জাতীয় প্রধান খবর রাজনীতি

রাজনীতির বায়ুও সংসদের আয়ু

Parlament-ec-sm20130906175306আছাদুজ্জামান, হটনিউজ২৪বিডি.কম,ঢাকা: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি সংবিধান সম্মতভাবেই নির্বাচন হবে বলে নির্বাচন নিয়ে তাঁর ও সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।এদিকে, বিরোধীদলের দাবি, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন। তবে তারা সরকারের নামের বিষয়ে কিছুটা ছাড় দিয়েছে। এখন তাদের সাফ কথা-নাম যাই হোক নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন।

কিন্তু নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা কি হবে সে ব্যাপারে বিরোধীদলের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আমরা এখনো দেখিনি।নির্দলীয় সরকার বলতে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা সেরকম কিছু একটা হতে পারে। এছাড়া নির্দলীয় সরকারের আর কোনো নমুনা আমাদের জানা নেই। কারণ, নির্দলীয় সরকার বলতে বোঝায়, যে সরকারের সদস্যরা কোনো দলের সদস্য নন। সেটা কেবল অনির্বাচিত লোকদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হলেই সম্ভব।

আবার সংসদের স্বতন্ত্র সদস্যদের নিয়ে সরকার গঠিত হলেও সেটি নির্দলীয় সরকার হতে পারে।কাজেই নির্দলীয় সরকার দুইভাবে হতে পারে। সরকার সম্ভবত প্রথমোক্ত পদ্ধতির (অনির্বাচিত ও নির্দলীয়) অধীনেই নির্বাচন চায়। কিন্তু বর্তমান সংবিধানের আলোকে সেটি আর সম্ভব নয়। সংবিধান সংশোধন হলেই কেবল তা হতে পারে।সংবিধান অনুযায়ী, স্বতন্ত্র ও নির্দলীয় নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে যেমন সরকার গঠিত হতে পারে তেমনি সব দলের সদস্যদের নিয়েও একটি অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার হতে পারে। সে সরকারে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্যরাও থাকতে পারেন।কিন্তু বিএনপি কি এতেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে?

নির্দলীয় বলতে বিরোধীদল কি আসলে নির্দলীয়ই বোঝাচ্ছে না সর্বদলীয় সরকারও বোঝাচ্ছে তা পরিষ্কার নয়।ব্যারিস্টার রফিকুল হকও সর্বদলীয় বা যৌথ সরকারের কথা বলেছেন। সেটি হলে নির্বাচনের আকাশে যে অনিশ্চয়তা আছে তা নিমিষেই কেটে যাবে।আমরাও একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। বর্তমান সংবিধানের আলোকেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। কারণ, যেভাবেই বলি না কেন, নির্বাচন করবে সরকার। সে নির্বাচন তত্ত্বাবধান করবে নির্বাচন কমিশন। তাই সরকারের সদিচ্ছা থাকলে দলীয় সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতায় বিএনপি সে ঝুঁকি নেবে কেন? ক্ষমতায় থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন করা যে কতো কষ্টকর সেটা বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়েই জানে।তবে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো, সংবিধানের আলোকে সব দলের জন্য নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা। কারণ, তত্ত্বাবধায়কের দাবির মূলে বিরোধীদলের সরকারের প্রতি অনাস্থা ও অবিশ্বাসের কথাটিই নিহিত। সে আস্থা ইতিপূর্বে বিএনপিও সৃষ্টি করতে পারেনি। সে কারণেই ’৯৬-এ আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়কের দাবি। কিন্তু বাস্তবতা হলো ৯৬-এর সে অনাস্থার জায়গাটি আজো আস্থা দিয়ে পূরণ করা যায়নি।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নতুন একটি ফর্মুলা দেওয়া হলো আমাদের সংবিধানে। সেটি হচ্ছে, জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা। সাংবিধানিকভাবে ও বাস্তবতার নিরিখে সংসদ বহাল রেখে বা সংসদ বলবৎ থাকাকালীন নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কোনোভাবেই সম্ভব নয়।আমি পৃথিবীর অনেকগুলো দেশের সংবিধান পাঠ করে দেখেছি। সংসদ বহাল রেখে বা সংসদের মেয়াদ পূর্তির আগেই (সব সুযোগ সুবিধা বহাল রেখে) নির্বাচন করার বিধানটি কোথাও পাইনি। অন্ততঃ সংবিধানের মডেল হিসেবে যে ১০-১২টি দেশের সংবিধানকে ধরা হয় তাদের কোথাও এরকম বিধান নেই।

