অর্থ ও বাণিজ্য কৃষি ঢাকা

ময়মনসিংহে হ্যাচারীতে জাল দিয়ে মাছ ধরছেন চার চাষী

mach20130921222656  জেলা প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ, ২২ সেপ্টেম্বর:  ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পুলিয়ামারী গ্রামের হাজী তাহের উদ্দিনের ছেলে নুরুল হক ১৯৯০ সালে সুদে ৩০ হাজার টাকা এবং ৩ একর জমি লিজ নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। তার ব্রহ্মপুত্র হ্যাচারিতে প্রথমে রুই মাছের রেনু উৎপাদন করা হতো। ১৯৯৮ সালে দেশি শিং-মাগুর মাছের রেনু উৎপাদন শুরু করেন। এরপর নুরুল হক থাই কৈ মাছের পোনা উৎপাদনের চেষ্টা করেন এবং ২০০৩ সালে সফল হন। ২০১০ সালে মনোসেক্স তেলাপিয়ার উন্নত জাত সুপার পুরুষের (ওয়াই ওয়াই) পোনা উৎপাদন শুরু করেছেন। নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় একই ঋণ নিয়ে শুরু করেছিলেন। এখন তার খামারে আজ ৩০-৩৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। শহরের জিলা স্কুল মোড়ে ৫ তলা বাড়ি বানিয়েছেন নুরুল হক। গ্রামে কিনেছেন প্রায় ২০ একর ফসলি জমি। ছেলে-মেয়েদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। অথচ মাত্র ২০ বছর আগে নুরুল হকের তেমন কিছু ছিলো না। নুরুল হক ময়মনসিংহের আরও অনেকের মতো একজন সফল মৎস্য চাষী। তিনি মৎস্য চাষে অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন চারবার জাতীয় পুরস্কার। এতো শুধু একজন নুরুল হকের গল্প। এমন অনেক নুরুল হক আছেন ময়মনসিংহে। ভুরি ভুরি সফল যুবকের গল্প বলা যাবে, যারা একদিন বেকারেত্বের ঘানি টানতে টানতে হতাশ ছিলেন। ভালুকা-গফরগাঁও রাস্তা লাগোয়া দক্ষিণ রাংচাপড়া গ্রামের যে দিকেই চোখ যায়, দেখা যাবে বিশালাকৃতির পুকুর আর পুকুর। জেলার সদর, ভালুকা, ত্রিশাল, গৌরীপুর, ফুলপুর, তারাকান্দা, ঈশ্বরগঞ্জ, মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া উপজেলার এ সব পুকুরে বছর জুড়ে চাষ করা হচ্ছে পাঙ্গাস, কৈ, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এ দৃশ্য জেলার ১৩টি উপজেলার সহস্রাধিক গ্রামে। এ সব গ্রামের অধিকাংশ ধানের জমি পুকুর কেটে মাছ চাষের উপযোগী করা হয়েছে। গত কয়েক বছরে জেলায় নীরবে ঘটে গেছে মৎস্য বিপ্লব। হাজার, হাজার যুবক বেকারত্ব ঘুচিয়ে আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন করেছে। ক্রম বর্ধমান এ মৎস্য চাষ জনগোষ্ঠীর অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে রাখছে অসামান্য অবদান। জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় বছরে ২ লাখ ৭০ হাজার ২শ’ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। জেলায় মাছের চাহিদা ১ লাখ ৫ হাজার ৭শ’ ৫১ মেট্রিক টন। সেই হিসাবে জেলার চাহিদা মিটিয়ে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪শ’ ৪৯ মেট্রিক টন মাছ দেশের অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে। মাছ চাষে বিপ্লব ঘটানোয় মাছ চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাচারি, খামার মালিক ও কর্মচারি, জমির মালিক, পরিবহণ কর্মচারি, মাছের খাদ্য ব্যবসা ও মাছ ব্যবসার বিভিন্ন পর্যায় ও ধাপে জড়িত এখানকার পঞ্চাশ ভাগ বাসিন্দারা। কয়েক বছর আগেও জেলায় হ্যাচারি ছিল হাতে গোনা। বর্তমানে এর সংখ্যা ১শ’ ১১টি। এসব হ্যাচারি থেকে মৌসুমে প্রায় পৌনে ২ লাখ কেজি রেনু উৎপাদন হয়। প্রথমদিকে শুধু দেশীয় জাতের মাছের রেনু উৎপাদন করা হতো। এখন দেশীয় রেনুর পাশাপাশি থাই পাঙ্গাস, থাই কৈ, দেশি শিং, মাগুর, মনোসেক্স তেলাপিয়া, মলা, টেংরা, গুলশা মাছের রেনু উৎপাদন। আর এসব রেনুর চাহিদা বৃহত্তর ময়মনসিংহের চাহিদা মিটিয়ে সিলেট, চট্রগ্রাম, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জোগান দেয়া হয়। এ রেনুর ওপর ভিত্তি করে জেলায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৮০০ নার্সারী এবং ৬ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক মৎস্য খামার। এ সব বাণিজ্যিক খামার থেকে প্রায় পৌনে তিন লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। এসব খামারে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজার হাজার মানুষের। খামারিরা সাধারণত পুকুর, খাল-বিল, পরিত্যক্ত জলাশয়, খাস পুকুর, ধানের জমি লিজ নিয়ে সেগুলো মাছ চাষের উপযোগী করেন। এ অঞ্চলে পাঙ্গাস মাছের চাষ সবচেয়ে বেশি হয়। ৪ হাজারেরও বেশি মৎস্য চাষী ৫ হাজার হেক্টর আয়তনের খামারে পাঙ্গাস মাছের চাষ করেন। সেখান থেকে বছরে উৎপাদন হয় প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন পাঙ্গাস। পাশাপাশি কৈ, শিং, মাগুর ও তেলাপিয়ার চাষ হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর খামারে। যেখানে বছরে ১১ হাজার ৭শ ২২ মেট্রিক টন তেলাপিয়া, ২০ হাজার ৪শ’ ৬০ মেট্রিক টন কৈ, ৫ হাজার ৯শ’ ৯৯ মেট্রিক টন শিং-মাগুর উৎপাদন হয়।

এছাড়া, জেলায় ৩ হাজারেরও বেশি ধানক্ষেতে মাছ চাষ খামার রয়েছে। যার থেকে বছরে প্রায় ৮শ’ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। যেসব যুবকেরা বেকার হয়ে চাকরির সন্ধানে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, তাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য মাছ চাষের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রবল ইচ্ছাশক্তি, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সরকারের সহযোগিতা থাকলে যে কেউ মৎস্য চাষ, হ্যাচারি ব্যবসায় সফল হতে পারেন। সরকারের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীন সারা বছর মৎস্য চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যে কেউ জেলা বা উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসে যোগযোগ করে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। প্রশিক্ষণ শেষে এখান থেকে ৩০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোন নেয়ার সুযোগ আছে। mach20130921222656নুরুল হক বলেন, মৎস্যখাতের উন্নয়নে শিক্ষিত যুবকদের এগিয়ে আসা দরকার। এজন্য প্রয়োজন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাবার ব্যবস্থা। তাহলে নিজের আত্মকর্মসংস্থানের পাশাপাশি অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।