অপরাধ বরিশাল

জনতা ও রুপালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ

images (16)  মোঃ সাইফুল ইসলাম মিরাজ, বরগুনা:  রগুনায় ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আওতায় এককালীন টাকা পরিশোধে সংশ্লিষ্ট ব্যংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মীদের অভিযোগ, কোন প্রকার চার্জ/ফি ও নুন্যতম স্থিতি রাখা ছাড়াই দু’বছরে সুদসহ এককালীন ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেয়ার কথা। কিন্তু, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো অনেকেই গ্রাহকদের হিসাব বুুঝিয়ে না দিয়ে খেয়াল খুশিমত চেকে টাকার অংক লিখে দিয়ে হিসাব বন্ধ করে দিচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে জনতা ব্যংক গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা কেটে রাখারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।  বরগুনা সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিস সূত্রে জানিয়েছে, ২০০৯-১০ অর্থ বছরে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় বেকার যুবক ও যুব মহিলাদের কর্মসংস্থানের জন্য ন্যাশনাল সার্ভিস’ প্রকল্প শুরু করে। এর আওতায় বরগুনায় সদর উপজেলায় মোট ৩ হাজার ২১৪ জন বেকার যুবক ও যুব মহিলা’র কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। চারটি আলাদা ব্যাচে এদের প্রশিক্ষন শেষে সরকারি আধা সরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহযোগীতামূলক কাজে দু’ বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। কর্মীরা যাতে চাকরী শেষে কিছু পুঁজি করতে পারে সে কারণে নির্ধারিত ৬ হাজার বেতনের বাধ্যতামুলক ২ হাজার টাকা জমা রেখে বাকী টাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা রেখে জনতা, রুপালী ও কৃষি ব্যাংকে হিসাব খোলা হয়। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকে ১ হাজার ৬’শ ৭১জন, রুপালী ব্যাংকে ৭’শ ৮৭ ও কৃষি ব্যাংকে ৭’শ ৫৬জনের সঞ্চয় হিসাব খোলা হয়। মঙ্গলবার সকালে জনতা ব্যাংক বরগুনা কার্যালয়ে গিয়ে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মীদের ভীড় দেখা যায়। ইসমাইল হোসেন নামের ন্যাশনাল সার্ভিসের একজন কর্মী বলেন, গত দু’বছরে আমার এনএস/১৪৯ নং একাউন্টে প্রতিমাসে ২ হাজার টাকা হিসাবে ৪৮ হাজার টাকা জমা হয়। আমি আমার টাকা তুলতে গেলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপক আমাকে ৪৭ হাজার ৭’শ টাকা পরিশোধ আমাকে কোন প্রকার হিসাব বুঝিয়ে না দিয়েই চেক রেখে দেন। একই অভিযোগ রেজাউল বাসার সোহাগ নামের অপর একজন কর্মীর। রেজাউল বাসার প্রতিবেদকের সামনেই ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের কাছে তার হিসাব বুঝিয়ে দিতে বলেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মাহমুদা খাতুন, রেজাউলের চেক ফেরৎ দেয়ার নির্দেশ দিয়ে পরে যোগাযোগ করতে বলেন। এসময় বেশ কয়েকজন ন্যাশনাল সার্ভিস গ্রাহক তাদের চেক রেখে দেয়ার বিষয়টি জানালে তিনি চেক কর্মীদের চেক ফেরত দিয়ে পরে যোগাযোগ করতে বলেন। এছাড়াও ওই ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাব নং এনএস/৩৩ আখি আক্তার, এনএস/৬ এর মাসুদ, এনএস/৬৬০ এর আকলিমাসহ বেশ কয়েকজন গ্রাহকের ব্যালান্স শিটে দেখা যায়, ২৯/১২/২০১২ তারিখে তাদের একাউন্ট থেকে মেইনটেইনেন্স চার্জ বাবদ ১০০ ও মেইনটেইনেন্স চার্জেও ভ্যাট বাবদ ১০ টাকা, একই হারে ৩০/০৬/১২ তারিখে টাকা কেটে নেয়া হয়েছে। ব্যংকের নিয়মানুসারে জুন ও ডিসেম্বর মাসের একই তারিখে গ্রাহকের সঞ্চয়ের বিপরীতে সুদ জমা হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মীদের চার্জ/ফি কাটা যাবেনা, এমনকি নুন্যতম স্থিতি রাখারও বাধ্যবাধকতা আরোপ না করে সুদসহ দু’বছরের জমা সব টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশনা অমান্য করে টাকা কেটে নেয়া বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পাওয়ার আগেই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে কম্পিউটারে ওই টাকা কাটা হয়েছে, পরে কর্তনকৃত টাকা হিসাবে যোগ করা হয়নি বলে তিনি জানান। হিসাব