অর্থ ও বাণিজ্য ঢাকা

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, অর্থনীতিবিদদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

GDP-L20130905112320শানজানা জামান, ঢাকা, ৫ সেপ্টেম্বর:  দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৪ মার্কিন ডলার। আগের বছরে সর্বশেষ মাথাপিছু গড় আয় ছিল ৯৩০ মার্কিন ডলার। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বুধবার এক অনুষ্ঠানে দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয়ের নতুন এ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি এ আয় বৃদ্ধির এ ঘটনাকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি বলে মন্তব্য করেন। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি হলেও আয় বৈষম্য বেড়েছে। এই আয় বেড়েছে একশ্রেণীর মানুষের। অন্যদিকে কিছু মানুষ অর্থনৈতিকভাবে আগের অবস্থানেই রয়ে গেছেন। অনেকের গড় আয় কমেছে। আয় কমার অন্যতম কারণ হচ্ছে দ্রব্যমূল্যের চরম উর্দ্ধগতি। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, একশ্রেণীর মানুষের আয় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে বেড়েছে। এর ফলেই মাথাপিছু গড় আয় বেড়েছে বলে অর্থমন্ত্রী হিসাব প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে সবার আয় সমানহারে বাড়েনি। অর্থনীতিবিদ এমএম আকাশ বলেন, মানুষ নির্দিষ্ট শ্রমঘন্টা দিয়ে যে পরিমাণ আয় করেন, তার পুরোটাই চলে যাচ্ছে শুধুমাত্র মৌলিক দ্রব্যাদি ক্রয়ে যা একজন মানুষের খুবই প্রয়োজন। একজনের এই অতিরিক্ত টাকাটাই গিয়ে জমা হচ্ছে অন্য একশ্রেণীর মানুষের হাতে।

এভাবেই আয়বৈষম্য তীব্রতর হয়েছে। তিনি আরও মনে করেন সামগ্রিকভাবে জাতীয় মোট আয় বাড়লেও সব মানুষেরই যে আয় বেড়েছে তা প্রমাণিত হয়না।
উল্লেখ্য ২০০৫-০৬ অর্থবছরকে ভিত্তিবছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব করা হয়। এই হিসাবে ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাথাপিছু গড় আয় বছরে ৯২৩ ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪৪ ডলার। ২০০৮ সালে যেখানে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ৬৩০ ডলার ছিল, পাঁচ বছরের মাথায় তা ৪১৪ ডলার বেড়েছে। তবে এই আয় বৃদ্ধি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। মাথাপিছু আয় বাড়ার কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধির ফলে নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড.সালেহ উদ্দিন আহমেদ।
তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, কিছু সামাজিক উন্নয়ন হয়েছে সত্য। কিছু অর্থনৈতিক উন্নয়নও হয়েছে। তবে এই গড় মাথাপিছু আয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ যে উপকৃত হবেন, তা সবসময় বলা যাবে না। দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবণতায় ধনী আরো ধনী হচ্ছে। অপরদিকে গরীব মানুষ আরো গরীব হচ্ছে।
তিনি মনে করেন মাথাপিছু আয় যত বাড়ছে, সমাজে বৈষম্য ততই বাড়ছে। তবে দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করলে বলা যায় দেশের সার্বিক সূচক ভালোর দিকে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, দ্রব্য ও সেবার সমবণ্টনের মাধ্যমে এই বৈষম্য কমিয়ে আনা যেতে পারে। সরকার চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে (আগের ভিত্তি বছরের হিসাবে) ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের আশা করছে। এ বিষয়ে সাবেক এই গভর্নর আরও বলেন, নির্বাচনের বছরে এই পরিমাণ জিডিপি কোনভাবেই অর্জন সম্ভব নয়। অন্যদিকে এই প্রসঙ্গে ভিন্ন কথা বললেন, পল্লীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জামান। তিনি বলেন, মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি মানে দেশের সার্বিক উন্নয়নের নির্দেশক। আমরা সার্বিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছি এতে এটাই প্রমাণিত হয়েছে। খলীকুজ্জামান বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শুধু স্থিতিশীল তাই নয়- এর গতি ক্রমানুযায়ী বাড়ছে। উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এর চেয়ে ভালো দিক আর কী হতে পারে।
গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন, মোট উৎপাদন বৃদ্ধি (জিডিপি), উদ্যোক্তা বৃদ্ধি, শুধু উদ্যোক্তা বৃদ্ধিই নয় এর সম্প্রসারণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানো, গ্রামীণ মজুরী বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাথাপিছূ গড় আয় বৃদ্ধির ঘটনাকে আমরা খুবই ইতিবাচক বলে মনে করি।
তিনি বলেন, বর্তমানে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরী ১০ কেজি চালের সমান। অর্থাৎ, গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে সমাগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন মজবুত হচ্ছে। এছাড়া রেমিটেন্স বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি- গড় মাথা পিছু আয় বাড়ার বড় কারণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির জন্য বৈষম্য বাড়ছে কি’না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, গত ৩ বছরে এ বৈষম্য তেমন বাড়েনি মনে করি। তবে বর্তমানে যে বৈষম্য বিদ্যমান আছে, তা আগে থেকেই রয়েছে এবং এটাকে প্রকটই বলা যায়। আশার কথা, এ বৈষম্য দূরীকরণে কাজ করা হচ্ছে এবং পুরোপুরি দূরীভূত করতে হলে আরও জোরালোভাবে সবাইকে কাজ করতে হবে।