এটি শুধু বিরোধীদলের জন্য অসুবিধার কারণ তাই নয়; যারা সংসদ সদস্য নন তাদের সবার জন্যই বিব্রতকর। কারণ, সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যেও অনেকেই আছেন যারা হয়তো নির্বাচন করবেন কিন্তু তারা সংসদ সদস্য নাও হতে পারেন। সেটি স্বয়ং সরকারের জন্যও বিব্রতকর। সরকারের জন্য সেটি অনেক ক্ষেত্রে পরাজয়েরও কারণ হতে পারে।

ধরুন, সংসদ বহাল থাকাকালীন যদি কোনো এমপি নির্বাচন করার জন্য সরকারি দলের মনোনয়োন না পান তাহলে তিনি সরকার মনোনীত প্রার্থীকে কতটুকু স্থানীয়ভাবে সাহায্য করবেন সেটি একটি বাস্তব প্রশ্ন। নির্বাচনকালীন এ রসায়নটি সরকার ও বিরোধীদল উভয়ের জন্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা দেখেছি সরকারি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করে ব্যর্থ হয়ে তারা দলের মনোনীত প্রার্থীকে স্থানীয় নির্বাচনের সহায়তা করেননি। গাজীপুরের নির্বাচনে জাহাঙ্গীর সাহেবকে আমরা সে রকম ভূমিকাই পালন করতে দেখেছি। আর সরকার বর্তমান সংসদের সব সদস্যকেই নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দেবে সেটি নিশ্চয় হবে না।অন্যদিকে, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করলে নির্বাচনকালে প্রধানমন্ত্রীসহ তাঁর অধীনস্ত সব মন্ত্রীরা সরকারি সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। সংবিধান অনুযায়ী তাতে কোনো বাধা নাই।Parlament-ec-sm20130906175306সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যেও যদি নির্বাচন হয় সেক্ষেত্রেও তারা সব সুযোগ সুবিধা পাবেন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংশ্লিষ্ট ধারাতেও তাদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের তেমন কোনো বিধান নেই।

নির্বাচন কমিশন থেকেও এমপি-মন্ত্রীদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে আমাদের জানা নাই। কাজেই সংবিধানের বিদ্যমান ধারাটি সব অনির্বাচিত প্রার্থীদেরকেই অসুবিধায় ফেলবে।

তাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য কেবল ক্ষমতা খর্ব করাই নয়; তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ, তারা একান্ত সচিব বা সহকারী একান্ত সচিব রাখতে পারবেন কিনা ইত্যাদি- এ বিষয়গুলোরও সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী যদিও বলেছেন, অন্তবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী বা অন্যকোনো মন্ত্রী নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। তারা কেবল দৈনন্দিন কাজ করে যাবেন।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশটি কেবল তার নীতিগত সিদ্ধান্তই হতে পারে। কারণ, সংবিধান বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই।

আর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বা না করার ওপর নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নির্ভর করে না। প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।

তবে, সরকার যদি সদিচ্ছা পোষণ করে তবে ৫৬ অনুচ্ছেদের অনুসরণ করে সব দলকে (যাদের সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধি আছে) আস্থায় নিয়ে আগামী নির্বাচন করতে পারে।

৫৬ অনুচ্ছেদে আছে, সংসদ ভেঙে যাওয়ার কারণে এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা অন্যকোনো প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নিয়োগের প্রয়োজন হলে যারা সংসদ সদস্য ছিলেন তাদের সংসদ সদস্য হিসেবে বিবেচনা করে সেখান থেকে নিয়োগ দিতে হবে। কাজেই আমরা নির্বাচিতদের নিয়ে সর্বদলীয় সরকার গঠন করতে পারি। সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে যায়।

কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। নির্বাচনকালীন আচরণবিধিটি তো নির্বাচিত সদস্যদের (সরকার ও বিরোধীদলীয়) নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা প্রদান করেছে। জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের আচরণবিধি কেমন হবে তা বলা নেই। তাদের আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণের কোনো বিধান নেই, নজির তো নেই-ই। যদিও উপ-নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের প্রচারণার কাজে সামান্য নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা বলা আছে।

এখানে আরো বলে রাখা ভালো, সংবিধানে সরকারের মেয়াদ বলতে কোনো কথা নেই। আছে কেবল সংসদের মেয়াদ। সরকারের ক্ষমতায় থাকা না থাকা নির্ভর করে সংসদের ওপর। সংসদীয় গণতন্ত্রে এটাই স্বাভাবিক। সংবিধানের ৭২ (৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভাঙ্গিয়া না দিয়া থাকিলে প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসর অতিবাহিত হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবে।’

কিন্তু আমাদের দেশে সংসদ ভেঙে গেলেও সবকিছু আগের মতোই বহাল থাকবে। শুধু অধিবেশন বসবে না। যেনো কিছুই ঘটেনি। এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি নয়। কিন্তু তাই বলে বিরোধীদলের সবকিছু গেলো গেলো বলে যে হাহাকার তাও অন্তঃসারশূন্য।
রাজনীতির বায়ুও সংসদের আয়ু
আছাদুজ্জামান, হটনিউজ২৪বিডি.কম,ঢাকা:
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি সংবিধান সম্মতভাবেই নির্বাচন হবে বলে নির্বাচন নিয়ে তাঁর ও সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।

এদিকে, বিরোধীদলের দাবি, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন। তবে তারা সরকারের নামের বিষয়ে কিছুটা ছাড় দিয়েছে। এখন তাদের সাফ কথা-নাম যাই হোক নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন।

কিন্তু নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা কি হবে সে ব্যাপারে বিরোধীদলের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আমরা এখনো দেখিনি।

নির্দলীয় সরকার বলতে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা সেরকম কিছু একটা হতে পারে। এছাড়া নির্দলীয় সরকারের আর কোনো নমুনা আমাদের জানা নেই। কারণ, নির্দলীয় সরকার বলতে বোঝায়, যে সরকারের সদস্যরা কোনো দলের সদস্য নন। সেটা কেবল অনির্বাচিত লোকদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হলেই সম্ভব।

আবার সংসদের স্বতন্ত্র সদস্যদের নিয়ে সরকার গঠিত হলেও সেটি নির্দলীয় সরকার হতে পারে।

কাজেই নির্দলীয় সরকার দুইভাবে হতে পারে। সরকার সম্ভবত প্রথমোক্ত পদ্ধতির (অনির্বাচিত ও নির্দলীয়) অধীনেই নির্বাচন চায়। কিন্তু বর্তমান সংবিধানের আলোকে সেটি আর সম্ভব নয়। সংবিধান সংশোধন হলেই কেবল তা হতে পারে।

সংবিধান অনুযায়ী, স্বতন্ত্র ও নির্দলীয় নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে যেমন সরকার গঠিত হতে পারে তেমনি সব দলের সদস্যদের নিয়েও একটি অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার হতে পারে। সে সরকারে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্যরাও থাকতে পারেন।

কিন্তু বিএনপি কি এতেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে?
নির্দলীয় বলতে বিরোধীদল কি আসলে নির্দলীয়ই বোঝাচ্ছে না সর্বদলীয় সরকারও বোঝাচ্ছে তা পরিষ্কার নয়।

ব্যারিস্টার রফিকুল হকও সর্বদলীয় বা যৌথ সরকারের কথা বলেছেন। সেটি হলে নির্বাচনের আকাশে যে অনিশ্চয়তা আছে তা নিমিষেই কেটে যাবে।

আমরাও একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। বর্তমান সংবিধানের আলোকেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। কারণ, যেভাবেই বলি না কেন, নির্বাচন করবে সরকার। সে নির্বাচন তত্ত্বাবধান করবে নির্বাচন কমিশন। তাই সরকারের সদিচ্ছা থাকলে দলীয় সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতায় বিএনপি সে ঝুঁকি নেবে কেন? ক্ষমতায় থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন করা যে কতো কষ্টকর সেটা বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়েই জানে।

তবে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো, সংবিধানের আলোকে সব দলের জন্য নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা। কারণ, তত্ত্বাবধায়কের দাবির মূলে বিরোধীদলের সরকারের প্রতি অনাস্থা ও অবিশ্বাসের কথাটিই নিহিত। সে আস্থা ইতিপূর্বে বিএনপিও সৃষ্টি করতে পারেনি। সে কারণেই ’৯৬-এ আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়কের দাবি। কিন্তু বাস্তবতা হলো ৯৬-এর সে অনাস্থার জায়গাটি আজো আস্থা দিয়ে পূরণ করা যায়নি।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নতুন একটি ফর্মুলা দেওয়া হলো আমাদের সংবিধানে। সেটি হচ্ছে, জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা। সাংবিধানিকভাবে ও বাস্তবতার নিরিখে সংসদ বহাল রেখে বা সংসদ বলবৎ থাকাকালীন নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

আমি পৃথিবীর অনেকগুলো দেশের সংবিধান পাঠ করে দেখেছি। সংসদ বহাল রেখে বা সংসদের মেয়াদ পূর্তির আগেই (সব সুযোগ সুবিধা বহাল রেখে) নির্বাচন করার বিধানটি কোথাও পাইনি। অন্ততঃ সংবিধানের মডেল হিসেবে যে ১০-১২টি দেশের সংবিধানকে ধরা হয় তাদের কোথাও এরকম বিধান নেই।