বুঝিয়ে না দিয়ে কেন চেক রেখে দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, চেক রেখে দেয়ার বিষয়টি তার জানা ছিলনা। ইতোমধ্যেই যেসব গ্রাহকের চেক রেখে দেয়া হয়েছে তাদের অক্টোবরের মধ্যে খবর দিয়ে হিসেব বুঝিয়ে দেয়া হবে তিনি জানান। স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা কাটা হলেও সুদ জমা না হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে তিনি কোন সদুত্তর না দিয়ে এসব টাকা যোগ করে ফেরৎ দেয়া হবে তিনি জানান। ন্যাশনাল সার্ভিসের ২য় ব্যাচের কর্মী রাবেয়া আক্তার বলেন, যুব উন্নয়নের ছাড়পত্র নিয়ে আমার জমাকৃত টাকা উত্তোলন করার জন্য রুপালী ব্যাংকে যোগাযোগ করলে ব্যাংক আমাকে ফটোকপির দোকান থেকে একটি ফরম কিনে পূরন করে জমা দিতে বলে। ওই ফরম ও ছাড়পত্র জমা দেয়ার পর ব্যাংকের সেকেন্ড অফিসার আমার নিজেই চেকে ৪৮ হাজার ৭’শ টাকা লিখে দেন। টাকা উত্তোলন করার পর আমার চেকটি তিনি ছিড়ে ফেলেন। পরে আমি বুঝতে পারি ফরমটি ছিল হিসাব বন্ধের আবেদন। আমাদের কোন প্রকার হিসাব বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। ব্যাংকের এ ধরনের প্রতারনামুলক আচরনে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অপর এক কর্মী তানিয়া আক্তার বলেন, আমাদের প্রত্যেকের বেলায়’ই একই আচরণ করা হয়েছে। রুপালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মীদের হিসাব থেকে টাকা কর্তন না করলেও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নির্দেশনা অমান্য করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের যুউঅ/যুব-২/ন্যাশনাল সার্ভিস-৪/ ২০০৯ এর স্মারক অনুসারে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মীদের প্রতিমাসের বেতন থেকে বাধ্যতামূলক ২০০/- টাকা জমা রাখার নির্দেশনা থাকলেও রুপালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ উল্টো প্রতিমাসে বাধ্যতামূলক চার হাজার টাকা পরিশোধ করে বাকী টাকা জমা রেখেছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মিসেস সামসুন্নাহারের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা গ্রাহকদের প্রতিমাসে ৪হাজার করে টাকা পরিশোধ করেছি। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নির্দেশনা অমান্য করে কেন উল্টো চার হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যুব উন্নয়নের নির্দেশনা অনুসারেই আমরা টাকা পরিশোধ ও জমা করেছি। এসময় নির্দেশনার কাগজ দেখাতে চাইলে তিনি কাগজ ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলেন, এ নির্দেশনার আমার দেখার প্রয়োজন নেই। আমি এসব দেখেছি। বুঝিয়ে না দিয়ে একাউন্ট বন্ধ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা হিসাব বুঝিয়েই গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করেছি। ৪র্থ ব্যাচের কর্মী খালিদ হোসেন ও সাইফুল ইসালামের একাউন্ট কৃষি ব্যাংকে। তারা জানান, কৃষি ব্যাংক আমাদের ৪৯ হাজার ৪৬ টাকা জমা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক আমাদের ৪৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছে। বাকী টাকা একসপ্তাহ পরে এসে নিয়ে যেতে বলেছেন। এ ক্ষেত্রে তারা কৃষি ব্যংকের বিরুদ্ধে কোন অনিয়মের অভিযোগ করেননি। বরগুনা সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা বিভাষ কুমার বলেন, ন্যাশনাল সার্ভিস বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র একটি অগ্রাধিার প্রকল্প। এ কারনেই কর্মীদের হিসাব থেকে যাতে কোন প্রকার ফি/চার্জ কর্তন না করা হয় সে ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়াও কর্মসূচির মেয়াদ শেষে গ্রাহকদের প্রতিমাসের সঞ্চয় দু’হাজার হিসেবে ৪৮হাজার টাকা নূন্যতম স্থিতি না রেখে সুদসহ ফেরত দেয়ার বাংলদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা আমি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কাছে দিয়ে দিয়েছি। এরপরও যদি তারা কোনপ্রকার চার্জ/ফি কেটে নেয় এটা স্পষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য। বিষয়টি তিনি ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান।