আইন ও নীতিমালার বাস্তবায়ন জরুরি

দেশে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে আইন ও নীতিমালার বাস্তবায়ন জরুরি

Post by: সম্পাদক on ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮ | ১০:১২ পূর্বাহ্ণ in জাতীয়,ঢাকা,প্রধান খবর,সারাদেশ,স্বাস্থ্য

হটনিউজ ডেস্ক: অসংক্রামক রোগ বিশ্বে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর অন্যতম কারণ । ডায়াবেটিস, শ্বসনতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী রোগ (সিওপিডি), হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সারের মতো এসব অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ভয়াবহ, দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল এসব রোগের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যু না হলেও শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে দীর্ঘ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে মানুষ। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে পারলে অসংক্রামক রোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়া অসম্ভব নয়।

‘নন কমিউনিকেবল ডিজিজেস রিস্ক ফ্যাক্টর সার্ভে: বাংলাদেশ ২০১০’-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৯৮ দশমিক সাত শতাংশ মানুষ অন্তত একটি অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এছাড়া, অন্তত দু’টি অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে ৭৭ দশমিক চার শতাংশ মানুষ, অন্তত তিনটি রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন ২৮ দশমিক তিন ভাগ মানুষ।

এই গবেষণায় দেখা যায়, ১৭ দশমিক নয় ভাগ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ও তিন দশমিক ৯ ভাগ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শতকরা ৬০ শতাংশ মৃত্যু অসংক্রামক ব্যাধির কারণে হয়। বিশ্বে এ হার ৮০ শতাংশ। এই হিসাবে প্রতিবছর ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ অসংক্রামক রোগে প্রাণ হারান।বিশ্লেষকরা বলছেন, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে দেশের বিদ্যমান প্রায় আটটি নীতিমালা এবং ২১টি আইনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব আইন ও নীতিমালা সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা হলে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পৃক্ত নীতিমালাগুলো হলো— জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, জাতীয় শিশু নীতি ২০১১, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০, জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৩, জাতীয় ক্রীড়া নীতি, জাতীয় সমন্বিত বহুমাধ্যম ভিত্তিক পরিবহন নীতিমালা ২০১৩, যোগাযোগ নীতিমালা ও জাতীয় খাদ্য নীতি ২০০৬।

অন্যদিকে, এসব রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত আইনগুলো হলো— নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩; ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫; ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯; মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০; আয়োডিন অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ আইন ১৯৮৯; পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫; শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০০৬; খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০; স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা আইন) ২০০৯; জেলা পরিষদ আইন ২০০০; উপজেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮; স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ আইন) ২০০৯; ডিটেইলস এরিয়া প্ল্যানিং ড্যাপ; মোটরযান আইন ১৯৮৩; ঢাকা মহানগরী পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ ও পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২।এছাড়া, জনস্বাস্থ্য (জরুরি বিধান) অধ্যাদেশ ১৯৪৪, বাংলাদেশ হোটেল ও রেষ্টুরেন্ট অধ্যাদেশ ১৯৮২ এবং অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৫৬— এই আইনগুলোও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত।

আইন বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন  বলেন, ‘শুধু সচেতনতা বা চিকিৎসার মাধ্যমে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। এছাড়া এককভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্যকর্মীদের পক্ষে এসব রোগের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। অসংক্রামক রোগ জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস, অপর্যাপ্ত ব্যায়াম, মাদক ও তামাক ব্যবহার, পরিবেশ দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি খাদ্য, নগর অবকাঠামো, পরিবেশ, শিক্ষা, বাণিজ্য, স্বরাষ্ট্র, কৃষি প্রভৃতি বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডিপার্টমেন্ট অব এপিডেমিওলোজি অ্যান্ড রিসার্চ প্রফেসর ডা. সোহেল রেজা বলেন, ‘অসংক্রামক রোগের সঙ্গে আমাদের লাইফস্টাইল ও পরিবেশের পরিবর্তনগুলো দায়ী। এ ক্ষেত্রে তামাকের ব্যবহারের কথা বলা যায়। এ বিষয়ে আইন আছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন সেভাবে হচ্ছে না। আবার খাবারের গুণগত মান নির্ধারণ করার কথা বিএসটিআইয়ের। আমরা শহরাঞ্চলে বিভিন্ন প্রসেস ফুড থেকে লবণ পাচ্ছি। কিন্তু প্রসেস ফুডে কতটুকু পরিমাণ লবণ থাকবে, সেটা আমাদের নির্ধারণ করা নেই। তেলের ক্ষেত্রেও বলা যায়, স্যাচুরেটেড ফ্যাট আমাদের খেতে হবে। ফুড ইন্ডাস্ট্রিকে এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। ভোক্তা অধিকার আইন বা সম্পর্কিত আইনগুলোর মাধ্যমে এগুলো নিশ্চিত করা যায়। এসব বিষয়ে আমাদের ঘাটতি আছে।’