এটি শুধু বিরোধীদলের জন্য অসুবিধার কারণ তাই নয়; যারা সংসদ সদস্য নন তাদের সবার জন্যই বিব্রতকর। কারণ, সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যেও অনেকেই আছেন যারা হয়তো নির্বাচন করবেন কিন্তু তারা সংসদ সদস্য নাও হতে পারেন। সেটি স্বয়ং সরকারের জন্যও বিব্রতকর। সরকারের জন্য সেটি অনেক ক্ষেত্রে পরাজয়েরও কারণ হতে পারে।

ধরুন, সংসদ বহাল থাকাকালীন যদি কোনো এমপি নির্বাচন করার জন্য সরকারি দলের মনোনয়োন না পান তাহলে তিনি সরকার মনোনীত প্রার্থীকে কতটুকু স্থানীয়ভাবে সাহায্য করবেন সেটি একটি বাস্তব প্রশ্ন। নির্বাচনকালীন এ রসায়নটি সরকার ও বিরোধীদল উভয়ের জন্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা দেখেছি সরকারি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করে ব্যর্থ হয়ে তারা দলের মনোনীত প্রার্থীকে স্থানীয় নির্বাচনের সহায়তা করেননি। গাজীপুরের নির্বাচনে জাহাঙ্গীর সাহেবকে আমরা সে রকম ভূমিকাই পালন করতে দেখেছি। আর সরকার বর্তমান সংসদের সব সদস্যকেই নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দেবে সেটি নিশ্চয় হবে না।

অন্যদিকে, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করলে নির্বাচনকালে প্রধানমন্ত্রীসহ তাঁর অধীনস্ত সব মন্ত্রীরা সরকারি সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। সংবিধান অনুযায়ী তাতে কোনো বাধা নাই।

সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যেও যদি নির্বাচন হয় সেক্ষেত্রেও তারা সব সুযোগ সুবিধা পাবেন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংশ্লিষ্ট ধারাতেও তাদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের তেমন কোনো বিধান নেই।

নির্বাচন কমিশন থেকেও এমপি-মন্ত্রীদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে আমাদের জানা নাই। কাজেই সংবিধানের বিদ্যমান ধারাটি সব অনির্বাচিত প্রার্থীদেরকেই অসুবিধায় ফেলবে।

তাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য কেবল ক্ষমতা খর্ব করাই নয়; তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ, তারা একান্ত সচিব বা সহকারী একান্ত সচিব রাখতে পারবেন কিনা ইত্যাদি- এ বিষয়গুলোরও সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী যদিও বলেছেন, অন্তবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী বা অন্যকোনো মন্ত্রী নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। তারা কেবল দৈনন্দিন কাজ করে যাবেন।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশটি কেবল তার নীতিগত সিদ্ধান্তই হতে পারে। কারণ, সংবিধান বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই।

আর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বা না করার ওপর নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নির্ভর করে না। প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।

তবে, সরকার যদি সদিচ্ছা পোষণ করে তবে ৫৬ অনুচ্ছেদের অনুসরণ করে সব দলকে (যাদের সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধি আছে) আস্থায় নিয়ে আগামী নির্বাচন করতে পারে।

৫৬ অনুচ্ছেদে আছে, সংসদ ভেঙে যাওয়ার কারণে এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা অন্যকোনো প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নিয়োগের প্রয়োজন হলে যারা সংসদ সদস্য ছিলেন তাদের সংসদ সদস্য হিসেবে বিবেচনা করে সেখান থেকে নিয়োগ দিতে হবে। কাজেই আমরা নির্বাচিতদের নিয়ে সর্বদলীয় সরকার গঠন করতে পারি। সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে যায়।

কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। নির্বাচনকালীন আচরণবিধিটি তো নির্বাচিত সদস্যদের (সরকার ও বিরোধীদলীয়) নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা প্রদান করেছে। জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের আচরণবিধি কেমন হবে তা বলা নেই। তাদের আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণের কোনো বিধান নেই, নজির তো নেই-ই। যদিও উপ-নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের প্রচারণার কাজে সামান্য নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা বলা আছে।

এখানে আরো বলে রাখা ভালো, সংবিধানে সরকারের মেয়াদ বলতে কোনো কথা নেই। আছে কেবল সংসদের মেয়াদ। সরকারের ক্ষমতায় থাকা না থাকা নির্ভর করে সংসদের ওপর। সংসদীয় গণতন্ত্রে এটাই স্বাভাবিক। সংবিধানের ৭২ (৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভাঙ্গিয়া না দিয়া থাকিলে প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসর অতিবাহিত হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবে।’

কিন্তু আমাদের দেশে সংসদ ভেঙে গেলেও সবকিছু আগের মতোই বহাল থাকবে। শুধু অধিবেশন বসবে না। যেনো কিছুই ঘটেনি। এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি নয়। কিন্তু তাই বলে বিরোধীদলের সবকিছু গেলো গেলো বলে যে হাহাকার তাও অন্তঃসারশূন্য।