চট্টগ্রাম জাতীয় প্রধান খবর হটনিউজ স্পেশাল

হুমকির মুখে চাঁদপুর- শরীয়তপুর ফেরি চলাচল

image_45991_0শাহ মোহাম্মদ মাকসুদুল আলম, চাঁদপুর:  চাঁদপুরে আবার ব্যাপক নদী ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। স্রোতের তীব্রতায় গত এক সপ্তাহে চাঁদপুর সদর উপজেলার ১০নং লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রাম রক্ষা বাঁধের প্রায় ৫০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের চলমান ১ হাজার ৩শ’ ৪০মিটার লক্ষ্মীপুর রক্ষা বাঁধের কয়েকশ’ সিসি ব্লক নদীতে তলিয়ে গেছে। সে স্থানটি রক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে সেখানে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। পাউবোর এসও কাজী শাহাদাত হোসেন জানান, এ যাবৎ ৫ হাজার বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙ্গন ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এখনো বালু ভর্তি বস্তা ফেলার কাজ অব্যাহত আছে।

এদিকে চাঁদপুর-শরীয়তপুর ফেরি নৌ-রুটের হরিণা ঘাটে নদী ভাঙ্গনের অবস্থা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রায় ১শ’ মিটার এলাকা নদীতে তলিয়ে গেছে। নদী ভাঙ্গনের কারণে হরিণা ফেরিঘাটের পন্টুন সংযোগস্থলের নিচে মাটি দেবে গিয়ে ওই স্থান ঝুলন্ত অবস্থায় ছিলো। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টায় এ পরিস্থিতিতে ফেরিতে গাড়ি লোডিং আনলোডিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বুধবার সকালে প্রায় ৫ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে পুনরায় ফেরি সংযোগ স্থাপন করা হয়। কিন্তু নদী ভাঙ্গন অব্যাহত থাকায় আবারও হরিণা ঘাট মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসির ফেরি ম্যানেজার ইমরান হোসেন রুহান জানিয়েছেন, সেখানে বড় আকৃতিতে মাটির ফাটল দেখা দিয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে চাঁদপুর-শরীয়তপুর রূটের ফেরি পারাপার বন্ধ হয়ে যাবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই পাড়ের যানবাহনগুলো মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে পন্টুন হয়ে ফেরিতে উঠা-নামা করছে। একদিকে নদী ভাঙ্গন অপরদিকে ফেরি বিকল হয়ে পড়ার কবল থেকে কোনোভাবেই রেহাই পাচ্ছে না এ ফেরি সার্ভিস।

হরিণা ঘাট সূত্রে জানা যায়, দুটি ফেরি বিকল হয়ে পড়লে কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে মাওয়া থেকে কলমিলতা নামের আরেকটি ফেরি এখানে দেয়। সেটি দু’ দিন চলার পর গিয়ার সমস্যার কারণে বুধবার বিকেল থেকে সেটিও বিকল হয়ে শরীয়তপুর ঘাটে পড়ে আছে। ফেরি ঘাট ম্যানেজার জানান, মুন্সিগঞ্জ থেকে বেসরকারি একটি মেকানিক টিম শুক্রবার চাঁদপুর এসে ফেরি সচল করার কাজ শুরু করবে। এখন ফেরি করবি ও কিশোরী চলাচল করছে। এ দুটি ফেরি তিন ঘণ্টা নদীপথ ঘুরে যেতে হয় বিধায় এপার-ওপার আসা-যাওয়ায় দিনের পুরোটা চলে যায়। ফলে দুই পাড়ে ফেরি পারাপারের জন্যে শত শত গাড়ি আটকা থাকতে হচ্ছে।

সরজমিনে হরিণা ফেরি ঘাট গিয়ে দেখা যায়, মেঘনার স্রোতের টানে হরিণা ঘাটসহ হানারচর ইউনিয়নের প্রায় দুই কিলোমিটার নদী তীরবর্তী এলাকার মাটি ক্রমান্বয়ে ধসে পড়ে নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তিন বার মাছ ঘাট সরিয়ে ফেলতে হয়েছে। ঘাটের প্রায় অর্ধশত দোকানপাট ভেঙ্গে সিআইপি বেড়িবাঁধের দিকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ছৈয়াল বাড়ির প্রায় ২০টি বসতঘর, ফসলি জমি, গাছপালা নদী গর্ভে অনেক আগেই চলে গেছে। হরিণা ফেরি ঘাট জামে মসজিদটি এখন ভাঙ্গনের মুখে।

ভাঙ্গন কবলিত ওই এলাকার লোকজন অভিযোগের সুরে জানায়, ভাঙ্গন রোধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় ফেরিঘাট এলাকার অস্তিত্ব এই বর্ষায় টিকে থাকবে কিনা তারা সন্দিহান। নদী ভাঙতে ভাঙতে হরিণা ফেরি ঘাট এলাকাকে ছোট করে ফেলছে। সম্প্রতি স্থানীয় এমপি ও সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি নদী ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করে ভাঙ্গন রোধে যতো দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সবকিছু বিলীন হয়ে যাবার পর ভাঙ্গন রোধ করে লাভ কি হবে। এমনটাই বলছেন এখানকার মানুষগুলো। তাদের দাবি, চাঁদপুরের সব দিকে নদী ভাঙ্গন রক্ষায় বাঁধ দেয়া হয়েছে। কিন্তু হরিণা এলাকার ভাঙ্গন রোধে কোনো কাজ তারা দেখতে পারছে না। এ এলাকার পরিবারগুলো এখন ভাঙ্গন আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছে। সবকিছু নদীতে চলে গেলে কোথায় মাথা গুঁজবে সেই চিন্তায় তারা অস্থির।

ভাঙ্গন বিষয়ে কথা বললে পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁদপুর-এর নির্বাহী প্রকৌশলী জীবন কৃষ্ণ দাশ জানান, লক্ষ্মীপুর রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। নদীর স্রোতের আঘাতে কিছু অংশের ব্লক সরে গেছে। ভয়ের কিছু নেই। তাৎক্ষণিক সে স্থানে কাজ চলছে। হরিণা ফেরিঘাট এলাকার ভাঙ্গন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ এলাকার এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্যে একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়েছে। প্রজেক্ট পাস হলে সেই কাজ শুরু করা যাবে। এখন তাদের কিছুই করার নেই। সরকারের শেষ সময়ে এই প্রকল্পটি কবে নাগাদ অনুমোদন লাভ করবে তা অনিশ্চিত। অথচ মেঘনার ভাঙ্গনে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ফেরি সার্ভিস চাঁদপুর-শরীয়তপুর এখন মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। নদী ভাঙ্গনের ফলে হরিণা ঘাট পন্টুন র্যাম এই নিয়ে ৫বার সরাতে হয়েছে। যতবার সরানো হয়েছে ততবার প্রায় ১০ ঘণ্টা করে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়।