ডা. সোহেল রেজা বলেন, ‘নীতি বা আইনগুলো আমাদের লাইফস্টাইল ও আমাদের পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। এগুলো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এসব আইনের বাস্তবায়ন জরুরি।’

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের এই চিকিৎসক বলেন, ‘আমাদের শারীরিক পরিশ্রমের প্রবণতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ফলে আমাদের ওজন বাড়ছে; ডায়াবেটিস, হৃদরোগ দেখা দিচ্ছে। শহরগুলোতে জায়গার অভাব, গ্রামাঞ্চলে জায়গার অভাব না থাকলেও পরিশ্রমে অনীহা আছে মানুষের। এসব বিষয়ে পরিকল্পনা দরকার।’

অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে নীতিমালা ও আইনের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. সোহেল রেজা বলেন, ‘অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে সবগুলো নীতিমালারই ভূমিকা আছে। এমনকি ক্রীড়া নীতিরও প্রয়োজন আছে। স্কুল-কলেজে আদৌ পিটি ঘণ্টা মেনে চলা হচ্ছে কিনা, সেটা দেখা দরকার। আবার ধূলা নিবারণের নীতিমালা আছে। এটা বাস্তবায়ন করে কেবল শীতকালের ধূলা নিবারণ করতে পারলেও ফুসফুসের রোগ অনেক কমে যেত। এমনভাবে সব নীতিমালা ও আইন বাস্তবায়ন হলে সব অসংক্রামক রোগই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

তবে আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানোর দিকে জোর দিলেন হেলথ রাইটস মুভমেন্ট ন্যাশনাল কমিটির প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. রশীদ-ই-মাহবুব। তিনি  বলেন, ‘সংক্রামক রোগের সঙ্গে দারিদ্রের সম্পর্ক আছে, অসংক্রামক রোগের সঙ্গে উন্নয়নের। আমরা এখন যেহেতু উন্নতির দিকে যাচ্ছি, তাই আমাদের অসংক্রামক রোগ বাড়ছে। সুস্থ জীবনধারা ও পরিবেশের জন্য আমাদের অনেকগুলো আইন আছে। কিন্তু এগুলোর প্রয়োগ দরকার। আর সচেতনতাও একটি বড় বিষয়। মানুষকে সচেতন না করে সব আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজ, গণমাধ্যম, এনজিও, সরকার, সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা থাকতে হবে।’

ডা. রশীদ আরও বলেন, ‘নগরজীবনে অসংক্রামক রোগ বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ, শহরে মাঠ নেই। শিশুদের স্কুল আছে, কিন্তু খেলার সুযোগ নেই। সাধারণভাবে হাঁটার পথ নেই। ঢাকা শহরের শব্দ দূষণ, ধূলা— এগুলো প্রতিরোধ করতে সচেতন হতে হবে, বিনিয়োগও লাগবে। অসংক্রামক রোগের আরেকটি মূল কারণ খাদ্য। কীভাবে সবার জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করা যাবে, সেটা নিয়েও কাজ করতে হবে।’

রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. রশীদ বলেন, ‘অসংক্রামক রোগগুলো প্রাথমিক পর্যায়েই নির্ণয় করাটা জরুরি। কারণ অনেক রোগের চিকিৎসাই অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সবকিছু আইন দিয়ে সম্ভব না। সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও দায়িত্ব নিতে হবে। কিছু কিছু বিষয় আছে, আইন দিয়ে করতে গেলে এখন শুরু করলেও ২০ বছর লাগবে। মূল কথা হলো— সমাজের মানুষ যদি না বুঝে যে এটা তার জন্য ক্ষতিকর, তাহলে কিছুই হবে না। এ জায়গাটায় আমাদের দুর্বলতা আছে এবং এ খাতে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ খুবই কম।’

হটনিউজ24বিডি.কম/ জাতীয়,সারাদেশ,ঢাকা,প্রধান খবর,সারাদেশ,স্বাস্থ্য/১০-০২-২০১৮/সম্পাদক

হটনিউজ24বিডি.কম কর্তৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত. হটনিউজ24বিডি.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, অডিও কনটেন্ট হটনিউজ24বিডি.কম এর পূর্বানুমতি ব্যতীত ব্যবহার করা কপিরাইট আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

Comments

পাঠক আপনার মতামত দিন ।পাঠকের মন্তব্যের জন্য সম্পাদক দায়ি নন ।


comments

Comment